আর পেটের ছেলে আজিজ, সে এমন মেউন্না, বউর ওপর দিয়ে কথা বলার মুরোদ নেই। বউ অন্যায় করলেও দোষ সে মাকেই দেয়। এসব দেখে সংসারের ওপর থেকে মন উঠে গেছে বুড়ির। তারপর থেকে সংসারে সে থেকেও নেই। বাড়ি থাকলে নাতিনাতকুরদের হাত দিয়ে ভাততরকারি পাঠায় বানেছা, ছনুবুড়ি খায়। কখনও যদি না পাঠায় সে নিয়ে রা কাড়ে না। কারণ পাড়া চড়ে ছোটখাট চুরিচামারি করে, কুটনামি করে টুকটাক খাদ্য যা জোগাড় করে সে তাতে নিজের পেটটা বুড়ির খালি থাকে না। সময় অসময়ের খিদেটা মারতে পারে।
তবে দেশগেরামের লোক ছনুবুড়ির আড়ালে আবডালে তাকে নিয়ে খুব হাসিমশকরা করে। এতবড় কূটনি হয়েও ছেলেবউর কুটনামির কাছে মার খেয়ে গেছে বুড়ি। কাইজ্জা কিত্তনে ছনুবুড়ির বেজায় ধার, সেই ধার মার খেয়ে গেছে বানেছার কাছে। পারতিকে বউর সঙ্গে সে কথা বলে না। বউকে চোখের ওপর দেখেও কথা বলে না, না দেখার ভান করে।
কিন্তু আজকের ব্যাপারটি অন্যরকম। আজ সকাল থেকেই পেটভর্তি খিদে বুড়ির। সকালবেলা মুখে দেয়া যায় এমন কোনও খাদ্য নিজের সংগ্রহে ছিল না। কাল দুপুরে জাহিদ খাঁর বাড়ি ভাত খেয়েছে তারপর থেকে একটা বিকেল গেছে, পুরো একটা রাত তারপর এতটা বেলা, মানুষ বুড়ো হলে কী হবে পেট কখনও বুড়ো হয় না, খিদেটা বেজায় লেগেছে ছনুবুড়ির। আর এসময় বাড়ির বউ পোলাপান নিয়ে বউয়া খাচ্ছে। যদিও ছেলের সংসারের অভাবের কথাটাও মনে হয়েছে ছনুবুড়ির, একাধারে বউয়ার। গন্ধে নিজের পেটের খিদেটাও জাগা দিয়ে উঠেছে।
ছনুবুড়ি এখন কী করে!
ছেলেবউর সঙ্গে শেষ কবে কথা হয়েছে মনে নেই বুড়ির। আজ বুড়ি ভাবল নাতি নাতকুরদের মাধ্যমে বউর সঙ্গে ভালোভালোই দুএকখানা কথা বলে সংসারের অভাবের কথাটা জেনে নেবে এবং নিজের জন্য একথালা বউয়াও জোগাড় করবে। কুটনামি একটু করে দেখুক কাজে লাগলেও লাগতে পারে।
বড় ঘরের পিড়ায় বসল ছনুবুড়ি। ঘরের ভেতর গলা বাড়িয়ে মেজ নাতিটাকে ডাকল। ও হামেদ, হামেদ কী কর ভাই? বউয়া খাও?
সংসারে একমাত্র হামেদেরই সামান্য টান দাদির জন্য আছে। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ।
কিয়ের বউয়া?
খুদের।
খুদের বউয়া খাও ক্যান, ঘরে কি চাউল নাই?
হামেদ কথা বলবার আগেই বানেছা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, চোক্কে বলে দেহে না, তয় ঘরে বইয়া যে আমি পোলাপান লইয়া বউয়া খাই হেইডা দেহে কেমতে?
খোঁচাটা সঙ্গে সঙ্গে হজম করল ছনুবুড়ি। যেন বউর সঙ্গেই কথা বলছে এমন স্বরে বলল, কে কইছে চোক্কে দেহি না! অল্পবিস্তর দেহি।
সঙ্গে সঙ্গে বানেছা বলল, আইজ যে অহনতরি বাইত্তে? আইজ যে অহনতরি পাড়া বেড়াইতে বাইর অয় নাই?
বাইর অইতাছিলাম।
তয়?
ছনুবুড়ি বুঝে গেল বানেছার আওয়াজটা ভালো না। এখুনি কাইজ্জা কিত্তন লাগাবে সে। বুড়ি আর বানেছার উদ্দেশ্যে কথা বলল না। হামেদকে বলল, ও হামেদ, আমারে ইট্টু বউয়া দে। বিয়াইন্নাবেলা আমারও তো খিদা লাগে!
হামেদ কথা বলবার আগেই বানেছা একেবারে তেড়ে উঠল। ইস একদিন পোলাপান লইয়া ইট্টু বউয়া খাইতে বইছি তাও মাগির সইজ্জ অয় না। অরে দেওন লাগব এক থাল! এই বুড়ি, বাইর অইলি বাড়িত থন!
বানেছার কথা শুনে ছনুবুড়িও তেড়ে উঠতে গিয়েছিল, কী ভেবে সামলাল নিজেকে। গলা নরম করে সরাসরি বানেছাকে বলল, এমুন কইর না বউ। কয়দিন পর আহুজ পড়ব, এই সমায় ময়মুরব্বিগ বদদোয়া লইতে অয় না। একবার আহুজ পড়ন আর একবার মউতের মুক থিকা ফিরত আহন এক কথা।
একথায়ও বানেছার মন গলল না। আগের মতোই রুক্ষ্ম গলায় সে বলল, এত আল্লাদ দেহানের কাম নাই। মউতের মুখে আমি পেত্যেক বচ্ছরঐ যাই, আবার ফিরতও আহি। তোমার বদদোয়ায় আমার কিচ্ছু অইব না। হকুনের দোয়ায় গরু মরে না। তাইলে দুইন্নাইতে আর গরু থাকত না। খালি হকুনঐ থাকত।
আজিজের মেজছেলে ন-দশ বছরের হামেদ তখন খাওয়া শেষ করেছে। এই ছেলেটি বেশ আমুদে স্বভাবের। এই বয়সেই বয়াতিদের গান শুনে সেইগান গলায় তুলে ফেলে। কয়েকদিন আগে তালুকদার বাড়ি গিয়ে খালেক কিংবা মালেক দেওয়ানের দেহতত্ত্বের গান শুনে এসেছে। স্মরণশক্তি ভালো ছেলেটির। একবার দুবার শোনা গান অবিকল বয়াতিদের মতো করে গাইতে পারে। মা দাদীর কথা কাটাকাটির মধ্যেও গলা ছেড়ে গান জুড়ে দিল সে।
মা লো মা ঝি লো ঝি বইন লো বইন করলাম কী
রঙ্গে ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে।
নাতির গান শুনে খিদের কষ্ট এবং ছেলেবউর করা অপমানে বহুকাল পর বুকের অনেক ভেতর থেকে ছনুবুড়ির ঠেলে উঠল গভীর কষ্টের এক কান্না। এঘরের পিড়ায় বসে এখন যদি কাঁদে ছনুবুড়ি ওই নিয়েও কথা বলবে বানেছা। হয়ত আরও অপমান করবে তাকে। এই অপমানের ভয়ে চোখে জল নিয়েই উঠে দাঁড়াল ছনুবুড়ি। বাড়ির নামার দিকে হাঁটতে লাগল। ঘরের ভেতর হামেদ তখন গাইছে,
নৌকার আগা করে টলমল
বাইন চুয়াইয়া ওঠে জল।
কত ভরা তল হইল এই গাঙ্গে
ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে।
.
বেশ শক্ত করে কুট্টির হাত ধরেছেন মিয়া বাড়ির কত্রী রাজা মিয়ার মা। ধরে খুবই সাবধানে বড় ঘরের সিঁড়ি ভাঙছেন। একটি করে সিঁড়ি ভাঙছেন, কয়েক মুহূর্ত করে দাঁড়াচ্ছেন। দাঁড়িয়ে গাভীন গাইয়ের শ্বাস ফেলার মতো করে শ্বাস ফেলছেন। সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় মানুষ না হয় ক্লান্ত হয় নামার সময়ও যে হয়, তাও মাত্র চার পাঁচটা সিঁড়ি, কুট্টি ভাবতেই পারে না। মোটা হলে যখন এতই কষ্ট তাহলে মোটা হওয়ার দরকার কী! কে বলেছে এত মোটা হতে!
