জাহিদ খাঁর বাড়ি দাওত খাইতে গেছিলাম।
কেডা দাওত দিল তোমারে?
জাহিদ খাঁর বড় পোলায়। পোলার বউডা এত ভালো, দুই একদিন পর পর ঐ দাওত দিয়া খাওয়ায় আমারে। কয় আমারে বলে অর মার মতন লাগে।
ছনুবুড়ির কথা শুনে নিঃশব্দে হাসল দবির গাছি। কী খাওয়াইল?
ভাত আর চাইর পাঁচ পদের মাছ। ইলসা, টাটকিনি, গজার। বাইং মাছও আছিল। আমি খাই নাই। শেষমেষ দিল দুদ আর খাজুরা মিডাই (খেজুর গুড়)।
অহন খাজুরা মিডাই পাইল কই?
আর বছরেরডা মুড়ির জেরে (টিনে) রাইক্কা দিছিল।
তারপর দবির গাছিকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বলল, বউ এত ভালো বুঝলি দউবরা, গাছের বাইগন, বিলাতি বাইগন (টমেটো) অহনও ডাঙ্গর অয় নাই হেইডিও কতডি ছিড়া আমার টুপরে দিয়া দিল। কইল বাইত লইয়া যান। হাজাম বাড়ি গেছি। তামুক খাইতে আমার টুপুর দেইখা তছি পাগলনি কয় কি, কী চুরি করলা! ক, আমি বলে চোর!
ছনুবুড়ির স্বভাব জানার পরও তছির ওপর একটু রাগল দবির গাছি। বলল, বাদ দেও পাগল ছাগলের কথা। অর কথায় কী যায় আহে।
ছনুবুড়ি খুশি হয়ে বলল, হ অর কথায় কী যায় আহে। তয় তুই একখান কাম করিচ বাজান, পয়লা দিনের রস আমারে ইট্টু খাওয়াইচ।
খাওয়ামুনে। তয় দুই চাইরদিন দেরি হইব।
ক্যা, দেরি হইব ক্যা?
গাছ ঝুইরা ঠিলা পাততে সময় লাগব না! উততইরা বাতাসটা আইজ খালি ছাড়ছে। আইজ থিকা রস আইছে গাছে। বেবাক কিছু ভাও করতে দুই তিনদিন লাগব। পয়লা দিনের রস খাওয়ামুনে তোমারে, চিন্তা কইর না। অহন খালি দেহ উততইরা বাতাসটা কেমনে ছাড়ছে! এইবারের রস দেখবা কেমুন মিডা অয়!
বিকেল শেষের হা হা করা উত্তুরে হাওয়ায় ছনুবুড়ির পাটের আঁশের মতো চুল তখন ফুর ফুর করে উড়ছে। এ হাওয়ায় মনে কোনও পাপ থাকে না মানুষের, কুটনামো থাকে না কিন্তু ছনুবুড়ির মনে সামান্য কূটবুদ্ধি খেলা করতে লাগল।
.
বাড়ি থেকে বেরুবার সময় ছনুবুড়ি দেখতে পেল তার ছেলের বউ বানেছা এলাগেন্দা পোলাপান (ছোট ছোট ছেলেমেয়ে) নিয়ে ঘরের মেঝেতে বসে বউয়া (তেল এবং পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে তৈরি এক ধরনের ভাত, চাল এবং খুদ কুটো দিয়েই হয়।) খাচ্ছে। বেশ খানিকটা বেলা হয়েছে, এসময় বউয়া খেলে দুপুরের ভাত বিকেলে খেলেও অসুবিধা নেই। আর বিকেলে ভাত খাওয়া মানে রাতে না খেলেও চলবে। গেরস্ত বাড়িতে যখন অভাব দেখা দেয় তখন অসময়ে বউয়া কিংবা জাউ খায় সংসারের লোকে।
তাহলে কি ছনুবুড়ির ছেলের সংসারে অভাব লেগেছে!
অভাব তো লাগবার কথা নয়। বুড়ির একমাত্র ছেলে আজিজ গাঁওয়াল (ফিরি করা) করে। ভারে বসিয়ে কাঁসা পেতলের থালাবাসন, জগ গেলাস, কলশি পানদান নিয়ে দেশ গ্রাম চষে ফেরে। নতুন একখানা কাঁসাপেতলের থালা কিংবা বদনা, পানের ডাবর কিংবা পানদান গেরস্ত বাড়ির বউঝিদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিনিময়ে সেইবাড়ি থেকে নিয়ে আসবে পুরনো কাঁসা পেতলের ভাঙাচোরা কিংবা বহুকাল ধরে ব্যবহার করা জিনিসপত্র। একখানা নতুন জিনিসের বিনিময়ে আনবে দুতিনখানা পুরনো জিনিস। তারপর সপ্তাহে সপ্তাহে লৌহজং বাজারে গিয়ে ওজনদরে সেইসব জিনিস বিক্রি করে অর্ধেক টাকার জিনিস কিনবে অর্ধেক টাকা কোঁচড়ে গুজবে। ওই অর্ধেক টাকাই মুনাফা। তার ওপর খেতখোলাও আছে আজিজের। ভালোই আছে। আড়াই কানির মতো হবে। পুরো আড়াই কানিই পড়েছে ইরির আওতায়। বর্গা দিয়েও ধান যা পাওয়া যায় বছর চলে স্বাচ্ছন্দে। যদিও আজিজের সংসারটা বড়। বিয়ের পর বছর থেকে সেই যে পোলাপান হতে শুরু করেছে বউয়ের, এখনও থামেনি। বড় পোলার বয়স হয়েছে এগার বার বছর। এখনও দেখ পেট উঁচু হয়ে আছে বানেছার। সাত মাস চলছে। মাস দুয়েক পর কোনও একদিন ব্যথা উঠবে। আলার মা ধরণী এসে খালাস করে দিয়ে যাবে। পোলা না মাইয়া কী হল সে নিয়েও আগ্রহ থাকবে না সংসারের কারও। না আজিজের, না বানেছার। এমন কী পোলাপানগুলোও তাকিয়ে দেখবে না, ভাই হল। তাদের, না বোন। যে যাকে নিয়ে আছে তারা।
আর ছনুবুড়ির তো কথাই নেই। সে তো এই সংসারে থেকেও নেই। বিয়ে করে বানেছাকে যেদিন সংসারে আনল আজিজ তার পরদিন থেকেই সংসারের বাড়তি মানুষ হয়ে গেল ছনুবুড়ি। বাড়িতে বড়ঘর একটিই, সেই ঘরটি চলে গেল ছেলে বউর দখলে। উত্তরের ভিটেয় আছে মাথার ওপর টিনের দোচালা আর চারদিকে বুকাবাঁশের (বাঁশ চিড়ে তার তেরকার সাদা নরম অংশ দিয়ে তৈরি) বেড়া, ঢেঁকিঘর। একপাশে বেলদারদের (নিচু ধরনের এক সম্প্রদায়) রোগা ঘোড়ার মতো কালো রঙের বহুকালের। পুরনো ঢেঁকিটা লোটে (ঢেকির মুখ যে গর্তে পড়ে) মুখ দিয়ে পড়ে আছে, আরেক পাশে উঁই হয়ে আছে লাকড়িখড়ি, এসবের মাঝমধ্যিখানে, লেপাপোছা সামান্য জায়গা থাকার জন্য পেল ছনুবুড়ি। নিজের কাঁথা বালিশ নিয়ে ছনুবুড়ি তারপর থেকে ওখানেই শোয়।
দিন চলে যাচ্ছে।
কিন্তু ছেলের বউ হিসেবে বানেছা খুব খারাপ। সংসারে এসে ঢোকার পর থেকেই দু চোখে দেখতে পারে না শাশুড়ীকে। কি ভালো কথা কি মন্দ কথা, ছনুবুড়ির কথা শুনলেই ছনছন করে ওঠে। চোপা (মুখ) এত খারাপ, শাশুড়িকে কী ভাষায় গালাগাল করা যায় তাও জানে না। মুখে যা আসে তাই বলে। এমন কি সতীন পর্যন্ত।
প্রথম প্রথম এই নিয়ে কেচ্ছাকেলেংকারি হয়েছে সংসারে। বানেছা যেমন ছনুবুড়িও তেমন, বউ শাশুড়ির কাইজ্জা কিত্তনে পাড়ার মানুষ জড় হত। শেষদিকে যখন হাতটাতও তুলতে শুরু করল বানেছা, তখন উপায়অন্ত না দেখে থেমে গেছে ছনুবুড়ি। শাশুড়ি হয়ে বউর হাতে মার খাওয়া! ছি!
