শেষ সিঁড়িটা ভেঙে মাটিতে পা দিলেন রাজা মিয়ার মা, ভারি স্বস্তির একখানা শব্দ করলেন। যেন পুলসুরাত পেরিয়ে এসেছেন এমন আরামদায়ক একখানা ভাব। তারপরই কুট্টির মুখের দিকে তাকালেন, বাজখাই গলায় বললেন, জলচকি দিছস?
কুট্টি সঙ্গে সঙ্গে বলল, দিছি বুজান।
তারপর রাজা মিয়ার মার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। জলচকি না দিয়া আপনেরে ঘর থিকা বাইর করুমনি? আমি জানি না উডানে নাইম্মা খাড়াইতে পারেন না আপনে! লগে লগে বহন লাগে। এর লেইগা আগেই জলচকি দিছি, তারবাদে আপনেরে ঘর থিকা বাইর করছি।
ভালো করছস। তয় আমি তো আইজ উডানে বহুম না।
বলেই কুট্টির কাঁধে কলাগাছের মতো একখানা হাত রাখলেন রাজা মিয়ার মা। শরীরের ভার খানিকটা ছেড়ে দিলেন। সেই ভারে কুট্টি একটু কুঁজো হয়ে গেল। বিশ একুশ বছরের রোগা পটকা মেয়ে কুট্টি তার পক্ষে এরকম একখানা দেহের সামান্য ভারও বহন করা সম্ভব নয়।
কুট্টির ইচ্ছে হল কথাটা বুজানকে বলে। কিন্তু বলার জো নেই। রাজা মিয়ার মার দেহ এবং মেজাজ দুটোই এক রকম। রাগ করতে পারেন এমন কোনও কথা মুখের ওপর। কিংবা আড়ালে আবডালে বললে, সেকথা যদি তাঁর কানে যায় তাহলে আর কথা নেই। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। তার আগে যে গালাগালখানা করবেন সেই গালাগাল শুনে গর্তে গরম জল ঢেলে দেয়ার পর যেমন ছটফটে ভঙ্গিতে বেরয় সাপ কিংবা তুরখুলা (এক ধরনের বড় পোকা) ঠিক তেমন করে কবর থেকে বেরুবে কুট্টির যত মৃত আত্মীয়। তাতে অবশ্য কুট্টির কিছু আসবে যাবে না কিন্তু এই বাড়ির বাঁধা কাজ হারালে কুট্টির কোথাও দাঁড়াবার জায়গা থাকবে না। না খেয়ে মরণ। আর খিদের কষ্ট কী যেন তেন কষ্ট! সব কষ্ট সহ্য করা যায় খিদের কষ্ট সহ্য করা যায় না। সেই কষ্টের চে এই ভার বহন করা কোটি গুণ ভালো।
কুঁজো শরীরেও মুখটি হাসি হাসি করল কুট্টি। বলল, আমি জানি আপনে আইজ কই বইবেন।
রাজা মিয়ার মাও হাসলেন। ক তো কো?
আমরুজ (জামরুল) তলায়।
হ ঠিক কইছস।
এর লেইগা জলচকিডা আমরুজ তলায়ঐ দিছি।
এই বাড়ির রান্নাঘরটি উঠোনের একেবারে মাঝখানে। দক্ষিণের ভিটেয় দোতলা বিশাল একখানা টিনের ঘর। ঘরটির নিচের তলাও পাটাতন করা। দক্ষিণমুখো বাড়ির পুকুর বরাবর একতলা দোতলা। দুতলাতেই রেলিং দেয়া বারান্দা। বেশ দূর থেকে গাছপালার মাথা ছাপিয়ে মিয়া বাড়ির দোতলা ঘরটি দেখা যায়।
বাড়ির পশ্চিম এবং উত্তরের ভিটেয় আছে আরও দুখানা পাটাতন ঘর। বছরভর তালামারা থাকে ঘর দুটো। এতদিন হল এই বাড়িতে আছে কুট্টি এক দুবারের বেশি। ঘর দুটো খুলতে দেখেনি। বন্ধই যদি থাকবে ঘর দুটো তাহলে রাখবার দরকার কী!
তিনখানা ঘরের প্রত্যেকটির থেকে পাঁচ সাত কদম করে জায়গা হবে বাদ দিয়ে পুবের ভিটেয় রান্নাঘর। রান্নাঘরখানির অবশ্য কায়দা বেশ। দেশগেরামের রান্নাঘরের সঙ্গে মেলে না। মাথার ওপর টিনের চালা নেই, টালির ছাদ দেয়া।
এই রান্নাঘরটির পেছনেই মাঝারি ধরনের একটি জামরুল গাছ। বাড়ি এলে কোনও কোনও সময় জলচৌকি পেতে এই জামরুল তলায় বসে বড় আরাম পান রাজা মিয়ার মা। শীতকাল, গরমকাল সব সময়ই দেহে তাঁর গরম ভাব। দুচার কদম হাঁটলেই ঘামে জবজব করে শরীর। ভেতর থেকে ঠেলে বেরয় উষ্ণতা। জামরুল তলায় বসলে এই উষ্ণতা কমে। জায়গাটা সব সময়ই শীতল। জামরুলের পাতায় ঝিরিঝিরি হাওয়াটা সব সময়ই খেলে। আজ সকালে, বেশ খানিকটা বেলা হয়ে যাওয়ার পর কুট্টির কাঁধে ভর দিয়ে এই জামরুল তলার দিকেই যাচ্ছেন রাজা মিয়ার মা। অতিকায় দেহধারী বলে তাঁর হাঁটাচলা খুবই ধীর। চোখের পলকে পৌঁছনো যায় এমন জাগায় পৌঁছুতেও তাঁর সময় লাগে বেশ খানিকটা।
এখনও লাগছে।
তবে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছেন রাজা মিয়ার মা। গলার আওয়াজও তাঁর দেহ এবং মেজাজের মতোই। ভালোমন্দ যে কোনও কথা বললেই পিলে চমকায়। বেশ অনেকদিন ধরে এই বাড়িতে থাকার পরও, এখনও কেমন পিলে চমকাচ্ছে কুট্টির। বুজান বাড়ি এলে অবশ্য সারাক্ষণই এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকে সে। ভেতরে ভেতরে অপেক্ষা করে কবে বাড়ি থেকে যাবেন তিনি। কবে হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে কুট্টি।
রাজা মিয়ার মা বাড়ি না থাকলে এই বিশাল বাড়িটির মালিক কুট্টি। বড় বুজান অবশ্য আছেন বাড়িতে, বাঁধা কামলা আছে আলফু। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। বড় বুজান বয়সের ভারে পঙ্গু। সারাক্ষণই শুয়ে আছেন বিছানায়। হাঁটাচলা করা তো দূরের কথা, বিছানায় উঠে বসতে পর্যন্ত পারেন না। কথা বলেন হাঁসের ছায়ের মতো চিচি করে। আর আলফুকে তো মানুষই মনে হয় না কুট্টির। মনে হয় গাছপালা, মনে হয় ঝোপঝাড় কিংবা গেরস্তদের বার বাড়ির সামনে নিথর হয়ে থাকা নাড়ার পালা। জলজ্যান্ত একজন মানুষকে যে কেন এমন মনে হয় কুট্টির! বোধহয় কথা আলফু বলে না বলে। বোধহয় ভালোমন্দ সব ব্যাপারেই আলফু সমান নির্বিকার বলে। মুখে ভাষা থাকার পরও আলফু বোবা বলে। রাজা মিয়ার মা বললেন, বুদ্দিসুদ্দি তো তর ভালঐ কুট্টি, তারবাদেও জামাইর ঘর করতে পারলি না ক্যা?
এমনিতেই বুজানের দেহের ভারে কুঁজো হয়ে গেছে কুট্টি, মনে মনে ভাবছে কখন ফুরবে এইট্টুকু পথ, কখন বুজানকে জলচৌকিতে বসিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে সে, তার ওপর আচমকা এরকম একখানা কথা, তাও ওরকম বাজখাই গলায়, কুট্টি বেশ ভড়কে গেল। কথাটা যেন বুঝতে পারল না সে এমন গলায় বলল, কী কইলেন বুজান?
