আজও পারেনি। দ্রুত হেঁটে প্রথমে ছনুবুড়ি গেছে হাজাম বাড়ি। সেই বাড়িতে বসে অনেকক্ষণ ধরে তামাক খেয়েছে। টোপরের বেগুন টমেটো একহাতে আঁকড়ে ধরা বুকের কাছে অন্যহাতে নারকেলের ছোট্ট হুঁকা। গুরগুর গুরগুর করে যখন তামাক খাচ্ছে। হাজাম বাড়ির মুরব্বি সংসার। আলী হাজামের সেজো মেয়ে তছি বুকের কাছে আঁকড়ে ধরা টোপরটা দেখে ফেলল। তছি হচ্ছে জন্মপাগল। মাথা ঠিক নেই তার, কথাবার্তার ঠিক নেই। যুবতী বয়স তছির কিন্তু চালচলন শিশুর মতো। ফলে তছির নাম পড়েছে তছি পাগলনি।
ছনুবুড়ির টোপরের দিকে তাকিয়ে তছি পাগলনি বলল, ও মামানি টুপরে কী তোমার? সংসার আলী হাজামের ছেলেমেয়েরা ছনুবুড়িকে ডাকে বুজি, তছি পাগলনি ডাকে মামানি। এই মামানি ডাকটা শুনলে পিত্তি জ্বলে যায় বুড়ির। কোথায় বুজি কোথায় মামানি! আত্মীয় অনাত্মীয় যে কাউকে বুজি ডাকা যায় কিন্তু মামানি ডাকা যায় না। মামানি ডাক শুনলেই মনে হয় হাজামরা ছনুবুড়ির আত্মীয়। হাজামরা হচ্ছে ছোট জাত, অচ্ছুত। তারা কেমন করে ছনুবুড়ির আত্মীয় হয়! গ্রামের লোকে শুনলে বলবে কী! ছনুবুড়ির শ্বশুরপক্ষকে হাজাম ভাববে না তো! আজকালকার লোকেও মানুষের অতীত, নিয়ে কম ঘাটায় না। যা নয় তাই খুঁচিয়ে বের করা স্বভাবের মানুষের কি আকাল আছে গ্রামে!
এসব ভেবে রেগে গেল বুড়ি। তছি যে জন্মপাগল ভুলে গেল। হুঁকা নামিয়ে খেকুড়ে গলায় বলল, ঐ ছেমড়ি তুই আমারে মামানি কচ কেন লো? আমি তর কেমুন মামানি? সঙ্গে সঙ্গে ছনুবুড়ির সামনে, মাটিতে শিশুর মতো লেছড়ে-পেছড়ে বসল তছি। মাথাভর্তি উকুন তার, সারাক্ষণ মাথা চুলকোচ্ছে। এখনও চুলকোল। চুলকোতে। চুলকোতে বলল, কেমুন মামানি জানি না। টুপরে কী লও? কই থিকা চুরি করলা?.. একে মামানি ডাক তার ওপর অমন মুখের ওপর চুরির অপবাদ, মাথা একেবারে বিগড়ে গেল বুড়ির। হাতের লাঠি নিয়ে তড়বড় করে উঠে দাঁড়াল সে। গলা তিন চারগুণ চড়িয়ে ফেলল। আমি চোর? আমি চুরি করি, আ! হাজাম জাতের মুখে এতবড় কথা?
ছনুবুড়ির রাগ চিৎকার একদম পাত্তা দিল না তছি। বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে হি হি করে একটু হাসল। তারপর মাথা চুলকোতে চুলকোতে নির্বিকার গলায় বলল, তুমি তো চোরই মামানি। মেন্দা বাড়ির ঝাঁকা থিকা হেদিনও তো তোমারে কহি (এক ধরনের সবজি চুরি করতে দেখলাম। আইজ কী চুরি করছ? দেহি টুপরে কী?
এবার চুরির কথা আর পাত্তা দিল না বুড়ি। আবার মামানি নিয়ে পড়ল। ইচ্ছা কইরা মামানি কও আমারে। আত্মীয় বানাইছ, হাজাম বানাইছ আমারে! ওই মাগি আমি কি হাজাম জাতের বউঝি যে আমারে তুই মামানি কচ!
তছির বড়ভাই গোবেচারা ধরনের আবদুল তার বউ আর তছির মা তিনজনেই তখন বুড়িকে থামাবার চেষ্টা করছে। অর কথায় আপনে চেইত্তেন না বুজি। ও তো পাগল, কী থুইয়া কী কয়!
কিয়ের পাগল, কিয়ের পাগল ও? ভেক ধরছে। অরে আমি দেখছি না তারিক্কার লগে ইরফাইন্নার ছাপড়ায় ঢোকতে। পাগল অইলে এই হগল বোজেনি?
এ কথায় তছির মা ভাই একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। ভাইর বউ মুচকি হেসে মাথায় প্রথমে ঘোমটা টানল তারপর পশ্চিমের ছাপড়ায় গিয়ে ঢুকল।
তছি ততক্ষণে বুঝে গেছে তার নামে বদকথা বলছে ছনুবুড়ি। লাফ দিয়ে ওঠে দাঁড়াল সে। পাগল বলে কথার পিঠে কথা বলতে শেখেনি সে, এক কথা শুনে বলে অন্য কথা। এখনও তাই করল। ঝগড়ারত বেড়ালের মতো মুখ খিঁচিয়ে বলল, ঐ বুড়ি কুটনি, চুন্নিবুড়ি, মামানি ডাকলে শইল জ্বলে, না? হাজামরা মানুষ না! ছোড জাত? তয় এই ছোড জাতের বাইত আহ ক্যা? তাগ বাইত তামুক খাওনের সুময় মনে থাকে না তারা হাজাম! হাজামরা যেই উক্কায় তামুক খায় হেই উক্কায় মুখ দেও কেমনে? হাজামগ থালে বইয়া দেহি কতদিন ভাত খাইয়া গেছ! বাইরে অও আমগ বাইত থন। বাইর অও। আর কুনওদিন যদি এই বাইত্তে তোমারে দেহি টেংরি ভাইঙ্গা হালামু।
তছির মারমুখো ভঙ্গি দেখে ছনুবুড়ি দমে গেছে। মুখে কথা আটকে গেছে তার। গো গো করতে করতে হাজাম বাড়ি থেকে নেমেছে সে। দক্ষিণের মাঠ ভেঙে হাঁটতে শুরু করছে। এখন শেষ বিকেল। এসময় বাড়ি ফেরা উচিত। সন্ধ্যের অন্ধকার ঘনালে হাঁটা চলায় অসুবিধা। ছানিপড়া চোখে এমনিতেই ঝাপসা লাগে পৃথিবী। তার ওপর যদি হয়। অন্ধকার, পথ চলতে আছাড় উষ্টা খাবে ছনুবুড়ি। এই বয়সে আতুড় লুলা হয়ে বেঁচে থাকার অর্থ নেই। ঘরে বসে জীবন কাটাবার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো।
এসব ভেবে দ্রুত পা চালাচ্ছে বুড়ি, মিয়াদের ছাড়া বাড়ির দক্ষিণে এসেছে, বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে যে লম্বা টোসখোলা ঝোপ সেই ঝোপের এপাশ থেকে হেলেপড়া খেজুর গাছটির পায়ের কাছে ছানিপড়া চোখেও একটি লোককে বসে থাকতে দেখল। দেখে থমকে দাঁড়াল। গলা টানা দিয়ে বলল, কেডারে খাজুর তলায়?
খেজুরতলা থেকে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া এল। আমি।
আমি কে?
মানুষটি ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। হাসি হাসি মুখ করে আমুদে গলায় বলল, কও তো কেডা?
বয়সী মাথাটা সামান্য কাঁপাল ছনুবুড়ি। গলা চিনা চিনা লাগে!
তারপরই শিশুর মতো উজ্জ্বল হল সে। চিনছি। দউবরা। ঐ দউবরা খাজুর তলায় কী করচ তুই? গাছ ঝুরছ?
দবির গাছি বলল, না অহনও ঝুরি না। জিনিসপত্র লইয়া বাইর হইছি। আইজ ঘুইরা ঘাইরা গাছ দেখতাছি। কাইল পশশু রুম। তুমি আইলা কই থিকা?
