সীতারামপুরের পুষ্প ঠাকরনের একমাত্র ছেলে মরেছিল খেজুর কাঁটায়। বেজায় দুরন্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। শীতের রাতে ইয়ার দোস্তদের নিয়ে রস চুরি করতে গেছে কুমারভোগ। টর্চ মেরে মেরে এগাছ থেকে হাড়ি নামায়, ওগাছ থেকে নামায়। তারপর গাছতলায় দাঁড়িয়েই হাঁড়িতে চুমুক। কারও কিছু হল না, ফেরার সময় ঠাকরনের ছেলের ডানপায়ে ফুটল কাঁটা। এক দুদিন একটু ব্যথা হল পায়ে। ঠাকরন নিজে উঁচ দিয়ে ঘাটাঘাটি করল ছেলের পা। কাঁটার হদিস পেল না। চার পাঁচদিনের মাথায় মা ছেলে দুজনেই ভুলে গেল কাঁটার কথা।
ঠিক দেড়মাস পর এক সকালে পিঠের ব্যথায় চিৎকার শুরু করল ঠাকরনের ছেলে। কোন ফাঁকে সারা শরীর অবশ হয়ে গেছে তার। না নড়তে পারে না বিছানায় ওঠে বসতে পারে। শবরী কলা রঙের মুখখানা ছেলের সরপুটির পিত্তির মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ঠাকরন কিছু বুঝতে পারে না, দিশেহারা হয়ে ডাক্তার কবরেজ ডাকে, ফকিরফাঁকরা ডাকে। হোমিওপ্যাথি, এলোপ্যাথি, পানিপড়া, তাবিচকবচ, আয়ুর্বেদি আর কত পদের যে টোটকা, কিছুতেই কিছু হল না। পাঁচদিন ধরে ব্যথায় কাতরাল ছেলেটি তারপর বিয়ান রাতের দিকে মারা গেল। পিঠের যেখানটায় ব্যথা হচ্ছিল সেই জায়গাটি ছেলের তখন থকথক করছে। দেখেই বোঝা যায় চামড়ার তলার মাংসে পচন ধরেছে। লাশ নাড়াচাড়ার সময় বোধহয় চাপ পড়েছিল, চামড়া ফেটে গদ গদ করে। বেরুল রোয়াইল ফলের মতো পুঁজ। সেই পুঁজের অন্তরালে দেখা গেল মাথা উঁচিয়ে আছে একখানা খেজুরকাঁটা।
এ অনেককাল আগের কথা। তারপর থেকে এ তল্লাটে রস চুরি হয় না। লোকে মনে করে খেজুরগাছ হচ্ছে মা জননী। মা যেমন বুকের দুধ শুধুমাত্র তার সন্তানের জন্য লুকিয়ে রাখে, খেজুরগাছ ঠিক তেমন করে তার রস লুকিয়ে রাখে গাছির জন্য। গাছি ছাড়া অন্য কেউ এসে বুকে মুখ দিলে কাঁটার আঘাতে মা জননী তাকে বিক্ষত করেন, জান সংহার করেন। নইলে এই যে এতকালের পুরনো গাছি দবির, বয়স হল দুকুড়ির কাছাকাছি, গাছ ঝুরছে বালক বয়স থেকে, কই তার পায়ে তো কখনও কাঁটা ফুটল না! গাছ ঝুরতে ওঠে কাঁটার একটি খোঁচাও তো সে কখনও খায়নি! এসব ভেবে নৌকোর মতো বাঁকা হয়ে থাকা গাছটির পায়ের কাছে খুবই বিনীত ভঙ্গিতে দুহাত ছোঁয়াল দবির গাছি। তিনবার সালাম করল গাছটিকে। বহুকাল পর মায়ের কাছে ফিরে আসা আদুরে ছেলে যেমন করে ঠিক তেমন আকুলি বিকুলি ভঙ্গিতে গাছটিকে তারপর দুহাতে জড়িয়ে ধরল। বিড়বিড় করে বলল, মা মাগো, আমার মিহি (দিকে) ইট্টু নজর রাইখো মা। গরিব পোলাডার মিহি নজর রাইখো। এই দুইন্নাইতে তোমরা ছাড়া আমার মিহি চাওনের আর আছে কে! তোমরা দয়া না করলে বাচুম কেমনে! আমি তো বছর ভর তোমগ আশায় থাকি! তোমগ দয়ায় দুই তিনটা মাস সুখে কাটে। আর বছর ভালোই দয়া করছিলা। এইবারও তাই কইরো মা। মাইয়া লইয়া, মাইয়ার মারে লইয়া বছর যেন খাইয়াপইরা কাটাইতে পারি।
.
ছনুবুড়ির স্বভাব হচ্ছে দিনমান টো টো করে ঘুরে বেড়ানো আর টুকটাক চুরি করা, মিথ্যে বলা। কুটনামিতে তার কোনও তুলনা নেই। বয়স কত হয়েছে কে জানে! শরীরটা কঞ্চির পলকা ছিপঅলা বড়শিতে বড় মাছ ধরলে টেনে তোলার সময় যেমন বেঁকে যায় তেমন করে বেঁকে গেছে। যেন এই শরীরটা তার পলকা কঞ্চির ছিপ, মাটির অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বয়স নামের অদৃশ্য শক্তিশালী এক মাছ এই ছিপে গাঁথা পড়েছে, মাছ তাকে টানছে, টেনে বাঁকা করে ফেলছে। কোন ফাঁকে যে ভেঙে পড়বে ছিপ কেউ জানে না। যুদ্ধটা চলছে। এই যুদ্ধের ফাঁকেই নিজের মতো করে জীবনটা চালিয়ে যাচ্ছে ছনুবুড়ি। এগ্রাম সেগ্রাম ঘুরছে, এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরছে, চুরি করছে, মিথ্যে বলছে। এর কথা ওকে, ওর কথা তাকে, ছনুবুড়ি আছে বেশ। মাথায় পাটের আঁশের মতো সামান্য কিছু চুল, মুখে একটিও দাঁত নেই, একেবারেই ফোকলা, শরীরের চামড়া তীব্র খরায় শুকিয়ে যাওয়া ডোবানালার মাটির মতো, পরনে এটেল মাটি রঙের একখানা থান, হাতে বাঁশের একখানা লাঠি আর দুচোখে ছানি নিয়ে কেমন করে যে এসব কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ছনুবুড়ি, ভাবলে তাজ্জব লাগে।
আজ দুপুরে সড়কের ওপাশে, পুবপাড়ার জাহিদ খাঁর বাড়ি গিয়েছিল ছনুবুড়ি। জাহিদ খাঁর ছেলের বউদের অনুনয় করে দুপুরের ভাতটা সেই বাড়িতেই খেয়েছে। খেয়ে ফেরার সময় ছানিপড়া চোখেই দেখতে পেয়েছে বাড়ির পেছন দিককার সবজি বাগানে বেগুন ফলেছে, টমেটো ফলেছে। এখনও তেমন ডাগর হয়নি বেগুন, টমেটোগুলো ঘাসের মতো সবুজ, লাল হতে দিন দশ বারো লাগবে। কিন্তু চুরির লোভটা সামলাতে পারেনি সে। বার দুতিনেক এদিক ওদিক তাকিয়ে টুক টুক করে দুতিনটে বেগুন ছিঁড়েছে, চার পাঁচটা টমেটো ছিঁড়েছে। তারপর কোনও দিকে না তাকিয়ে পথে নেমেছে।
সার্থকভাবে চুরি করার পর মনে বেজায় একখানা স্ফুর্তি থাকে ছনুবুড়ির। এমনিতেই দুপুরের খাওয়াটা হয়েছে ভালো, ঢেকিছাটা লক্ষ্মীদিঘা চালের ভাত আর খলিসা মাছের। ঝোল, তার ওপর অমন সার্থক চুরি, ছনুবুড়ির স্বভাব জেনেও বাড়ির কেউ টের পায়নি, পথে নেমে বুড়ি একেবারে আহ্লাদে আটখানা। বেগুন টমেটো টোপরে (কোচর) নিয়ে যক্ষের মতো আঁকড়ে ধরে রেখেছে বুকের কাছে আর হাঁটছে খুব দ্রুত। সার্থকভাবে চুরি করে বেরিয়ে আসার পর এই বয়সেও ছনুবুড়ি হাঁটে একেবারে হুঁড়ির মতো। বয়স নামের শক্তিশালী মাছটা টেনে তখন তাকে খুব একটা কাবু করতে পারে না।
