পবনা একটু নড়েচড়ে বসে। তাতে পেটটা একটু আরাম পায়। বুকটা একটু আরাম। পায়। একদিন রাইতে হরিদাসীর বেদনা উঠল। বাইত আছিল একখান গর। দাইমায় কইল, ঐ পবনা তুই গিয়া গাছতলায় ব। এই টেইমে মরদরা গরে থাকে না।
উডানে আছিল একখান রোয়াইল গাচ। আমি হেই গাছের লগে ঢেলান দিয়া বহি। নিশি রাইত। পঙ্খিরাজ গেছে বিলে। আসমানে চুনাকুমড়ার লাহান গোল একখান চান। চান্নী কী! ফক ফক করে। মাইত্তে ফুঁ দিলে ধুলাবালি উড়তে দেহা যায় এমুন। আমি গাচতলায় বইয়া বইয়া বিড়ি টানি আর হুনি গরের মইদ্যে হরিদাসী আহুইজ্জা বেদনায় কোকায়। আমার কেন জানি পরান কান্দে। কেমুন যানি লাগে। এমনু টেইমে হুনি কী, বুজলেন নি কত্তারা, কই জানি বহুত দূরে হেই পইকখান ডাকতাছে। কু কু। হুইনা আমার পরান কান্দে। কেমুন যানি লাগে। বিয়ান অয় নায়, তখন দাইমায় চিক্কইর দিয়া উঠল। হায় হায় রে, কী সব্বনাস অইল গো। আমি দউর পাইরা গরে যাই। গিয়া। দেহি হরিদাসী নিজে গেছে, পেডেরডাও লইয়া গেছে। দেইক্কা আমার যে মাতার মইদ্যে একখান চক্কর মারল, হেই চক্করডা আর কুনদিন গেল না। অহনও আছে।
পবনা তারপর আর কোনও কথা বলে না। উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী যে দেখে, কী যে ভাবে, কেউ জানে না।
খাদায় তখন একটা মাত্র আমৃত্তি। দেখে আউয়াল উঠে দাঁড়ায়। মরা বটপাতার মতো মুখটা নিয়ে বলে, খাইয়া হালা পবনা। বাইত যামু। ম্যালা রাইত অইল।
কাশেম বলল, দেরি করচ ক্যা পবনা? খাইয়া হালা।
পবনার তখন পেটটা কেমন করে, বুকটা কেমন করে। এত কালের পুরনো শরীরটা আর নিজের মনে হয় না। ভাবটা চেপে থাকে পবনা। মুখে খুব বিনীতভাবে বলে, কত্তারা, এইডা না খাইলাম। কুত্তাড়া হারাদিন বইয়া রইল, এইডা অরে দেই।
শুনে গর্জে ওঠে আউয়াল। বানড়ামি পাইছ বেডা হালা। খাও। নাইলে অহনঐ পিডামু। পবনার আর কথা বলার মুখ থাকে না। মনে মনে কুত্তাটার কাছে ক্ষমা চায় সে। ভাইরে ক্ষমা কইর।
তারপর শেষ আমৃত্তিটা মুখে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় পবনা। দাঁড়িয়ে টের পায় এতকালের পুরনো শরীরটা আর তার নিজের মধ্যে নেই। অচেনা হয়ে গেছে।
তখন ভিড়টা ভাঙছে। দোকানিরা পবনার গর্বে বুক ফুলিয়ে ফিরে যাচ্ছে। কত পদের কথা তাদের। সাব্বাস পবনা, বাপের নাম রাখছচ।
পবনা এ সবের কিছুই শোনে না। অচিন শরীরখান টেনে টেনে, চাঁদের ম্লান আলো মাথায়, নদীর দিকে হেঁটে যায়। পৃথিবীর দূর কোনও প্রান্তে বসে কি সেই পাখিটা তখন ডাকছিল। কু কু!
পরদিন সকালে মাছচালার ধুলোবালি থেকে মুখ তুলে নেড়ি কুত্তাটা তার প্রভু পবন ঠাকুরকে খোঁজে। নেই।
কুত্তাটা তারপর ওঠে। উঠে বাজারময় চক্কর খায়। প্রভুকে খোঁজে। নেই, প্রভু কোথাও নেই।
কুত্তাটা তারপর মন খারাপ করে নদী তীরে যায়। সেখানে জেলেদের দুতিনখান নাও ডাঙায় উপুর করে রাখা। মেরামত হবে। আলকাতরা মাইটা তেল খেয়ে আবার জলে নামবে।
কুত্তাটা দেখে দুখান নাওয়ের মাঝখানে মাটিতে তার প্রভু পবন ঠাকুর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। দেখে কুত্তাটা দুতিনখান ঘেউ দেয়। পবন ঠাকুর নড়ে না। কুত্তাটা কী বোঝে কে জানে, সে আর ঘেউ দেয় না। একটা নাওয়ের সামনে পা তুলে পেচ্ছাব করে।
গ্রাম মানুষের কথকতা
মিয়াদের ছাড়া বাড়ির দক্ষিণের নামায় এলোমেলোভাবে ছড়ান আটখানা খেজুর গাছ। ভরা বর্ষায় গাছগুলোর কোমর অব্দি ওঠে জল। কোনও কোনও বর্ষায় কোমর ছাড়িয়ে বুক ছুঁই ছুঁই।
এবারের বর্ষা তেমন ছিল না। গাছগুলোর কোমর ছুঁয়েই নেমে গেছে। ফলে প্রায় প্রতিটি গাছেরই কোমরের কাছে স্বচ্ছল গেরস্ত বউর কোমরের বিছের মতো লেগে আছে বর্ষাজলের দাগ। বয়সের ভারে নৌকোর মতো বাঁকা হয়েছে যে গাছটি বর্ষাজল তার পিঠ ছুঁয়েছিল। সারা বর্ষা পিঠ ছুঁয়ে থাকা জল মনোহর একটি দাগ ফেলে গেছে পিঠে। এই গাছটির সামনে দাঁড়িয়ে গভীর আনন্দে একটি শ্বাস ফেলল দবির গাছি। বহুকাল পর প্রিয় মানুষের মুখ দেখলে যেমন হয়, বুকের ভেতর ঠিক তেমন এক অনুভূতি হল তার। ভারের দুদিকে ঝুলছে দশ বারোটা হাঁড়ি। সাবধানে ভারটা গাছতলায় নামাল সে। তারপর শিশুর মতো উজ্জ্বল হয়ে গেল। একবার এই গাছটির গায়ে পিঠে হাত বুলোয় আরেকবার ওই গাছটির। পাগলের মতো বিড়বিড় করে বলে, মা মাগো, মা সগল কেমুন আছ তোমরা? শইল ভালো তো? কেউর কোনও ব্যারাম আজাব নাই তো, বালামসিবত নাই তো?
উত্তুরে হাওয়ায় শন শন করে খেজুরডগা। সেই শব্দে দবির গাছি শোনে গাছেরা তার কথার পিঠে কথা বলছে। ভালো আছি বাজান, ভালো আছি। ব্যারাম আজাব নাই, বালা মসিবত নাই।
বর্ষা নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খেজুরতলায় জন্মেছে টিয়েপাখি রঙের বাকসা ঘাস। কার্তিকের কোনও এক সময় সাতদিনের জন্য নামে যে বৃষ্টি, লোকে বলে কাইত্তানি, এবারের কাইত্তানির ধারায় রাতারাতি ডাগর হয়েছে বাকসা ঘাস। এখন মানুষের গোড়ালি ডুবে যাওয়ার মতো লম্বা।
এইঘাস ছেঁয়ে আছে মরা খেজুর ডগায়। গাছের মাথায় মরে যাওয়ার পর আপনাআপনি ঝরে পড়েছে তলায়। পাতাগুলো খড়খড়ে শুকনো কিন্তু কাঁটাগুলো শুকিয়ে যাওয়ার পরও কাঁটা। টেটার নালের মতো কটমটে চোখে তাকিয়ে আছে। যেন তাদের আওতায় এলেই কারও আর রক্ষা নেই। খেজুরতলায় পা ফেললেই সেই পা ফুটো করে শরীরে ঢুকবে তারা, ঢুকেই অদৃশ্য হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরে কাঁটাফোঁটা জায়গায় কাঁথা সেলাবার উঁচ দিয়ে যতই ঘাঁটাঘাঁটি করুক, খেজুর কাঁটার তীক্ষ্ণ ডগাটির কোনও হদিস মিলবে না। সে মিশে যাবে রক্তে। রক্তবাহী রগ ধরে সারা শরীর ঘুরে বেড়াবে। দেড় দুমাস পর বুক কিংবা পিঠ ফুটো করে বেরুবার চেষ্টা করবে। প্রচণ্ড ব্যথায় মানুষের তখন মরণদশা। কেউ কেউ মরেও।
