গগনবাবু মৃত্যুকে ভয় পান।
গগনবাবুর আত্মীয়স্বজনরা সব আগেভাগেই গ্রাম ছেড়ে কোলকাতা চলে গিয়েছিল। গগনবাবুরও যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কী যেন কী কারণে শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি। তাছাড়া কোলকাতা গিয়ে গগনবাবু করবেনই বা কী! তাঁর যাবতীয় আত্মীয়স্বজনই তো কলকাতায় উদ্বাস্তু। উদ্বাস্তুদের কাছে গিয়ে আরেকজন উদ্বাস্তু কেমন করে আশ্রয় নেবে। খড়কুটোর মতো উড়ে তখন দিন কেটেছে গগনবাবুর। কোলকাতায় না গিয়ে তিনি এসেছিলেন ঢাকায়। সেই যে ঢাকায় এসেছেন ঢাকা থেকে আর বেরন নি। দিন কেটে গেছে। তবে খড়কুটোর মতো উড়তে উড়তে এক সময় ভগবানের কৃপা জুটেছিল গগনবাবুর। এজি অফিসে কেরানির চাকরি পেয়েছিলেন। সেই চাকরি এখন আছে। সত্তর টাকা মাইনেয় ঢুকেছিলেন, এখন পান চারশো আশি। তখন ছিলেন একা। এখন না, খাওয়াপরার মানুষ সাতজন। ঘরভাড়া ষাট টাকা। অতিশয় কষ্টের জীবন। তবুও এই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন গগনবাবু। অভ্যস্ত হওয়ার কারণ অবশ্য সনাতনী। নিঃশব্দে গগনবাবুর সংসার তৈরি করেছে সনাতনী। সেই সংসার টেনেহিঁচড়ে চালিয়ে নিচ্ছে।
সনাতনীর কথা মনে হতেই গগনবাবুর টের পেলেন, চৌকির ওপর, সনাতনী তার পাশে শুয়ে আছে। রাতেরবেলা কখন ছেলেমেয়ে ফেলে ওঠে এসেছে চৌকিতে গগনবাবু টের পাননি। স্বামীর বুকে মুখ রেখে ঘুমোনোর বড় সাধ তার। এতকালের পুরোনো মানুষ গগনবাবু, হলে কী, সনাতনীর টানটা কমেনি। প্রথম যৌবনের মতো এখন স্বামীর বুকে মুখ রেখে ঘুমোতে চায়। ওভাবে ঘুমোলে একহাতে আবার খামছে ধরে রাখে গগনবাবুর একটা বাহু।
হাতাঅলা কোরা গেঞ্জি পরে শোয়ার অভ্যেস গগনবাবুর। সনাতনী যেদিন তাঁর বুকে মুখ রেখে ঘুমোয় সেদিন ঘুমঘোরে গগনবাবুর বাহুর কাছের গেঞ্জি খামছে ধরে রাখে। যেন ওভাবে ধরে না রাখলে সনাতনীকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে নিঃশব্দে পালিয়ে যাবেন গগনবাবু। এমন এক জায়গায় পালিয়ে যাবেন যেখান থেকে মানুষ আর কখনও ফিরে আসে না।
কথাটা ভেবে আজ সকালে আপন মনে হাসেন গগনবাবু। তারপর সনাতনীর হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চান। সনাতনী ঘুমের ভেতর কেঁপে ওঠে। চমকে চোখ মেলে। স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। গগনবাবু কোন কথা বলেন না। গভীর মায়ামমতায় সনাতনীকে চেপে ধরেন।
তখন মেঝেতে শোয়া ছোট মেয়েটি ঘুম ভেঙে হাতের কাছে মাকে না পেয়ে ট্যা ট্যা করে কেঁদে ওঠে। স্বামীর হাত ছাড়িয়ে ওঠে যায় সনাতনী। মেয়েকে দুধ দেবে।
গগনবাবু তারপর আড়মোড় ভেঙে বিছানা ছাড়েন। মাথার কাছে সিজার সিগ্রেটের প্যাকেট আর ম্যাচ থাকে। হাতড়ে হাতড়ে প্যাকেটটা নেন গগনবাবু। ম্যাচটা নেন। তারপর দিনের প্রথম সিগ্রেটটা ধরিয়ে টানতে টানতে ঘর থেকে বেরোন। খানিক পরই বারোয়ারি পায়খানায় লাইন পড়বে। হরিপদর ভাড়াটেরা সব ওঠে লোটাবদনা নিয়ে দৌড়াবে পায়খানার দিকে। তার আগেই কাজটা সেরে রাখা ভালো। পায়খানাটা কুয়োতলার পাশেই। এই ভোরবেলাই কে যেন ঢুকে পড়েছে। কুয়োতলার কাছাকাছি গিয়ে পায়খানার বন্ধ দরোজার দিকে একবার তাকান গগনবাবু। তারপর তাকান কুয়োতলার দিকে। তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নেন।
এতক্ষণে চারদিক বেশ ফরসা হয়েছে। কাঁচা জামরুলের মতন একটা আলো ফুটে ওঠেছে চারদিকে। সেই আলোর তোয়াক্কা না করে গগনবাবুর পাশের ঘরের পাচি, ছাব্বিশ সাতাশ বছরের ধুমসি মেয়েছেলেটা অবলীলায় জল বিয়োগ করছে। দৃশ্যটা দেখে ভারি একটা লজ্জা পান গগনবাবু। পরপর দুবার সিগ্রেটে টান দেন। এক ফাঁকে দেন ছোট্ট একটা গলা খাকারি। গলা খাকারিটা দেন পাচিকে জানান দেওয়ার জন্যে। ভাবখানা এই রকম, ওহে পাচি সাবধান। পর পুরুষে তোমারজল বিয়োগ দেখছে!
কিন্তু পাচি ওসব গা করবার মতো মেয়েছেলে না। লাজলজ্জার বালাই নেই তার। অবলীলায় পরপুরুষের চোখের সামনে কাপড় তুলে বসে যেতে পারে। চান করে বুকের কাপড়-টাপড় ফেলে এতটা বয়স হয়েছে পাচির বিয়ে হয়নি। বিয়ে হয়নি বলেই কি দিনে দিনে অমন বেহায়া আর নির্লজ্জ হয়ে গেছে সে। কুৎসিত সব ক্রিয়াকলাপ ঘটবার সময়ও আশেপাশে তাকিয়ে দেখে না। দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। একরাতে জল বিয়োগ করতে বেরিয়ে পাচির অতিশয় জঘন্য একটি ব্যাপার দেখে ফেলেছিলেন গগনবাবু। তার এবং পাচিদের ঘরের পেছন দিকটার সরুগলিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাচি আর সুবল
সুবল গগনবাবুকে দেখতে পায়নি। পাটি পেয়েছিল। কিন্তু তোয়াক্কা করেনি। নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। কী করবে। এতটা বয়স হয়েছে, বিয়ে হয়নি পাচির। বুড়ো বাপের সাধ্য নেই মেয়ে বিয়ে দেয়ার।
কিন্তু মানুষের শরীর বড় অবুঝ। সে কোন শাসন মানতে চায় না।
পাচির শরীরও শাসন মানে না।
কিন্তু এইসব ক্রিয়াকলাপ তো মানুষ মানুষের চোখ বাঁচিয়ে করে। পাচি অত খোলামেলাভাবে মানুষের চোখের ওপর কেমন করে করে! কেন করে?
যে সমাজে একটি মেয়ে শরীরে ভরা যৌবন নিয়ে নিরন্তর ছটফট করে বেড়ায়, সংসারের অভাব অনটনে যে সমাজে যুবতী কন্যার বিয়ে হয় না, সমাজের দশজন মানুষের চোখের সামনে দিনদুপুরে এই কারণেই কি লীলা করে পাচি আসলে বলতে চাইছে, দেখ হে সমাজবাসী, কেমন করে তোমাদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছি আমি। দেখ আমাকে দেখ। এসব কথা ভাবতে ভাবতে পাচির জন্যে কী রকম একটা মায়া হয় গগনবাবুর। তখন চকিতে একবার ভোররাতে দেখা স্বপ্নের কথা মনে পড়ে তাঁর। ধু-ধু পথের শেষপ্রান্তে একাকী হেঁটে যায় এক মানুষ।
