তাঁতীবাজার থেকে নোয়াব বাড়ি কাছেই। মাইকে আযানের শব্দটা একদম স্পষ্ট পাওয়া। যায়।
ফজর আযানের আগে পুরোনো ঢাকা বড় শব্দহীন হয়ে থাকে। যেন বা মৃত শহর। কোথাও কোন প্রাণের স্পন্দন নেই। আযানের ললিত সুর সেই শব্দহীনতা ভেঙে খান খান করে দেয়। গগনবাবু জানেন এখুনি আস্তেধীরে জেগে ওঠবে পুরোনো ঢাকা। কাক ডাকবে, কলতলায় ভিড় করবে গৃহস্থ নারীপুরুষ। সময়টা গগনবাবুর খুব প্রিয়।
চোখ মেলে গগনবাবু প্রথমে তার ঘরের ভেতরটা দেখেন। লম্বা ধরনের ঘুপটি মতন একটা ঘর। ঘরের অর্ধেক জুড়ে বহুকালের পুরোনো একটা চৌকি। বাকি অর্ধেকে রান্নাবান্না আর ছেলেমেয়েদের শোয়াপড়ার জায়গা। এই ঘরের ভাড়া ষাট টাকা।
গগনবাবু যখন প্রথম আসেন তখন ভাড়া ছিল পনের টাকা। সে অনেককাল আগের কথা। দিনে দিনে ভাড়া বেড়েছে ঘরের। বাড়িঅলা হরিপদ একটা চামার। ছোট জাতের মানুষ তো, কৈবর্ত, চামার হবেই।
শালা একটা পয়সা কম নেবে না। ছসাতটা খুপরি ঘর ভাড়া দিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে রাজার হালে মৌজে জীবন কাটাচ্ছে। কাজকাম কিছুই করে না। ভাড়া তোলে আর খায়। থাকে ছাদের ওপরকার বড় একখানা ঘরে। বাচ্চাকাচ্চা নেই। থাকার মধ্যে আছে। ধুমসি মতন বউটা। বউটা একটু পেটফোলা টাইপের। দেখলে মনে হয় অনন্তকাল ধরে গর্ভবতী হয়ে আছে। কিন্তু সত্যিকার গর্ভবতী সে কখনও হয় না। দোষ বউটার না হরিপদর, কে জানে! গগনবাবুর সময় কোথায় ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর।
গগনবাবুর ঘরের ভেতর এখন এই সকালবেলা একটা অন্ধকার ঘাপটি মেরে আছে। চৌকির একপাশে, মাথার কাছে একটিমাত্র জানালা। দিনরাত খোলা থাকে জানালাটা। হলে হবে কী, আলো যেটুকু আসে তাতে ঘরের অন্ধকার পুরোপুরি কখনও কাটে না। বৃষ্টিবাদলার দিনে তো কথাই নেই, ঘোরতর রৌদ্রের দিনেও অন্ধকারটা গগনবাবুর ঘর থেকে কখনও বেরিয়ে যায় না। চিরকালীন দারিদ্র্যের মতো লেগে আছে।
গগনবাবুর ছেলেমেয়েরা জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে মেঝেতে। হঠাৎ করে তাকালে, বোঝার উপায় নেই ওই অতটুকু জায়গায় পাঁচ পাঁচটি মানুষ শুয়ে আছে।
পাঁচজন মানুষের কী অতটুকু জায়গায় শোয়া হয়।
আহা বড় কষ্ট বাচ্চাগুলোর। দুএকজন ইচ্ছে করলে চৌকির ওপরও শুতে পারে। কিন্তু গগনবাবুর ওই অভ্যেস, অন্যের সঙ্গে এক বিছানায় শুতে পারেন না। এটুকু বনেদিপনা এখনো তার চরিত্রে রয়ে গেছে। ব্যাপারটা সনাতনী বোঝে। ষোল সতের বছর গগনবাবুর ঘর করছে বুঝবে না!
নিজেও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে শোয় সনাতনী। বড় শান্তনম আর ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ সনাতনী। সারা দিনে কথা বলে দশ পনেরটা। সংসার করে যন্ত্রের মতো। ফজর আযানের পর শুরু করে একটানা চালিয়ে যায় রাত নটা দশটা অব্দি। এর কোন বিরাম দেই। হিসেব করলে দেখা যাবে সনাতনী একা আসলে চার মানুষের কাজ করে। রান্নাবান্না, বাসন কোসন মাজা, ছেলেমেয়েদের জামাকাপড় ধোয়া, কী করে না সনাতনী!
গগনবাবুর বড় মেয়েটির বয়স চৌদ্দ বছর। নাম কমলা। কমলারানী মুখার্জী। ক্লাস নাইনে পড়ে। বড় ঢিলেঢালা স্বভাবের মেয়ে। ঘরসংসারের কাজ একদম বোঝে না। স্কুল আর পড়াশুনো নিয়ে আছে। সকালবেলা ওঠে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে ভাই-বোনদের নিয়ে পড়তে বসে কমলা। নটার দিকে ওঠে চানটান করে, রুটি আর ভাজিভুজি খেয়ে যায় স্কুলে। ছোট ছেলে দুটোও যায়। ওরা পড়ে মিউনিসিপ্যালিটির প্রাইমারী স্কুলে। একদম ছোট মেয়ে দুটির একটির বয়স তিন বছর আরেকটির এক বছর দুমাস। এক বছর দুমাসেরটি সনাতনীর বুকের দুধ আর সস্তায় কেনা পাতলা ট্যালট্যালে বার্লি খেয়ে বেঁচে আছে। আহা কোনকালে জন্মাল বাচ্চাগুলো। চারদিকে ঘোরতর অভাব, দুর্দিন। সুখের মুখ দেখল না বাচ্চাগুলো। ভালো খাওয়াপরা পেল না।
ভালো খাওয়া পরা কী, দুবেলা পেটপুরে শাকভাতও তো খেতে পায় না।
এসব ভেবে এই ভোরবেলাই বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস পড়ল গগনবাবুর।
নিয়তি!
সব নিয়তি!
নয়তো কী জীবন ছিল গগনবাবুর, কী হয়ে গেছে।
গগনবাবুর ছিলেন বিক্রমপুরের বনেদি হিন্দু। মুখার্জী। বানীখাড়ার ছোটখাটো জমিদার ছিলেন গগনবাবুর বাবা স্বর্গীয় জীবন মুখার্জী।
জীবন মুখার্জীর একমাত্র সন্তান গগন মুখার্জী। গগনবাবু।
গগনবাবু ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন কলকাতা গিয়ে। সঙ্গে দুজন চাকর। টাকা পয়সার অভাব নেই, খাওয়া-দাওয়ার অভাব নেই। মুখ দিয়ে যে জিনিসের নাম উচ্চারণ করতেন, জীবন মুখার্জীর একমাত্র ছেলে, সঙ্গে সঙ্গে জিনিসটি হাতের কাছে এসে হাজির হত।
আহা! কী জীবন কী হয়ে গেছে। এখন সেই জীবনের কথা ভাবলে বিশ্বাস হয় না। মনে হয় কিচ্ছাকাহিনী।
জীবন মুখার্জী গত হলেন পার্টিশনের আগের বছর। খুবই জাঁদরেল ধরনের মানুষ ছিলেন। দোর্দণ্ড প্রতাপ তার। তার ছেলে গগনবাবু হয়েছেন খুব নিরীহ প্রকৃতির। সরল সোজা। জমিজিরাতের ঘোরপ্যাঁচ যেমন বুঝতেন না তেমন, বুঝতেন না জীবনের ঘোরপ্যাঁচ। ফলে হাতছাড়া হয়ে গেল সব।
পার্টিশনের আগের বছর দেশ জুড়ে ভয়াবহ দাঙ্গা হাঙ্গামা শুরু হয়েছিল। যেসব মুসলমান কৃষক জীবন মুখার্জীর বর্গা জমির দখল ছাড়তে নারাজ তাদের মধ্যে কেউ কেউ জীবন মুখার্জীর একমাত্র উত্তরাধিকার গগন মুখার্জিকে জানে মেরে ফেলার পাঁয়তারা করছিল। রাতের অন্ধকারে গরু কোরাবানি দেয়ার ছুরি নিয়ে আসবে গগন মুখার্জীকে কোরবানি দিতে, কথাটা শোনার পরই সামান্য টাকা-পয়সা যা হাতে ছিল তাই নিয়ে গ্রাম ছেড়েছিলেন গগন বাবু। সে কতকাল আগের কথা। তারপর আর কখন। গ্রামে ফেরা হয়নি গগনবাবুর। এখনও মাঝেমধ্যে গ্রামের জন্যে মনটা বড় কাঁদে। এই তো ঢাকার খুব কাছেই তাঁদের সেই গ্রাম। মুন্সিগঞ্জ থেকে দীঘিরপাড় যাওয়ার পথে পড়ে। সকালবেলা বেরুলে দিনে দিনে ঘুরে আসা যায়। কিন্তু যাওয়া হয়নি গগনবাবুর। সেই ভয়টা মনের তলায় এখন লুকিয়ে আছে। গেলে যদি সেই মুসলমান কৃষকরা কিংবা তাদের উত্তরাধিকার কেউ গরু কোরবানি দেয়ার ছুরি নিয়ে গগনবাবুকে কোরবানী দিতে আসে।
