আমার অপেক্ষায় সেকী এখনও জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে! নাকি পাঁচ দিনের পা ব্যথা আমার জীবন থেকে প্রিয়তম দৃশ্যটা হরণ করেছে।
সন্ধের মুখে মুখে যখন দিদি ধুপতি জ্বালিয়ে দিয়েছে হিরুর বইপত্র রাখার বাক্সটার ওপর, যেখানে দেয়ালের সঙ্গে ঝুলছে ফুটপাথ মার্কা কালীর বাঁধানো ছবি, তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। তারপর দুচাত নমস্কারের ভঙ্গিতে বুকে কাছে তুলে মনে মনে কালীকে বলি, মা মাগো সে যেন আমার অপেক্ষায় থাকে।
কী আশ্চর্য, কথাটা মনে মনে উচ্চারণ করি আর আমার চোখ জলে ভরে আসে, কেন যে!
.
সকালবেলার পৃথিবী খুব সুন্দর লাগছে আজ। ফুরফুরে একটা হাওয়া আছে, ট্যালট্যালে বার্লির মতো আলো ফুটো করে বেরিয়ে যাচ্ছে। বাড়ি থেকে বেরিয়েই বহুকাল বাদে মনটা বড় ভালো হয়ে যায় আমার।
আজ আমি কেডস পরিনি, খেলার প্যান্ট গেঞ্জি পরিনি। সবুজ রঙের পুরনো লুঙি আর বাঁ বগলের কাছে ফেঁসে যাওয়া পাতলা পাঞ্জাবি পরে বেড়িয়েছি। এখনও ভালো করে হাঁটতে পারি না। ডান পাটা টেনে টেনে হাঁটি। ভালো করে পা ফেললে ব্যথাটা চিলিক দিয়ে ওঠে।
খুঁড়িয়ে হাঁটছি। তবুও আমার মন খারাপ হয় না। কতদিন দেখি না তাকে। আজ দেখা হবে। মা কালীর আশীর্বাদে দোতলার জানালায় ছবির মতো দাঁড়িয়ে থাকবে সে। ঘরের ভেতর জ্বলবে নীল পাতলা আলো। ক্যাসেটে বাজবে মিষ্টি মিউজিক। আহ।
দীননাথ সেন রোডে সেই সুন্দর বাড়ি। ছবির মতন। শাদা দোতলা। সামনে চমৎকার বাগান। বাগানে কত যে ফুল ফুলের মতো ফুটে আছে। বারান্দায় একটা এলসেশিয়ান, গ্যারাজে একটা নীল গাড়ি।
নীল কি এ বাড়ির প্রিয় রঙ!
এসব ভাবতে ভাবতে সে বাড়ির মুখোমুখি লাইটপোস্টটির তলায় গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু গেটের সামনে একটা লালহোন্ডায় বসে আছে রাজপুত্রের মতো এক যুবক। একটা পা মাটিতে নামানো। কালো প্যান্ট আর সাদার ওপর চক্রাবক্রা শার্ট পরা। বুকের কাছে দুটো বোতাম খোলা, গলায় সোনার চেন। বুকের কাছে লেপটে আছে আধুলির মতো লকেট। হাতে দামি সিগারেট, থেমে থেমে টানছে সে।
এত সকালে এই যুবক কী করছে এখানে! এ বাড়ির কাউকে নিয়ে যুবকের কি দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা!
ঠিক তখুনি দোতলা থেকে চারদিকের পৃথিবী সুন্দর করে নেমে আসে সেই মেয়ে। পরনে তার সমুদ্র রঙের শাড়ি। ব্লাউজ নীল রঙের। কপালে চাঁদের মতো টিপ। নীল রঙের। দেখে আমি সব ভুলে তাকিয়ে থাকি। ঘোর লেগে যায়।
যুবকের হোন্ডার সামনে এসেই মিষ্টি করে হাসল সে। তারপর কী বলে, আমার সে কথা কানে যায় না। আমি অবাক হয়ে তাকে দেখি। ঈশ্বর এত সুন্দর মানুষও তৈরি করেছেন পৃথিবীতে! তার হাসিতে আমি দেখতে পাই, এইমাত্র মনোরম আলোয় ভরে গেল পৃথিবী। কিন্তু সেই মেয়ে একবারও আমার দিকে তাকায় না। সেকি আমায় চিনতে পারে না! সে ততক্ষণে যুবকের হোন্ডার পেছনে চড়ে বসেছে। আমি তার পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি নীল সুন্দর স্যান্ডেল পরা। শাড়ি একটুখানি ওঠে আছে। আহ পায়ের রঙ কী তার। পাকা সবরি কলার মতো। আমি অপলক তাকিয়ে থাকি।
বারান্দা থেকে এলসেশিয়ানটা এসে দাঁড়িয়েছে গেটের সামনে। যুবক হোন্ডা স্টার্ট দিতেই সে ডান হাতে যুবকের কোমর জড়িয়ে বলল, গুডবাই।
আমি মনে মনে বলি, গুডবাই। মুহূর্তে চোখের ওপর থেকে দৃশ্যটা হারিয়ে যায়। তখন বুঝতে পারি সে গুডবাই দিয়েছিল কুকুরটাকে।
বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে।
সেই সময় চার পাঁচজন বৃদ্ধ, সৌম্য সম্রান্ত চেহারায়, দামি লাঠি হাতে দ্রুত আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। বেচে থাকার নেশা। ভোরবেলা হাঁটাহাঁটি করলে পরমায়ু দীর্ঘ হয়ে যায়। এই মুহূর্তে আমি ঠিক বুঝতে পারি না, মানুষ যে কেন দীর্ঘকাল পৃথিবীতে বেচে থাকতে চায়।
আমি আস্তেধীরে সেই বাড়ির সামনে থেকে ফিরে আসি। ফিরে সোজা মিলব্যারাক মাঠ। মাঠে হাঁটাহাঁটি করছে দুএকজন, তাদের চার পাশে আবছা মতন কুয়াশা ঝুলে আছে, আমার চোখে মাঠটা বড় দুঃখী, বড় উদাস দেখায়। মাঠের কোণে স্যান্ডেল দুটো খুলে আমি রাখি। তারপর লুঙি কাছা মেরে, সেই ছেলে বেলা একবার যেমন খেলতে নেমেছিলাম, হুবুহু সেই স্টাইলে মাঠে নামি। ডান পাটা ব্যথা করে। তবু আমার আবার শুরু করতে হবে। আমি আস্তেধীরে দৌড়াতে থাকি। দৌড়াতে থাকি।
গগনবাবুর জীবন চরিত
ভোররাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেন গগনবাবু। ধু-ধু কালো একটা পথ নির্জনে পড়ে আছে। পথের দুপাশে সার ধরা গাছপালা। কোথাও কোনও শব্দ নেই, হাওয়া নেই। পাতলা বার্লির মতো ম্লান একটা আলো ফুটে আছে চারদিকে। সেই আলোয় কালো পথটা বড় অলৌকিক মনে হয়। দূরে বহুদূরে পথের একেবারে শেষ মাথায় সাদা। পাজামা পাঞ্জাবি পরা একজন মানুষ ছোট্ট পাখির মতো ধীরে হেঁটে যায়। কোথায় কোন প্রান্তরের দিকে যায, গগনবাবু বুঝতে পারে না।
ঘুম ভেঙ্গে যায়।
ঘুম ভাঙার পরও গগনবাবু খানিক বুঝতে পারেন না জেগে আছেন, না ঘুমিয়ে। স্বপ্নের শেষ দৃশ্যটা তখনও লেগে আছে তাঁর চোখে। ধু-ধু পথের একেবারে শেষ প্রান্তে ধীরে মন্থর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে একাকী এক মানুষ। দূর থেকে মানুষটাকে দেখায় ছোট্ট পাখির মতো।
তখনি নোয়াব বাড়ির মসজিদ থেকে ফজর নামাযের আজান ভেসে আসে।
