কিন্তু সে কবে?
এসব ভেবে একটা টিউশানি যোগাড় করেছিলাম। তনুগঞ্জ লেনে। ক্লাস এইটের ছাত্রী দিপু। দিপু খুব সুন্দর ছিল। দিপুকে প্রথম দিন দেখেই আমি আমার ছোট্ট নোট খাতায় লিখেছিলাম, দিপু খুব সুন্দর। লেখাটি দিদি কেমন করে দেখে ফেলে। তারপর আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, দিপু কে রে?
আছে একজন।
শুনে ঠোঁট টিপে হেসেছিল।
মাস ছয়েক চালিয়েছিলাম টিউশনি। ততদিন আমার আশা ছেড়ে বাবা চোখ দিয়েছেন। হিরুমিরুর দিকে। ওদের কারো যদি হয়। কিন্তু ওদুটো আরো বাজে ছাত্র। সেভেন এইটেই ফেল করে। ছোট বোনগুলোও গাধা। কাউকে দিয়ে বাবার আশা পূরণ হবে না। বাবা একদম হারু পাট্টি।
অন্ধকার বিছানায় শুয়ে এসব ভাবছি। পায়ে ব্যথা। ঘুম আসে না। বাবার জন্যে দুঃখে মন ভরে যায়। সংসারে কিছু কিছু লোক আছে যাদের কোনও স্বপ্নই সত্য হয় না। বাবা সেই দলের ক্যাপটেন। হারু ক্যাপটেন। দুয়ো।
.
ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায়। লোহারপুল মসজিদে তখন আজানের শব্দ। এই শব্দটা বরাবরই আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু আজ ঘুম ভাঙতেই টের পাই ডান পায়ে অসম্ভব ব্যথা। শরীরটাও গরম হয়ে গেছে। আর কেমন একটা অস্বস্তিভাব। গা চুটপুট করে। ব্যথায় জ্বর এসে গেছে।
ওঠে বসব, পারি না। ডান পাটা একদম নাড়তে পারি না।
লোহারপুলের বিমের মতো ভারি হয়ে গেছে।
বিছানায় শুয়ে থেকেই দেখি আবছা অন্ধকারে বাবা চান করতে যাচ্ছেন বুড়িগঙ্গায়।
ভাইবোনরাও সব ওঠে পড়েছে। গুনগুন করে পড়ছে শব্দ পাওয়া যায়।
আমাদের ঘরটা একদম খুপরি। অনেকটা বেলা হলেও বোঝা যায় না। সারাদিন ঘাপটি মেরে থাকে অন্ধকার। সাড়ে সাতটা আটটা পর্যন্ত হারিকেন জ্বালিয়ে, কুপি জ্বালিয়ে পড়াশুনা করে ভাইবোনগুলো। বৃষ্টিবাদলার দিনে সারাদিন হারিকেন জ্বলে ঘরে।
রোজ এসময় আমিও ওঠে পড়ি। ওঠে খেলার প্যান্ট পরি, ডোরাকাটা গেঞ্জি আর কেডস পরে দৌড়াতে বেরুই। কালীচরণ সাহা রোড থেকে শুরু করে সতীশ সরকার রোড হয়ে লোহারপুর বাঁয়ে রেখে ভাট্টিখানা হয়ে সোজা ডিস্টিলারি রোড। তারপর ধূপখোলা মাঠের চারদিক ঘুরে দীননাথ সেন রোড হয়ে মিলব্যারাক মাঠ। দৌড়লে দম বাড়ে। প্র্যাকটিস করতে সাইকেল নিয়ে ক্লাবের মাঠে যাই বিকেলবেলা। গত দুবছর এর কোনও ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু আজ আমি ডান পা নড়াতেই পারছি না। দৌড়তে যাব কেমন করে!
খারাপ লাগে। সে আমার অপেক্ষায় জানালায় দাঁড়িয়ে থাকবে। ঘরে তার নীল ডিম লাইট জ্বলবে। মিষ্টি সুরে বাজবে মিউজিক। এই তেইশ বছরের জীবনে ওই একটিমাত্র সুন্দর দৃশ্য আমার অপেক্ষায় থাকে। হায় কতদিন যে ওই প্রিয় দৃশ্যটির কাছে আমার। ফিরে যাওয়া হবে না!
রাগে-দুঃখে আমার কান্না পেতে থাকে।
.
দুপুরবেলা বাবা গম্ভীরমুখে আমাকে একটা ইনজেকশান দিলেন। হিরু বোধহয় ডিসপেন্সারিতে গিয়ে বাবাকে খবর দিয়েছিল। সকাল থেকে আমার বেঘোর জ্বর। পায়ের ব্যথাটা মারাত্মক হয়ে গেছে। কেন যে এরকম ব্যথা হল, কিছু বুঝতে পারি না। ব্যথায় সারা সকাল ককিয়েছি। চায়ের সঙ্গে দুটো ব্যথার বড়ি খেয়েছি। কাজ হয়নি। মার তো আর আমার দিকে চোখ দেয়ার সময় নেই। দিদি আমার সঙ্গে আছে। সকাল থেকে কতবার যে গরম জলে বরিক পাউডার দিয়ে পায়ে স্যাক দিয়েছে। তাতে ব্যথাটা খানিক কমে। স্যাক বন্ধ হলেই আবার বাড়ে। দিদিকে কাহাতক বলব লজ্জা করে।
বাবা ইনজেকশান দেয়ার পর ব্যথাটা আস্তেধীরে কমে আসে। মা পাতলা ট্যালট্যালে বালি দেন খেতে। চোখ বুজে খেয়েই নিই। বালি খাওয়ার অভ্যেস আছে আমার। জন্মে। আমি কখনও দুধ পাইনি। মার বুকের দুধ ছাড়া। আমার কোনও ভাইবোনও পায়নি। ছেলেবেলায় বার্লির সঙ্গে মা আমাদের চালের আটা গুলে খাওয়াত। রাতের বেলা শোয়ার আগে মাকে রেগুলার দেখতাম দুমুঠো চাল ভিজিয়ে রাখতেন। সকালবেলা সেই চাল বেটে বার্লির সঙ্গে জ্বাল দিয়ে রাখতেন। ছেলেবেলায় ওই ছিল আমাদের সারাদিনের খাদ্য।
বিকেলের মুখে, বেরিয়ে যাবার সময় বাবা এক পলক আমাকে দেখে যান। কথা বলেন না। ইনজেকশান দেবার সময়ও বাবা আমাকে কোনও কথা জিজ্ঞেস করেননি।
বাবার কি আমার উপর রাগ! বহুকাল বাবা আমার সঙ্গে কথা বলেন না।
আজ বাবা যখন আমাকে ইনজেকশান দিচ্ছিলেন তখন সেই মারাত্মক ব্যথা এবং জ্বরের ঘোরেও আমি বাবাকে একটু খেয়াল করে দেখি। বহুকাল বাবাকে এত কাছ থেকে দেখা হয়নি। বাবার চেহারাটা কেমন ভেঙে গেছে। দেখে আমার বুকটা কেমন করে। বাবার কত স্বপ্ন ছিল আমি ডাক্তার হব। দিদির ভালো জায়গায় বিয়ে হবে। কোনও স্বপ্নই সত্য হয়নি। লোকটা চিরকাল হেরে গেল।
.
পাঁচ দিনের মাথায় আমি একটু একটু হাঁটাচলা করতে পারি। ব্যথাটা কমে গেছে। জ্বরও। তবুও মা আমায় বেরুতে দেন না। পাঁচদিন প্র্যাকটিসে যাইনি বলে পরশুদিন রঞ্জু ভাই এসেছিলেন। এসে দেখেন আমি বিছানায়। দেখে তো হা। অনেক প্যাচাল পাড়লেন। ভাগ্য ভালো শিঘ্র আমাদের কোনও খেলা নেই। রঞ্জু ভাই বললেন, আরো সপ্তাহখানেক রেস্ট নে। তারপর তিনশো টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে চলে গেলেন। আমার পথ্যটথ্য লাগবে। বুঝতে পারি এ সবই সেদিনের গোল দেয়ার ফল। কাল বিকেলে বিছানা ছেড়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়িময় খানিকটা হাঁটাহাঁটি করেছি। আজ বিকেলে কেন যেন মনে হয় আমার বুঝি পুনর্জন্ম হল। কাল থেকে নতুন করে আমি আবার সব শুরু করব। অবশ্য আরো দুচারদিন ফ্রিলি দৌড়তে পারব না। তবুও কাল সকালে আমাকে বেরুতেই হবে।
