গোল হতেই গ্যালারি করতালিতে ভেঙে পড়ে। শুরু হয় তুমুল হৈ চৈ। দলের খেলোয়াড়রা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। চার পাঁচজন শূন্যে তুলে দোলায়। সেই অবস্থায় আমি গ্যালারির দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ি। হাসি। সিকি মিনিটে সিকি শতাব্দী সময় পেরিয়ে যায়।
প্রতিপক্ষের তিনজন খেলোয়াড় মধ্যমাঠে সার ধরে দাঁড়িয়েছে। সেন্টার হয়ে গেল। বল আফসানের পায়ে। আফসান লম্বা শট করল। আমার এখন আর কোনও উত্তেজনা নেই। বলটা চড়ুই পাখির মতো মধ্যমাঠে নাচানাচি করছে। প্রতিপক্ষ খুব উইক হয়ে গেছে। ড্র হলেও মানইজ্জত থাকত! এখন সময়ও নেই। গোল শোধ করার প্রশ্নই ওঠে না।
হঠাৎ দেখি বলটা আমার দিকে ছুটে আসছে। কে পাস দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারিতে হৈ চৈ। পাবলিক সিওর হয়ে গেছে, বীরুর পায়ে বল এলেই গোল। কিন্তু আমি গা করি না। আর গোল দিয়ে কী হবে। জিতে তো গেছিই।
ডান পায়ে আলতো করে বলটা ধরে রাখি। প্রতিপক্ষের কামালকে দেখি গুলতির গুলির মতো ছুটে আসছে। বলটা নইমকে পাস দিই আমি। তখুনি রেফারির বাঁশি বেজে ওঠে। খেলা শেষ। গ্যালারিতে আরেক রাউন্ড হৈ চৈ। আমাদের সাপোর্টাররা একতালে হাততালি বাজাতে থাকে। আমরা আস্তেধীরে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসি।
কী আশ্চর্য, খেলার সময় টের পাইনি বুটের ভেতর ডানপায়ের পাতায় মৃদু একটা ব্যথা। এখন হাঁটার তালে নেচে ওঠছে ব্যথাটা। কী হল?
আজ তো মারেনি কেউ!
রঞ্জু ভাই, ক্লাব সেক্রেটারি বললেন, বীরু আজ তুই ক্লাবেই থেকে যা। রাতে হেভি চলবে।
আমি কথা বলি না। একটা মাত্র গোল দিয়ে ক্লাবকে আমি আজ জিতিয়েছি। আমার আজ খাতির হবে অন্যরকম। রাতেরবেলা ক্লাবের সব এডভাইজাররা আসবেন। খাওয়া-দাওয়া হবে। পরে চলবে ড্রিংকস আর রাতভর ফ্লাশ খেলা। দারুণ কাটবে রাতটা। যদিও আমি মদ খাই না, ফ্লাশ খেলার তো প্রশ্নই ওঠে না! টাকা কই! আমি তো আর পয়সাঅলা বাপের পোলা নই।
তবুও ক্লাবে থাকলে আড্ডাফাজ্ঞা মেরে ভালো কাটত রাতটা! উপায় নেই। ক্লাবে থাকলে বাবা রাগ করেন। অথচ ক্লাবে থাকলে কত সুবিধে ছিল। সিঙ্গেল রুম পেতাম। রেগুলার প্রাকটিসটা হত ভালোভাবে। অন্তত ফুটবল সিজনটা। কিন্তু বাবা একদম নারাজ। ব্যাকডেটেড লোক। তার ধারণা খেলাধুলা জিনিসটাই খারাপ। তার ওপর ক্লাবে থাকলে চরিত্র নষ্ট হয়ে যাবে।
শালা চরিত্র।
বাবার ইচ্ছে ছিল আমি ডাক্তার হব। কিন্তু লেখাপড়ায় আমি কখনও তেমন ভালো ছিলাম না। টেনেটুনে ক্লাশ ডিঙাতাম। তবুও বাবার ইচ্ছেয় ইন্টারমিডিয়েট পড়েছিলাম সায়েন্স নিয়ে। বায়োলজি মেইন সাবজেক্ট। পর পর তিনবার পরীক্ষা দিয়েও ইন্টারমিডিয়েট পাস করা আমার হয়নি। বলতে কি লেখাপড়া ব্যাপারটা আমি কখনও তেমন সিরিয়াসলি নিইনি। আমার ভালো লাগত না।
ছেলেবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি অদ্ভুত টান ছিল আমার। মনে আছে, আমি যখন খুব ছোট, পাড়ার পাঠশালায় পড়ি, তখন আমাদের মিলব্যারাক মাঠে রেগুলার খেলাধুলা হত। ফুটবল সিজনে ফুটবল, ক্রিকেট সিজনে ক্রিকেট। আমি পাঠশালায় না গিয়ে, বগলে বইশ্লেট, শীতকালের সকালে মাঠে চলে যেতাম ক্রিকেট খেলা দেখতে। বাবা কতদিন ডিসপেন্সারি থেকে ফেরার পথে আমাকে কান ধরে বাড়ি নিয়ে এসেছেন।
তারপর আরো বড় হয়ে, যখন গেণ্ডারিয়া হাই স্কুলে পড়ি, তখন থেকে তো আমি হায়ারে খেলি। পাড়ার ভালো প্লেয়ার, স্কুল টীমের এক নম্বর প্লেয়ার। সবাই বেশ খাতির টাতির করে। সেই বয়সে আমি স্কুল পালিয়ে রেললাইন ধরে স্টেডিয়াম চলে যেতাম খেলা দেখতে। শুনে বাবা আমাকে কম মারধোর করেননি। সেই মারের কথা ভাবলে এখনও সিরসির করে ওঠে।
একদিন, তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি, টেস্ট পরীক্ষার দুমাস বাকি। বাবা মাস্টার রেখে দিয়েছেন। বিকেলবেলা আমি সেই মাস্টার, আমাদের স্কুলের সবচে ভালো টিচার ফখরুল স্যারের বাসায় গিয়ে পড়ে আসি। স্যারের বাসায় পড়তে যেতাম ঠিকই, কিন্তু আমার একদম ভাল্লাগত না। ফখরুল স্যার এক অঙ্ক কী যে যত্নে তিন চারবার করে বোঝাতেন। আমার মাথায় ঢুকত না। আসলে হত কি, ফখরুল স্যার অঙ্ক করিয়ে যেতেন, আমি সেই অঙ্কের পরিবর্তে খাতায় দেখতাম উদাস একটা মাঠের ছবি। বাইশজন প্লেয়ার ফুটবল খেলছে সেই মাঠে। এই সুন্দর বিকেলে আমি ফখরুল স্যারের কাছে বন্দি হয়ে আছি, আর সবাই খেলছে। আমার খুব মন খারাপ হয়ে যেত। একদিন। অঙ্ক করতে না গিয়ে বইখাতা নিয়ে চলে গেলাম মাঠে। সেদিন মিলব্যারাক মাঠে ধুপখোলা ভার্সাস মিলব্যারাক খেলা। আমি মাঠে যেতেই সবাই চেপে ধরল, বীরু তোকে খেলতে হবে। পাড়ার প্রেস্টিজ। শুনে আমি একটু কাইকুই করি। আমার পরনে লুঙি, পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। লুঙি পরে কি খেলা যায়। অবশ্য বাসায় আমার খেলার প্যান্ট আছে, বুট নেই কিন্তু এনক্লেট আছে। কিন্তু বাসায় এখন যাওয়া যাবে না।
আমি লুঙি কাছা দিয়ে, বইখাতা পাড়ার পোলাপানের হাতে দিয়ে খালি পায়ে খেলতে নামি। ইস কী খেলা যে খেলেছিলাম সেদিন! হাফ টাইমের সময় মাঠে হাত পা ছড়িয়ে বসে দুপয়সা দামের আইসক্রিম খাচ্ছি। আমার চারপাশে ছোটখাটো ভিড় লেগে আছে। ভিড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে দেখি বাবা আসছেন। নিশ্চয় কোনও রোগীকে ইনজেকশান দিতে যাচ্ছেন। দেখে আমার হয়ে যায়। যে ছেলেটির হাতে আমার বইখাতা ছিল, তাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ছোঁ মেরে বইখাতাগুলো নিয়ে ভোঁ দৌড়। মাঠের সবাই তো হা। কিন্তু বাবা ততক্ষণে আমাকে দেখে ফেলেছেন। ব্যাপারটা বুঝতে পাড়ার ছেলেদের দেরি হয় না।
