ঝড়বৃষ্টি দেখে রিকশা রেখে লাইটপোস্টের নিচে দাঁড়িয়েছিল লোকটা। কী দুর্ভাগ্য দেখুন, লাইটপোস্টটা কাত হয়ে পড়ল বুকের ওপর।
মারা গেছে?
হ্যাঁ, বোধ হয় সঙ্গে সঙ্গেই।
শুনে বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে আলাউদ্দিন আলীর। চৌষট্টির রায়টে হারিয়ে যাওয়া কামালউদ্দিনের কথা মনে পড়ে। তারপর ভিড় ঠেলে যুবকের লাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। উপুড় হয়ে পড়ে আছে। মুখ দেখার উপায় নেই। শুধু কুচকুচে কালো পিঠটা দেখা যায়। পিঠভর্তি ঘামাচি। বছরের প্রথম বৃষ্টি পেয়ে, ঘামাচি মারার লোভেই কি সে রিকশা নিয়ে লাইটপোস্টের তলায় বসেছিল। যুবক কি জানত গোপনে তার আজরাইল এসে বসে আছে ওই লাইটপোস্টে।
হারিকেন হাতে ফিরে আসতে আসতে আলাউদ্দিন আলী মনে মনে বলল, ভাই আমার ভাই। কথাটি কি সে এই যুবক না চৌষট্টির রায়টে হারিয়ে যাওয়া ভাই কামালউদ্দিনের উদ্দেশে বলল, বুঝতে পারে না।
ঘরে এসে আলাউদ্দিন আলী দেখে বহুকাল বাদে ঠাণ্ডা পেয়ে নিঃসাড়ে ঘুমুচ্ছে সুফিয়া। বউটাকে আর ডাকে না সে। হারিকেন নিবু নিবু করে তার পাশে শুয়ে পড়ে। কিন্তু শুয়ে না পড়ে এতকাল বাদে ঠাণ্ডা রাত পেয়েও ঘুম আসে না তার। হারিয়ে যাওয়া ভাইটার কথা মনে পড়ে। আর চোখের ওপর বারবার ভেসে ওঠে উপুড় হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা। রিকশাঅলা যুবকের লাশ। কামালউদ্দিন নয় তো!
ঘুম আসে না আলাউদ্দিন আলীর। অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে না ঘুম না জাগরণ এমন। একটা অবস্থায় সুফিয়ার পাশে পড়ে থাকে সে। ভোররাতে একটু তন্দ্রামতন এসেছিল। হঠাৎ সুফিয়ার চিৎকারে লাফিয়ে ওঠে আলাউদ্দিন আলী। দেখে ঘরে ষাট পাওয়ারের বালব জ্বলছে। বিকেলবেলাটা ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়েছিল। সুইচ অফ করা হয়নি বলে লাইটটা ইলেকট্রিসিটি ফিরে পেয়ে আপনা আপনি জ্বলে ওঠেছে। আর সেই আলোয় মেঝেতে গড়াগড়ি খেয়ে চিৎকার করছে সুফিয়া। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে।
প্রথমে আলাউদ্দিন আলী কিছুই বুঝতে পারে না। ভ্যাবলার মতন খানিক বসে থাকে চৌকির ওপর। তারপর লাফিয়ে নেমে সুফিয়াকে জড়িয়ে ধরে। কী হয়েছে?
সুফিয়া কথা বলতে পারে না। গোঙায়। ব্যথায় মুখ দিয়ে ফেনা ওঠছে তার। নিম্নাঙ্গ ভেসে যাচ্ছে রক্তে, মেঝে ভেসে যাচ্ছে।
আলাউদ্দিন আলী কী করবে বুঝতে পারে না। বারান্দায় ছুটে এসে দোতলায় লোকদের ডাকে। একটু আসুন তো দয়া করে। আমার ভারি বিপদ।
মিনিট পাঁচেক পর বাড়িঅলা সাদেক সাহেব আর তার স্ত্রী নেমে আসেন। সাদেক সাহেবের স্ত্রী সুফিয়াকে এক পলক দেখেই বললেন, আলী সাহেব ডাক্তার ডেকে আনুন। আপনার স্ত্রীর এবরসন হয়ে গেছে। শুনে মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায় আলাউদ্দিন। আলীর। নিজেকে নিজেই মিনিট দুয়েক চিনতে পারে না সে।
কিন্তু এই ভোররাতে আলাউদ্দিন আলী কোন ডাক্তারের কাছে যাবে, খানিক বুঝতে পারে না। এক সময় মনে পড়ে সাবেক শরাফতগঞ্জ লেইনে মফিজ ডাক্তারের বাসা। বাসাটা চেনা আছে। ডেকে, হাতে পায়ে ধরে ডাক্তারকে আনা যাবে। মফিজ ডাক্তার ভালো লোক।
হাতে ডাক্তার সাহেবের ব্যাগ, পেছনে মফিজ ডাক্তার আলাউদ্দিন আলী যখন ফিরছে, তখন ভোরবেলার পবিত্র আলো ফুটে ওঠেছে চারদিকে। কাল সন্ধ্যার ঝড়বৃষ্টির ফলে ভেজা একটা ভাব চারদিকে। ধুলোবালির চিহ্ন নেই।
বাঁধানো পুকুরটার কাছাকাছি এসে আলাউদ্দিন আলী দেখে পুকুরের চারদিকে লোকজনের ভিড়। দেখে আলাউদ্দিন আলী একটু অবাক হয়। হাতে ডাক্তারের ব্যাগ পিছনে মফিজ ডাক্তার, সুফিয়ার এবরসন হয়ে গেছে, সব ভুলে আলাউদ্দিন আলী পুকুরের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন দৃশ্যটা চোখে পড়ে তার। হাতমুখ বাঁধা এক যুবতীর লাশ ভাসছে পুকুরে। মুখটা কাপড় দিয়ে বাধা বলে চেহারা বোঝা যায় না। হাত দুটো বাঁধা বুকের কাছে। শরীরে কাপড় নেই। সাদা শরীরটা জলের ওপর স্থির হয়ে আছে। লোকে বলাবলি করছে, রেপ কেস। রেপ করে, হাত মুখ বেঁধে পুকুরে। ফেলে দিয়ে গেছে। থানায় খবর দেয়া উচিত।
আলাউদ্দিন আলী পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে সব শোনে, সব দেখে। বহুদিন খরার পরে কাল বৃষ্টি হয়েছিল। লাইটপোস্ট চাপা পড়ে গলির মুখে পড়েছিল এক যুবক। হলেও সে তার হারিয়ে যাওয়া ভাই হতে পারে। ভোররাতে সুফিয়ার এবরসন হয়ে গেল। এখন ধর্ষিতা যুবতীর লাশ ভাসছে পুকুরে। এসবের মানে কী?
খেলোয়াড়
বল এখন বীরুর পায়ে। বীরু প্রতিপক্ষের রক্ষণসীমানায় ঢুকে গেছে। চমৎকার চমৎকার বীরু ক্রমশঃ এগিয়ে যাচ্ছে পেনালটি সীমানার দিকে। বাধা দিল প্রতিপক্ষের স্টপার নাসিম। নাসিমকে ডস দিয়ে গোলমুখে ঢুকে গেছে বীরু। ডানপায়ে তীব্র শট। গোল, গোল।
দূরাগত শব্দের মতো হামিদ ভাইয়ের ভরাট গলার এরকম কমেনট্রি হচ্ছিল মাথার খুব ভেতরে। স্টেডিয়াম ভরা দর্শক আজ। খেলা শেষ হতে তিন চার মিনিট বাকি। দর্শক ধরে নিয়েছে খেলাটি ড্র হবে। কিন্তু আজ খেলতে নেমেই আমার জেদ চেপে গিয়েছিল। গোল দেবই। সুযোগ আসেনি। হাফটাইম পেরিয়ে যায়। গোলশূন্য অমীমাংসিত। দেখেশুনে আমার মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়। অবশ্য আমি তেমন নামকরা প্লেয়ার নই। ক্লাব আমার ওপর খুব একটা ডিপেন্ডও করে না। সাপোর্টাররা কেউ কেউ হয়ত করে।
কিন্তু আমার আজ প্রথম থেকেই জেদ ছিল, গোল দেব। চান্স আসে। সাপোর্টারদের করতালিতে স্টেডিয়াম ভেঙে পড়ে। সাপোর্টারদের মধ্য থেকে কে একজন চেঁচিয়ে ওঠে, বাকআপ বীরুদা। আমার মনে হয় মাথার অনেক ভেতর থেকে আসছে শব্দটা। চোখে দেখি ঝাপসা কুয়াশায় সামনেই হা করে আছে বিশাল গোলপোস্ট। তার মাঝমধ্যিখানে লিলিপুটের মতো একটা মানুষ। প্রতিপক্ষের গোলকিপার। তখন মাথার ভেতর থেকে আবার সেই শব্দ, বাকআপ বীরুদা। ডান পায়ে তীব্র শট নিই। অবলীলায় গোল হয়ে যায়। আ এই সময়টা আমার খুব প্রিয়।
