সেদিন আমার পরিবর্তে কে খেলেছিল মনে নেই। তবে একটা কথা স্পষ্ট মনে আছে, ধুপখোলা গ্রুপ হাফ টাইমের পর আমার দেয়া তিনটে গোল শোধ করেও আরো একটি গোল দিয়ে গিয়েছিল। এই কারণে পাড়ার ছেলেরা ম্যালা দিন আমার বাবার ওপর বিলা হয়েছিল। পাড়ার দেয়ালে দেয়ালে বাবার নামে খাতারনাক পোস্টার পড়েছিল। মিলব্যারাক মাঠে বাবার নামে চলবে না চলবে না জাতীয় শ্লোগানও দিয়েছে ছেলেরা। বাবা কেয়ার করেননি। কিন্তু আমাকে হেভি ধোলাই দিয়েছিলেন। মনে পড়লে এখন বুক কাঁপে। তবুও খেলা আমায় ছাড়েনি। কিংবা আমি খেলাকে।
ক্লাবে এসে বুট খুলে দেখি পায়ে ব্যথার কোনও চিহ্ন নেই। বুটের বাইরে এসে পা দুটো বেশ আরাম পাচ্ছে। কিন্তু ব্যথাটা আছেই। থেকে থেকে চাপা দেয়। আমি ডানপায়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। চাপা পড়া ঘাসের মতো রঙ হয়েছে পায়ের। এক সময় প্রায় এরকম গায়ের রঙ ছিল আমার। খেলতে খেলতে রঙটা পাল্টে গেছে। এখন আমার গায়ের রঙ তামাটে।
আমি দেখতে মোটামুটি চলনসই। লম্বা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। বুকের মাপ চৌত্রিশ। পাতলা গোঁফ আছে। আমার চুল উনিশশো একষট্টি সাল স্টাইলে ছাঁটা।
একাত্তরের পর থেকে আমাদের জেনারেশানের ছেলেদের লম্বা চুল রাখা চালু হয়ে গেছে। কিন্তু আমি কখনও রাখিনি। বারবার ইচ্ছে হয়েছে, রাখা হয়নি বাবার জন্যে। বাবা পছন্দ করেন না। মাসে একবার চুল ছাঁটাতে হবে। এটা বাবার কথা। এই সেদিনও মাসের প্রথমদিকে বাবার সঙ্গে আমাকে সেলুনে যেতে হত। নরসুন্দর সাহেব বাবার। ডিরেকশানে আমার চুল হেঁটে দিতেন। আজকাল বাবা অবশ্য সেলুন পর্যন্ত যান না। কিন্তু চুল হেঁটে এসে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাবাকে এখন দেখাতে হয়। অবশ্য দেখে বাবা কখনও খুশি হন না। দুএকবার চুল হেঁটে এসেও আমাকে আবার সেলুনে যেতে হয়েছে। বাবার পছন্দ হয়নি।
একটা জিনিস আমি এই তেইশ বছর বয়সেও বুঝতে পারি না, অত নিয়মের ভেতর থেকে কী হয় জীবনে। বাবাকে তো জন্মের পর থেকে দেখছি ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠেন। বাড়ির কাছে বুড়িগঙ্গা, ওঠে সোজা চলে যান নদীতে। তার আগে আমাদের সব ভাইবোনকে ডেকে তুলে পড়তে বসান। ডিসপেন্সারিতে যান কাঁটায় কাঁটায় সাতটায়। এর কোনও ব্যতিক্রম দেখিনি। কিন্তু লোকটা জীবনে পেয়েছে কী? সারাজীবন বজলু ডাক্তারের কম্পাউন্ডার। মাস মাইনে চারশো সত্তর টাকা। ফাউ পাওনা বছরে একজোড়া পাজামা, একজোড়া চার পকেটঅলা ফুলহাতা শাদা শার্ট আর একজোড়া বাটার স্যান্ডেল। ছাতা আছে একটা। কমপক্ষে দশটা তালি পড়েছে তাতে। বিক্রমপুরে কানি দুয়েক জমি ছিল এককালে। স্বাধীনতার পর পরই বিক্রি হয়ে গেছে। থাকার মধ্যে সাতটি ছেলেমেয়ে, চারশো সত্তর টাকা মাইনের কম্পাউন্ডারি আর কালীচরণ সাহা স্ট্রিটের একটা তিনতলা বিরাট বাড়ির নিচের তলায় ত্রিশ ফুট বাই বার ফুট মাপের লম্বাটে একটা রুম। গাদাগাদি করে আমরা নটি মানুষ ওই স্যাঁতস্যাঁতে ড্যাম্পপড়া রুমটির ভেতর জীবনযাপন করছি।
এই বাড়িটার একটা ইতিহাস আছে। মালিক ধলেশ্বর বাবুর কোনও উত্তরাধিকারী ছিল না। জীবদ্দশায় ধলেশ্বরবাবু থাকতেন চিলেকোঠায়। বাড়ির ভাড়াটে। সবই হিন্দু। দোতলা তিনতলা মিলে ছত্রিশটা রুম। প্রতি রুমে একটা করে ফ্যামিলি। বেঁচে থাকতে ধলেশ্বরবাবু মাস ভাড়া দিতেন। যে যা দেয়। কিন্তু কে কত করে দিত ধলেশ্বরবাবু ছাড়া অন্য কেউ তা জানত না। বাবা এই চান্সটা নিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন। আজ ত্রিশ বছর ধলেশ্বরবাবু মারা গেছেন। বহুকাল। সে কথা আমার মনে নেই। গল্পটা মার কাছে শোনা।
আমার মা, সে আরেক ক্যারেক্টার। মহিলাকে আমি কখনও উঁচু গলায় কথা বলতে শুনিনি। নিঃশব্দে কাঁদতে দেখেছি বহুবার। ভোর পাঁচটা থেকে রাত দশটা অব্দি টানা কাজ করেন। দিনে তাঁকে কখনো ঘুমুতে দেখিনি। অসুখ বিসুখে পড়ে থাকতে দেখিনি। একটার পর একটা ভাইবোন হয়েছে আমার। এই ঘরের ভেতরই সন্তানের জন্ম দিয়ে। দিন দুয়েক বিছানায় থেকেছেন তিনি, তারপর আবার সংসারের কাজ।
কেমন করে যে পারেন। ভাবলে মাথার ভেতর অন্ধকার ঢুকে যায়।
রঞ্জু ভাই বললেন, কী হয়েছে বীরু?
আমি ডান পা দেখিয়ে বলি, ভীষণ ব্যথা করছে।
কেউ মেরেছিল?
না তো!
তাহলে?
বুঝতে পারছি না। রঞ্জু ভাইর হাতে সিগারেট ছিল, টান দিয়ে বললেন, এমনিতেও অনেক সময় ব্যথা হয়। বাড়ি গিয়ে গরম জলে স্যাঁক দে, ঠিক হয়ে যাবে।
আমি একটা সোফার ওপর কাৎ হয়ে শুয়ে আছি। চানটান করে এখন বেশ ফ্রেশ লাগছে। জার্সি খুলে নিজের হাওয়াই শার্ট আর বেলবটম প্যান্ট পরেছি। এর মধ্যে দু রাউন্ড চা হয়ে গেছে। এখন আসবে বিরিয়ানি। আমার আজ খাতিরই অন্যরকম, যা বলব তাই হবে।
কিন্তু পার ব্যথাটা..
বিরিয়ানিটা খেয়েই কেটে পড়ব। বাড়ি দিয়ে গরমজলে বরিক পাউডার ফেলে স্যাঁক দিতে হবে। কিন্তু সাইকেল চালিয়ে যেতে পারব তো?
ধুৎ শালা মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আমি রঞ্জু ভাইর কাছ থেকে সিগারেট নিয়ে ধরাই। আমি সিগারেট খাই না। আমার বাবাও না। বাবা খান না পয়সার অভাবে, আমি অন্য। কারণে। সিগারেট খেলে দম নষ্ট হয়ে যায়। খানিক দৌড়লেই টায়ার্ড লাগে। প্লেয়ারদের সিগারেট খেতে নেই।
কিন্তু এখন খাচ্ছি আমার মুড অফ হয়ে আছে বলে। সিগারেট খেলে যদি ভালো হয়। আমি সিগারেট খাচ্ছি, কোত্থেকে ইউসুফ ছুটে আসে। কী বে সিগ্রেট খাস ক্যালা?
