সুফিয়া মগ্ন হয়ে ঘামাচি মারছে দেখে আলাউদ্দিন আলী একটু গলা খাঁকারি দিল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে শরীরে আঁচল টেনে দেয় সুফিয়া। তারপর আলাউদ্দিন আলীকে দেখে হেসে ফেলে। ও তুমি, আমি ভাবলাম কে না কে?
একথায় বহুকাল বাদে বউর সঙ্গে একটু ঠাট্টা করে আলাউদ্দিন আলী। অন্য কেউ আসে নাকি?
যা।
তারপর আলাউদ্দিন আলীর হাতে পাউডারের টিন দেখে লাফিয়ে ওঠে সুফিয়া। থাবা দিয়ে টিনটা নিয়ে জিজ্ঞেস করে, আমার জন্যে এনেছ?
তো কার জন্যে! আমার কি আর দু-একটা বউ আছে?
কত দাম?
পৌণে সাত টাকা।
এই এতগুলো টাকা খরচ না করলেই পারতে!
আলাউদ্দিন আলী কথা বলে না। ঘরে ঢুকে জামাকাপড় ছাড়তে ছাড়তে সুফিয়ার চেহারায় আলাদা একটা লাবণ্য খেলা করছে দেখে পরিতৃপ্তির শ্বাস ফেলে। ভেতরে ভেতরে সুফিয়া যে প্রচণ্ড খুশি হয়েছে, বুঝতে দেরি হয় না তার।
অফিসের জামাকাপড় সদরঘাটের নিকসন মার্কেট থেকে অতি সস্তায় কেনা সাহেবদের পুরোনো শার্টপ্যান্ট খুলে খালি গায়ে, লুঙ্গি পরে ছোট বারান্দায় এসে বসে আলাউদ্দিন আলী। শরীরে ঘাম শুকিয়ে গিয়ে লবণ হয়ে গেছে দেখে সুফিয়া ভাঙা তালপাতায় তাকে বাতাস করছিল। তখনি একবার বিদ্যুৎ চমকে ওঠে আকাশে। বহুকাল বাদে, যেন এই প্রথম পৃথিবীতে মেঘ ডাকছে, এমন করে, দশদিক মুখরিত করে মেঘ ডেকে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে সুফিয়া বলল, আয় আয়।
আলাউদ্দিন আলী আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, বৃষ্টি হলে দুনিয়াটা ঠাণ্ডা হয়, মানুষ বেঁচে যায়।
একথার পরপরই শুরু হয় দমকা শুকনো বাতাস। রাজ্যের ধুলোবালি উড়ে আসে আলাউদ্দিন আলীর ছোট্ট ঘরে। ধুলোর দাপটে অন্ধকার হয়ে যায় চারদিক। সুফিয়া ছুটে গিয়ে ঘরের জানালা বন্ধ করে। তারপর ঘরে ষাট পাওয়ারের বালব জ্বেলে দেয়।
তখুনি বাতাসের সঙ্গে কেঁপে আসে বৃষ্টি। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকায়, মেঘ ডাকে। আলাউদ্দিন আলী বসেছিল বারান্দায়, বৃষ্টিতে হাওয়ায় তার শরীর জুড়িয়ে যেতে থাকে। বৃষ্টি দেখে সবচেয়ে খুশি হয়েছে সুফিয়া। দৌড়ে ছোট্ট উঠোনে নেমে যায় সে। তারপর বুক পিঠের কাপড় ফেলে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে।
সুফিয়াকে এখন বাচ্চা মেয়ের মতো দেখাচ্ছে। আলাউদ্দিন আলী তাকিয়ে দেখে।
স্বামীর সামনে মেয়েদের কোনও লজ্জা থাকে না। কী রকম অবলীলায় বুকের পিঠের কাপড় ফেলে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে সুফিয়া!
আলাউদ্দিন আলী বলল, বেশি ভেজাভেজি কোরো না। জ্বরজারি হবে। এসময় অসুখ বিসুখ খারাপ। বাচ্চার প্রবলেম হতে পারে। সুফিয়া হাসতে হাসতে বলে, তুমি অত ভেব না গো। কিছু হবে না। বছরের প্রথম বৃষ্টিতে ভিজলে ঘামাচি সব মরবে।
আহা, তাহলে পাউডারটা কেন কিনলাম।
আফসোস হচ্ছে?
পৌণে সাতটা টাকা!
মনে কর আমার জন্যে গচ্চা দিলে। বলেই সুফিয়া খুব হাসে। কখনও তো আমার জন্যে তোমার তেমন খরচা হয়নি। এবার একটু না হয় হল।
শুনে আলাউদ্দিন আলীর একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। খরচটা কি হত না, সামর্থ থাকলে ঠিকই হত। কিন্তু কথাটা বলা হয় না।
অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে, শাড়িছায়া পাল্টে, ঘরের ভেতর ষাট পাওয়ারের আলোর তলায় দাঁড়িয়ে শরীরে পরম যত্নে মাইসেল পাউডার মাখছিল তখুনি লাইট চলে যায়। মুহূর্তে মৃত্যুর মতো গভীর অন্ধকার নেমে আসে। থেকে থেকে মেঘ ডাকছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আলাউদ্দিন আলী কাত হয়ে শুয়েছিল চৌকির ওপর। আলো চলে যেতেই ধড়ফড় করে ওঠে। ম্যাচ কোথায়? হারিকেন জ্বাল।
সুফিয়া বলল, ব্যস্ত হয়ো না। আমি দেখছি।
তারপর হাতড়ে হাতড়ে ম্যাচ বের করে সুফিয়া। হারিকেন জ্বেলে দেয়।
হারিকেনের আলোয় খাওয়াদাওয়া যখন শেষ করেছে দুজন, তখন আলো ফেরেনি।
সাড়ে আটটা নটা বাজে। আলাউদ্দিন আলী বলল, চল শুয়ে পড়ি। গরমে কতকাল ঘুমুতে পারিনি। আজ শান্তিতে ঘুমুব।
হারিকেন নিবু নিবু করে সুফিয়া যখন বিছানায় গেছে, বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে, দমকা হাওয়াটা একদম নেই। বৃষ্টির পরে পৃথিবী এখন শীতল। সুফিয়া বিছানায় শুয়ে আলাউদ্দিন আলীর বুকে পিঠে নরম হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। তখন আলাউদ্দিন আলীর মনে পড়ে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতে করতে উত্তরবঙ্গে শস্যের মাঠে বলে মারা গেছেন এক বৃদ্ধ। অতঃপর বৃষ্টি হল বৃদ্ধের প্রার্থনা সফল হল, বৃদ্ধ দেখে যেতে পারলেন না।
একটি দীর্ঘশ্বাস পড়ে আলাউদ্দিন আলীর। তখুনি গলির মুখে লোকজনের হল্লাচিল্লার শব্দ পাওয়া যায়। প্রথমে খেয়াল করে না আলাউদ্দিন আলী। সুফিয়া বলল কী হল? এত হইচই?
আলাউদ্দিন আলী কান পেতে শব্দটা শোনে। তারপর বলে, বুঝতে পারছি না। বেরিয়ে দেখে আসব?
না, এই অন্ধকারে বেরুতে হবে না।
হল্লাচিল্লাটা তখন আরও বেড়েছে। অনেক লোকজন একত্রে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে। গলির একেবারে মুখে। কী ব্যাপার?
আলাউদ্দিন আলী জোর করে বিছানা ছাড়ে। তারপর খালি গায়ে, লুঙ্গি পরা অবস্থায় হারিকেনটা নিয়ে ঘর থেকে বেরোয়। দেখে আসি। এখুনি চলে আসব।
সুফিয়া বলল, দেরি কোরোনা। অন্ধকারে আমার ভয় করবে।
গলির মুখে এসে আলাউদ্দিন আলী দেখে লোকজন জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে এক জায়গায়। সেখানে কাত হয়ে পড়ে আছে একটা লাইটপোস্ট। লাইটপোস্টের তলায় একটা রিকশা। লোকজনের হাতে হারিকেন জ্বলছে। হারিকেনের আলোয় দেখা যায় রাস্তায় ভিড়ের মাঝমধ্যিখানে লুঙ্গি কাছামারা, খালি গা জোয়ান মর্দ এক যুবক উপুড় হয়ে পড়ে আছে। আলাউদ্দিন আলী কিছু বুঝতে না পেরে একজনকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে ভাই?
