বাচ্চুর সাথে সমঝোতায় এল রাজা। থোক কিছু টাকা দিয়ে ঘরটা নিয়ে দিল বাচ্চু। ছোট খুপরি ঘর। একটা মানুষ বসতে পারে এমন একটু জায়গা দোকানমতো হল আর মাঝামাঝি বুকাবেড়ার পার্টিশন দিয়ে রাজার থাকার জায়গা। সন্ধ্যেবেলা দোকান খুলে বসে রাজা। টিমটিমে কুপি জ্বালিয়ে ভোলা চোখে গাহাকের আশায় তাকিয়ে থাকে। তো গাহাক আসে এক আধজন। রাজার উৎসাহের তখন সীমা পরিসীমা থাকে না।
দিনেরবেলা আজার থাকতে হয়। দিনকাল বদলে গেছে। পাড়ায় আজকাল ম্যালা ঝুটঝামেলা। যখন তখন পুলিশ এসে নাস্তানাবুদ করে যায়। মাতাল পেলে ধুম প্যাদানি লাগায়। দিনের বেলা দোকান বন্ধ করে ইতিউতি ঘুরে বেড়ায় রাজা। দূর থেকে কমলরানীকে দেখে আসে। কমলরানী সেই আগের মতোই আছে। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেও বার বছরের রূপবান কন্যার মতো রূপ ধরে রেখেছে শরীরে।
কিন্তু দূর থেকে দেখে বলে একটা জিনিস রাজার ঘোলা চোখ এড়িয়ে যায়। কমলরানীর চেহারায় বয়স আর ক্লান্তি এক সঙ্গে ছায়া ফেলেছে।
রাজা ফিরে আসে।
কিন্তু দিনের বেলায় আজার, সময় আর কাটতে চায় না রাজার। সন্ধের আশায় বসে থাকে। সন্ধ্যেবেলা দোকান খুলে বসলে রাজার আর কিছু মনে থাকে না। আজার থাকলে মাথার ভেতর কত কথা যে বিনবিন করে, কত কী যে মনে পড়ে! যৌবনকালের কথা, কমলরানীর কথা। রাজা আবার বাচ্চুর কাছে যায়। আর কিছু পয়ছাপাতি দেবে বাচ্চু। দিনে পান বিড়ি বেচুম।
শুনে বাচ্চু খুব খুশি। টাকা দেয়। রাজা মহাউৎসাহে মদের দোকানেই পান বিড়ির দোকান লাগায়। মদ রাখে লুকিয়ে চুরিয়ে। একই জায়গায়। বাইরে থেকে দেখা যায় না। চব্বিশ ঘন্টার কারবার চলে রাজার। আস্তেধীরে উন্নতি করে ফেলে রাজা। বছর ঘুরতে না ঘুরতে লাভসহ বাচ্চুর সব টাকা শোধ। দোকানের মালিকানা পেয়ে যায় রাজা। দেখে শুনে লোকে বলে, সাবাস রাজা।
রাজা কাটা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসে। দোয়া কইরেন।
এইভাবে দিন যায়।
সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল একদিন। সারাদিন গিয়ে সন্ধ্যের দিকে বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। রাজা জুবুথুবু হয়ে বসেছিল দোকানে। গায়ে পুরনো কালের একটা চাদর। বিক্রিবাটা ছিল না দোকানে। বাদলার দিনে কে আসে বেশ্যাপাড়ায়।
চাদর গায়ে বিড়ি টানে রাজা। একাকী বসে থাকলে কত কী যে মনে পড়ে। যৌবনকালের কথা, কমলরাণীর কথা। আর গাঢ় অন্ধকার একটা রাতের কথা। লাইনে দাঁড়িয়ে মালগাড়িটা ফুঁসছে। ওই ছালা মালগাড়ি জিন্দেগী বরবাদ কইরা দিয়া গেল আমার।
রাজা যখন এসব কথা ভাবছে, তখন লাট মিয়া এসে দাঁড়ায় দোকানের সামনে। দুইডা ফুল বোতল লাগা রাজা।
গাহাক পেলে খুশির সীমা পরিসীমা থাকে না রাজার। কাটা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসে। কার লাইগা বে লাট।
কমলরাণীর গরে গাহাক বইছে।
কয়জন?
চাইরজন। আইজকাইলকার রংবাজ। পিচ্চিপাচ্চি পোলাপান। ঐ হালারাই তো রংবাজ আইজকাইল। জেব ভরা মাল। আমরা রংবাজি করতাম ডেগার কিরিচ লইয়া, হালারা ওইচবের ধার ধারে না। পিস্তল লইয়া আহে।
হারা রাইতঐ থাকবনি বে?
হ। ওই হালারা একবার আইলে তো রাইত কাবার কইরাঐ যায়।
তারপর খ্যাখ্যা করে হাসে লাট মিয়া। ওই রাজা বুঝলি, চুতমারানিগ দেখলে আমার পোন জইলা যায়। রংবাজি করে হালারা। অগো লাহান কত পোলা তর আমার লুঙ্গিতে ছুকাইয়া গেছে। কইবার পারি না কিছু। জেব ভরা নোট, পিস্তল। কতা কইলে মাইনাস অইয়া যামু গা।
রাজা এসব শোনে না। কেন যে মনটা ভারী হয়ে যায়। পান বিড়ির ডালার ওপাশ থেকে দুরকমের দুটো বোতল বের করে দেয়। বাচ্চুর হাতে বানানো মাল। এক বোতল মালে আধ বোতল পানি। ফেরিঅলাদের কাছ থেকে সস্তায় বোতল কিনে তাতে মাল ভরে রাখে বাচ্চু। ফলে বিভিন্ন রকমের বোতল। তো এই নিয়ে মাথা ঘামায় না কেউ। মালে নেশা ট্যাবলেট গুলে দেয় বাচ্চু। এক সিপে মাথা খারাপ। লোকে ভাবে জবর মাল।
চলে যাওয়ার সময় বিড়ি চায় লাট মিয়া। দেয় রাজা। লাট মিয়ার জন্যে মায়া লাগে। কমলরানীর ভাউরা। একদিন রাজাও ছিল। লাট মিয়া লাইনটা ধরে রেখেছে। রাজা পারেনি। একটা মালগাড়ি জিন্দেগীটা বরবাদ করে দিয়ে গেছে রাজার। মদ, মাগিবাজি, জুয়া সব ছেড়ে দিয়েছে রাজা। ভালোমানুষ হয়ে গেছে।
লাট মিয়া চলে যাওয়ার পরও মনে মনে লাট মিয়ার সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যায় রাজা। একাকি বিড়বিড় করে। দিনকাল এইরকম থাকব না বে লাট। লাইন ছাইরা দে। নইলে আমার লাইন বিলা অইয়া যাবি একদিন। তারপর আবার উদাস হয়ে যায় রাজা। কমলরাণীর কথা মনে পড়ে। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেও কমলরাণী ঠিকঠাক চালিয়ে নিচ্ছে। ঘরে এখনও গাহাক বসায়।
বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে রাজার। মাথার ভেতর কী যেন একটা নেই তার। জীবনের সব চালে ভুল হয়ে যায় রাজার। পরিকল্পনা তালগোল পাকিয়ে যায়। নইলে জিন্দেগী অন্যরকম হয়ে যেত রাজার। আল্লাহ তাকে সব দিয়েও কী যেন একটা জিনিসের অভাব রেখে দিলেন মাথার ভেতরে। চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর বয়সে আজকাল আজার থাকলেই রাজার এসব কথা মনে হয়। আর বুকের ভেতর যৌবনকালের হিংস্রতাটা আস্তেধীরে জেগে ওঠে। কোদালের মতো দাঁত তিনটে নিচের ঠোঁটে বসে যায়। চোয়াল যায় শক্ত। হয়ে। কে জানে কার উদ্দেশ্যে রাজা তখন গালাগাল করে। ছালা মামদার পো, দেইখা নিমু একদিন।
