আস্তে ধীরে রাত বেড়ে যায়। বাদলার রাত। লোকজন ঘর ছেড়ে বেরোয় না খুব। তবুও বেশ্যাপাড়া বলে হল্লাচিল্লার একটা শব্দ থাকেই। সেই শব্দটা এখন কমে আসছে। রাস্তার লোকজন দেখা যায় না। রাত কত হল?
দুজন নাইটগার্ড এসে খানিক ঘুরঘুর করে। তারপর চলে যায়। রাজা দোকান খুলে। বসেই থাকে। বয়স হয়ে গেছে। ঘুম আসে না সহজে। বাইরে রাত বাড়ে। বাদলা হাওয়া নেড়ি কুত্তার মতো ঘুরে ঘুরে ফেরে। শীত করে রাজার। চাদর জড়িয়ে তবুও বসে থাকে। বিড়ি টানে। গাহাক যদি আইয়া পড়ে।
মাল দে বে।
বাইরে কুপির ধোয়ার মতো অন্ধকার। সেই অন্ধকারে ছায়ার মতো কারা এসে দাঁড়িয়েছে। রাজার দোকানের সামনে। ঘোলা চোখ রাজার ঠিকঠাক মালুম হয় না কিছু। তবুও হাসে রাজা। কয়ডা?
দিবার থাক না মামদার পো।
কুপির আলোয় রাজার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় একজন। অল্পবয়েসী নালায়েক ছোঁকরা। লতাপাতা আঁকা শার্ট আর প্যান্টালুন পরা। মাথায় বাবড়ি চুল, নিচের ঠোঁট অব্দি লম্বা জুলপি।
গালটা সেই দিয়েছে।
শুনে রাজার বুকের ভেতরটা একটু চমকায়। যৌবনকালের হিংস্রতাটা একটুখানি নড়েচড়ে ওঠে। তবুও কথা বলে না রাজা। হাত পাতে টাকার জন্যে।
ছেলেটা একটু টলছিল। রাজার হাত পাতা দেখে আবার গালাগাল দেয়। আগে মাল দে শুয়োরের ছানা।
রাজা এবার ঠাণ্ডা গলায় বলল, গাইল দিও না মিয়া। রাজা কুন হালার বাপের চাকর না। ছেলেটা এবার বাদলা রাত কাঁপিয়ে ঠা ঠা করে হেসে ওঠে। সঙ্গের তিনজন এসে তখন কুপির আলোয় রাজার চোখের সামনে দাঁড়ায়। এই রকমই দেখতে। লাট মিয়া বলে গেছে, আইজকাইলকার রংবাজ।
অন্য একটা ছেলে বলল, কিবে খানকির পো, কতা কানে লাগে না। মাল দে।
মাথার ভেতর চিন করে শব্দ হয় রাজার। কী যেন একটা নেই সেখানে। তবুও বাঘের মতোন হুঙ্কার দিয়ে লাফ দিয়ে দোকান থেকে নামে রাজা। যৌবনকালের হিংস্রতাটা বেরিয়ে এসেছে। রাজার লগে রংবাজি করো শুয়োরের ছানারা।
প্রথম ঘুষিটা এসে লাগল রাজার কাটা ঠোঁটটার ওপর। দেড়মণি ওজনের লোহার বলের মতো। ফলে কাটা ঠোঁটটা আরো কেটে যায় রাজার। কোদালের মতো দাঁত তিনটি আলগা হয়ে যায়। চায়ের মতো গরম রক্ত বেরয়, রাজা টের পায়। মাথাটা ঘুরে ওঠে তার। বহুকাল লাইনে নেই রাজা। সইতে পারে না, টলে যায়। তবুও হাত চালায় রাজা। কিন্তু কারো গায়ে লাগে না। সাটসাট সরে যায় ওরা। তারপর চারজন চারদিক থেকে মারে। সইতে পারে না রাজা। মাথার ভেতর দিকটা অন্ধকার হয়ে আসছে। মিহিন একটা শব্দ হয় সেখানে। চিন চিন।
গভীর রাতে জ্ঞান পায় রাজা। মাথার অন্ধকারটা কেটে যায়। ওঠে বসে রাজা। মুখটা চনমন করছে, দাঁতের গোড়ায় গোড়ায় ব্যথা, ঠোঁট জ্বলছে। বয়সী হাড়ে জমে গেছে ব্যথা। মাটিতে পড়েছিল বলে সারা শরীরে পাক কাদার লেপটালেপটি। তবুও মাটিতে খানিকটা বসে থাকে রাজা। তারপর দোকানে ওঠে।
পানবিড়ির ডালাটা উল্টে পড়ে আছে দোকানের ভেতর। কুপিটা ছিল বেড়ার সঙ্গে কায়দা করে বাঁধা। সেখানে বসেই জ্বলছে। রাজা দেখে তার চাদরটা পড়ে আছে পানবিড়ির ডালার সঙ্গে। মালের বোতলগুলো নেই। তিন চারটে ভেঙে কাঁচ আর মাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দোকানের ভেতর। হাওয়ায় বাংলা মদের ঝাজালো গন্ধ। শালারা সব লুটেপুটে নিয়েছে।
রাজা মার খাওয়া বুড়ো কুত্তার মতোন দোকানে বসে থাকে। হাওয়ায় মদের গন্ধ ভাসে। সেই গন্ধে রাজার বুকের ভেতর যৌবনকালের হিংস্রতাটা আবার জাগতে থাকে। মাথার ভেতর চিনচিন করে শব্দ হয়।
মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল রাজা। আজ কেন যে কথাটা ভুলে যায়। বুকা বেড়ার পার্টিশনের এক দিক ভোলা। সেখানে গিয়ে ভেতরে এক মানুষ শোয়ার জায়গা, রাজার ঘর। আবছা একটা ঘরের মধ্যে রাজা তার ঘরে যায়। সেখানে কিছু বোতল স্টক রাখে রাজা। বহুকাল বাদে রাজা কি আজ আবার……।
হাতড়ে হাতড়ে বোতলগুলো বের করে রাজা। তারপর যৌবনকালের মতো একটা বোতল ভাঙ্গে। ঢকঢক করে ঢেলে দেয় গলায়। বুক জ্বলে যায় রাজার। মাথার ভেতর জমে ওঠে অন্ধকার বহুকাল বাদে। রাজা আবার লাইনে আসে। ঢকঢক মদ গেলে আর হি হি করে হাসে। তারপর খানিক কাঁদে। মাথার ভেতর কী যেন একটা নেই রাজার। মিহিন একটা শব্দ হয় সেখানে।
রাজা তখন ডেগারটা খোঁজে। হন্যে হয়ে খোঁজে। যখন পেয়ে যায় তখন আবার হাসি। হি হি হি হি। তারপর আর একটা বোতল ভাঙে। একহাতে বোতল, একহাতে খোলা ছ ইঞ্চি ডেগার। বহুকালের পুরনো। জঙ ধরে গেছে। রাজা খেয়াল করে না। লাফ দিয়ে দোকান থেকে বেরোয়। বাদলা রাত। হু হু হাওয়া বইছে বাইরে। অন্ধকারে মানুষজনের চিহ্ন নেই। তবুও ডেগার হাতে, মদের বোতল হাতে টালমাটাল পায়ে হাঁটে রাজা। বাঘের মতো হুঙ্কার ছাড়ে। এক বাপের পয়দা অইলে সামনে আয় শুয়োরের জানা।
কার উদ্দেশ্যে গালাগালটা দেয় রাজা, কেউ জানে না। মাথার ভেতর কী একটা নেই রাজার। অনবরত চিনচিন শব্দ হয় সেখানে। রাজা সব গুলিয়ে ফেলে। ঢকঢক মদ খায়। তারপর বোতলটা ছুঁড়ে ফেলে, হুঙ্কার দিয়ে ডেগার চালায় হাওয়ায়। আয়, আয় মামদার পো। সাহস থাকলে সামনে আয়, ভুড়ি জুলাইয়া হালামু। টেংরি লইয়া লমু। কতকাল জালাইবা। রংবাজি পাইছ। রাজার লগে রংবাজি।
রাজার চিঠি
প্রাতঃকালে ঘুম ভেঙে রাজা দেখেন জানালা দিয়ে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে ডিমের কুসুমের মতো গাঢ় রোদ। মিহিন একটা হাওয়া এসে খেলা করছে রোদের সঙ্গে। জানালার পাশে বাগানে ফুটেছে অজস্র ফুল। হাওয়ায় ফুলের মৃদু সুবাস।
