শুনে ছেলেগুলো সব একত্রে রাজার দিকে তাকায়। খিটখিট করে হেসে ওঠে একজন। রাজা পাত্তা দেয় না।
কিন্তু ব্রিটিশ চালু মাল। খাতির করে বসায় তার পাশে। কালুকে ডাকে। তারপর হাত ইশারায় কাকে কী বলে রাজা দেখতে পায় না। চা আসে দুকাপ। চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলল, লও চা খাও।
রাজা চা খায় না। গম্ভীর গলায় বলে, কতাডা কানে লইছস বে?
ব্রিটিশ হাসে। দলে তো এমনেই ম্যালা পোলাপান। তাওবি থাকবার পার। মাগার তোমার পোছাইব না।
ওইডা আমি বুজুম। রাজা চায়ে চুমুক দেয়, বিড়ি ধরায়। ব্রিটিশ বলল, লাইনডা খারাপ অইয়া গেছে। গাড়িআলাগ দিয়া দিতে অহে হাফ। আরও বহুত গেঞ্জাম আছে। পয়ছাপাতি টেকে না। রাজা সব শুনে যায়। কথা বলে না। পুরো ব্যাপারটাই তার জানা। ড্রাইভারের সঙ্গে লাইন করা থাকে। জায়গামতো গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে যায়। বুট ঝামেলা নেই, আরামছে বগি ভাঙ্গ। মাল খারিজ কর। মহাজনদের সঙ্গেও পাকা বন্দোবস্ত। জায়গামতোট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। মাল ভরে দিলে ক্যাশ চলে আসে হাতে। রাজা দলে ভিড়ে যায়।
কিন্তু ভেতরে রাজার একটা চালবাজি ছিল। বগি ভাঙার দলে সে বেশিদিন থাকবে না। একদিন পুরো মাল একা সাবড়ে কেটে পড়বে। কিছু ক্যাশ চাই রাজার। থোক কিছু। টাকা পেলে কমলরাণীকে নিয়ে সে পালাবে। লাইন ছেড়ে দেবে। কমলরাণী কথা দিয়েছে, টাকা নিয়ে এলে রাজার হাত ধরে পালাবে। কথাটা গোপন রেখেছে রাজা। কালুকেও জানায়নি। মাথার ভেতর কী যেন একটা নেই। অনেক কিছুই ঠিকঠাক মেলাতে পারে না। তবুও চেষ্টাটা সে করে যায়।
সুযোগ আসে।
জায়গামতো গাড়ি দাঁড়িয়েছে একরাতে। ঘুটঘুঁটে অন্ধকার ছিল। চারদিকে ঝুপসি গাছপালা, ঝোপঝাড়। কাছে পিঠে লোকবসতি নেই। লাইনের দুধারে গাছপালার জঙ্গল। তারপর ফসলের মাঠ, জলাভূমি। মালগাড়ির ইঞ্জিনের ফোঁসফোসানি ছাড়া আর কোন শব্দ ছিল না। দলের সামনে ছিল ব্রিটিশ। হাতে টর্চ জ্বেলে দেখিয়ে দিল কোনটা ভাঙতে হবে।
খাটো পায়ে দলের সঙ্গে হাওয়া হয়ে যায় রাজা। ঘুটঘুঁটে অন্ধকার তবুও বিশ-বাইশ মিনিটের মাথায় মাল সব খারিজ। জায়গামতো পৌঁছে যাওয়ার আগেই অন্ধকার কুঁড়ে কোত্থেকে বিশাল কিরিচ হাতে এসে দাঁড়ায় কালু। মাল যাইব না।
কালুর সঙ্গে প্যাক্ট করা ছিল রাজার। হুঙ্কার শুনে কোমর থেকে ডেগার বের করে। রাজার মালে হাত দিলে ভুরি ঝুলাইয়া হালামু।
শুনে পর পর দুবার টর্চ জ্বালে ব্রিটিশ। চালু মাল। ব্যাপার বুঝতে টাইম লাগে না। সঙ্গে সঙ্গে মুখে আঙুল পুরে সিটি দেয় সে। পর পর তিনবার। রাজা কিছু বুঝতে পারে না। বুঝে যায় কালু। কিরিচ ফেলে অন্ধকারে দৌড় মারে সে। আর সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে রাজাকে জাপটে ধরে। লোকটার গায়ে শুয়োরের মতো শক্তি। রাজা নড়তে পারে না। তখন আবার তিনটে সিটি দেয় ব্রিটিশ। সেই শব্দে আড়াইমণি চালের বস্তা মাথায় ঝটপট অন্ধকারে হাওয়া হয়ে যায় ছেলেগুলো। পাঁচ সাত মিনিটে বেবাক মাল লাপাত্তা। রাজার তখন গামছা দিয়ে মুখ বাঁধা হয়েছে। হাতে ডেগার ছিল, উজবুকের মতো ধরে রেখেছে। মাথায় কী একটা নেই রাজার।
এই মুহূর্তে কী করা উচিৎ রাজা বুঝতে পারে না। ব্রিটিশরা তিনজন তাকে ঠেলে নিয়ে আসে পাড়ায়। তারপর পুলিশ ডেকে কোমরে টাকার বান্ডিল দেখিয়ে ব্রিটিশ বলল, আমারে ডেগার ঠেকাইছিল, টেকার লেইগা।
রাজার হাতে তখন ডেগারটা ধরা। প্রমাণ। পুলিশ রাজাকে ধরে নিয়ে যায়। পাক্কা সাত বছর জেল খেটে আসে রাজা।
.
সে একটা দিনকাল গেছে। ফিরে এসে কোমরে ডেগার খুঁজে ঘুরছে রাজা। ব্রিটিশদের দলের কাউকে আর খুঁজে পায়নি। সাত বছরে রাজার শরীর খুব ভেঙে পড়েছিল। একটু কুঁজো হয়ে চলে রাজা। খাটো পা টা আর আগের মতো চলতে চায় না। বীভৎস মুখটা গেছে আরো বীভৎস হয়ে। জুলপির কাছে আরো পাকন ধরেছে। কমলরাণী যে কমলরাণী সেও রাজাকে চিনতে পারে না।
এজন্য রাজার কোন দুঃখ ছিল না। সময়ে অসময়ে একটা কথা কেবল মনে হত তার, আল্লাহ তার মাথার ভেতর কী যেন একটা জিনিসের অভাব রেখে দিয়েছেন। নয়ত জীবনটা অন্যরকম হয়ে যেত রাজার।
ইতিউতি ঘুরে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে দিল রাজা। কোন লাইন পেল না। সাত বছরে জগত সংসার ম্যালা পাল্টেছে। রাজাকে কেউ চিনতে চায় না। হতাশ হয়ে রাজা তেওয়ারীর দোকানের সামনে ঘুরঘুর করে। মাটিতে বসে থাকে। তেওয়ারী মারা গেছে বহুদিন। বাচ্চু এখন জোয়ানমর্দ পুরুষ। বাপের ব্যবসাটা ধরে রেখেছে। উন্নতি করেছে ম্যালা। রাজা বাছুর কাছে ঘুরঘুর করে বিড়িটা, সিগারেটটা চেয়ে খায়। সময়ে দুচারটি পয়সা দেয় বাচ্চু। রাজা খুশি হয়। বাছুটা বড় দয়ালু। কমলরাণীকে নিয়ে পালালে রাজারও আজ একআধটা ছেলে থাকত। আহা বাচ্চুর মতো তারও যদি একটা ছেলে থাকত!
মাথার ভেতর চিন করে শব্দ হয় রাজার। কী যেন একটা নেই মাথায়। রাজা সব গুলিয়ে ফেলে।
বাচ্চু এক দুপুরে ভরপেট খাইয়ে বলল, রাজাচাচা একঠো কাম কর। বাবুয়ার দোকানের সামনে ঘর লিয়ে দিই। বোতল চালাও। আমি তো একলা। দোসর কই নাই।
রাজা একবারেই রাজি। এখন যে কোনও কাজ পেলে করে সে। বয়স হয়ে গেছে। বদমাসি আর পোষায় না। ঝুটঝামেলা আর ভালো লাগে না। শরীরে যৌবনকালের তেজটাও আর নেই। রক্ত ঠাণ্ডা মেরে যাচ্ছে দিনকে দিন।
