না নালের পয়ছা হামার লাগবে না। বদনামি হোয়।
রাজা আর কোনও কথা না বলে ওঠে চলে আসে। তারপর একটা বিড়ি ধরিযে টানতে টানতে পুরো ব্যাপারটা খোলসা করে ভাবে। তেওয়ারী চাল করে তাকে সরিয়ে দিল। রাজা এতটা নালায়েক নয়। বোঝে সবকিছু। মনটা খারাপ হয়ে যায় রাজার। পকেটে একটা পয়সা নেই। চলবে কী করে! তাছাড়া আজকাল পাড়ায় বেশ একটা পজিশান হয়েছে রাজার। যার তার কাছে হাত যায় না, বাকিবক্কা চাওয়া যায় না। বিড়ি টানতে টানতে রাজা যায় তেওয়ারীর বেটার কাছে। গিয়ে একটা চালবাজি করে। পাঁচঠো রুপেয় দেবে বাচ্চু। ত্যারা বাপ মাঙ্গা।
বাচ্চু জানে রাজা তার বাপের পার্টনার। টাকাটা দেয়। রাজা বেজায় খুশি হয়ে সেই সকালবেলাই একটা পাইট কেনে। পুরোটা ভেঙে খায় কমলরাণীর ঘরে বসে। তারপর টানা ঘুম দিয়ে ওঠে সন্ধেবেলা কী আবার যায় তেওয়ারীর আখড়ায়। কী করবে মাল খেতে খেতে ঠিক করে রেখেছিল রাজা।
আখড়ায় যাওয়ার আগে বাবুয়ার দোকান থেকে বহুকাল বাদে বাকিতে এক কাপ চা খায় রাজা। সারাদিন ঘুম পেড়ে মাথাটা ভারি হয়ে আছে। চা খেয়ে আরাম হয়।
চায়ের দোকানের সঙ্গে পানবিড়ির দোকান সোনামিয়ার। রাজা এক প্যাকেট কুম্ভিপাতার বিড়ি নিয়ে বলল, পয়সা পরে পাবি বে। সোনামিয়া হাত কচলে বলল, দিয়েন। রাজা আর কথা বলে না। বিড়ি টানতে টানতে হাঁটে। তেওয়ারীর দোকানের সামনে এসে দেখে বাছুর সঙ্গে হুজ্জতি করছে কালু। বাকিতে মাল চাইছে। এক বোতল দেওনই লাগব। নইলে হালা মাইরার বাচ্চা দোকান কর কেমনে দেইখা লমু।
একটু একটু করে পা টলছে কালুর। মুখে পান। ঠোঁটের কষ বেয়ে চিপটি ঝরছে। মাল খেয়ে টাল হয়ে আছে শালা।
রাজা বিড়ি টানতে টানতে কালুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কী রে কাউলা, হুজ্জত করচ ক্যালা? রাজাকে দেখেই উর্দু মেশানো ভাষায় নালিশ দেয় বাচ্চু। রাজা মনোযোগ দিয়ে শোনে, তারপর কালুকে সরিয়ে এনে বিড়ি খুঁজে দেয় ঠোঁটে। জেবে মালপানি নাই? কালু বিড়ি টানতে টানতে বলে, না বে। তারপর একটু থেমে বলে, তুমি হালায় তো মোজে আছ। নালের পয়ছা কামাও।
শুনে রাজা হাসে। তারপর তেওয়ারীর কীর্তি খুলে বলে, মাউরার পুতে হালায় বহুত রহব দেহায়। ল ধরি হালারে। পামু ফিপটিফিপটি।
কালুকে পাড়ায় বেশ জমা-খরচ দেয় লোকজন। রাজাকেও দেয় খানিকটা। মাথায় কি যেন একটা নেই রাজার। তবুও কালুকে হাত করে নেয় ঠিকই। মাঝরাতে গিয়ে তেওয়ারীর আখড়ায় হানা দেয় দুজনে। তেওয়ারী তো অবাক। রাজা মিয়া তুম?
রাজা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। পান চিবুচ্ছে, বিড়ি টানছে। কালুর পেট ভর্তি মাল, পা টলছে। তবুও বলল, মাল ছাড় ছালা মাউড়ার বাচ্চা। বোর্ড চলছিল। কালুর ডায়লেগ শুনে নিঃশব্দে রাজা গিয়ে তার খাটো পা টা চাপিয়ে দেয় বোর্ডের ওপর। নাল না উডাইবার দিলে বোড বনদ।
জুয়াড়িরা ভয় পেয়ে সরে যায়। রাজার বয়সী চানমিয়া সাহস করে বলল, হুজ্জত করতাছচ ক্যালা রে।
শুনে রাজা ঘাড় ত্যাড়া করে বলল, চোপ খানকির পোলা টেংরি লইয়া লমু।
চানমিয়া আর কথা বলে না। দেখে তেওয়ারী সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে যায়। হাত জোড় করে কালুকে বলে, দশটো রুপেয়া লিয়ে কালুজি।
শুনে কালু খ্যাখ্যা করে হাসে। আমি কিছু জানি না, রাজারে কও।
তেওয়ারী এসে রাজার হাতে পায়ে ধরে। রাজা মিয়া, দশ রুপেয়া লিয়ে যাও। হুজ্জত মাত কর।
রাজা গম্ভীর গলায় বলে, নাল তুলবার দিলা না ক্যালা?
সে হামার কসুর হয়েছে। মাফি মাংতা।
শেষ পর্যন্ত নগদ বিশ টাকা নিয়ে ওঠে রাজা। তেওয়ারীর সঙ্গে পাকাপাকি হয়ে গেল। রাজা আর নাল তুলবে না, কিন্তু বোর্ড থেকে বিশ টাকা করে পাবে রোজ। দিনে রাতে যখন ইচ্ছে রাজা এসে টাকাটা নিয়ে যাবে।
আখড়া থেকে বেরিয়ে দশ টাকা করে ভাগ করে নেয় দুজনে। ফিপটিফিপটি। টাকাটা কালুর হাতে দিতে রাজা টের পায় তার সাহসের কমতি নেই। যা ইচ্ছে তাই সে করতে পারে। ব্যাপারটা পরীক্ষা করার জন্যে কালুকে নিয়ে যায় সে বাচ্চুর দোকানে। আবে বাচ্চু মাল দে এক বেতাল। পয়সা দিব তর বাপে।
রাজার গলায় কী ছিল কে জানে, বাচ্চু ভয়ে ভয়ে একটা বোতল বের করে দেয়। কালুকে নিয়ে বোতলটা ভেঙে খায় রাজা।
এইভাবে কালুর সঙ্গে তার বন্ধুত্বটা গাঢ় হয়ে যায়।
লাইনের ধারে মালগাড়ির বগি ভাঙার একটা দল ছিল। ওঠতি পোলাপান সব। বাবুয়ার চায়ের দোকানে তাদের আড্ডা বসে সন্ধ্যের পর। খবর পেয়ে একদিন কোমরে ছয় ইঞ্চি ডেগার, কালুকে নিয়ে রাজা যায় বাবুয়ার দোকানে। ছেলেগুলো সব পেছনের দিকের একটা টেবিলে বসে আছে। ফুকুর ফুকুর করে চা খাচ্ছে, কেউ বিড়ি টানছে। আশি আশি সুতোর সাদা লুঙি পরা, গায়ে হাফশার্ট কিংবা স্যান্ডো গেঞ্জি, কোমরে গামছা বাঁধা দুজনের। ফুসুর ফুসুর কথা বলছে, হাসছে। রাজা সোজা গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়ায়। সাহস অনেক বেড়ে গেছে রাজার। কোমরে ডেগার আছে।
দলের সর্দার মতন ছেলেটার নাম ব্রিটিশ। রাজা তাকে চেনে। এই মুহূর্তে চোখ মেরে কালুকেও চিনিয়ে দেয়। এই হালায় অইল লিডার। আমাগ যুদি দলে না লয় তাইলে আইজই অইয়া যাইব।
রাজা বলল, হোন বে বিটিস, আমরা বি তগ লগে থাকবার চাই।
