শিশি হাতে কুসুম তারপর ঘর থেকে বেরুল।
ঈশ্বরের পৃথিবী তখন আশ্চর্য রকম মোহনীয় হয়েছিল। চাঁদ ছিল আকাশের ঠিক মাঝখানে। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছিল চরাচর। নিশীথবেলার হু হু হাওয়ায় দুলছিল গাছের পাতা, পাতার সঙ্গে মিলেমিশে দুলছিল পাতার ছায়া। বহুদুরে কেঁদে ফিরছিল একাকী এক রাতপাখি। হাওয়ার টানে পাখির কান্না কাছে আসে, দূরে যায়। রাতপোকারা গলা খুলেছিল মধুর স্বরে, গানে গানে শীতল করছিল উষ্ণ মাটি। প্রকৃতির এই মহান সৌন্দর্য একটুখানি নষ্ট হয়েছিল কুসুমের কান্নায়। চোখের জলে গাল ভেসে যাচ্ছিল কুসুমের, বুক ভেসে যাচ্ছিল। উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল সে, চাঁদের দিকে তাকিয়েছিল। তারপর মুখের ওপর উপুড় করেছিল কীটনাশকের শিশি। সেই তরল আগুন বুক পুড়িয়ে নেমে যায় কুসুমের। মুহূর্তে ঝাঁপসা করে ফেলে চোখের দৃষ্টি। আস্তে ধীরে উঠোনের মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কুসুম। চাঁদের আলোর নাকের ফুলখানা জ্বলজ্বল করে তার। জড়িয়ে আসা ঝাঁপসা চোখে কুসুম তবু দেখতে পায়, আশ্চর্য সুন্দর একখানা নদী বয়ে যায়। নদীতীর অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃক্ষ। বৃক্ষতলায় অপেক্ষার কষ্ট বুকে নিয়ে বসে আছে এক দুরন্ত প্রেমিক। সে কোনও শাসন মানে না, সে কোনও ধর্ম মানে না।
রাজা বদমাস
জগৎসংসারে রাজার কেউ ছিল না। চোখ খুলে রাজা দেখেছে বাজার মতন একটা জায়গা। বিস্তর দোকানপাট, বিস্তর মানুষজন। চৌপর দিন কোলাহল লেগে থাকে জায়গাটায়। অদূরে রেললাইন। লাইনের কাছে গলিঘুচি মতন জায়গাটা বেশ্যাপাড়া। সন্ধের মুখেই জমে ওঠে। চলে রাত দিন প্রহর অব্দি।
চৌদ্দপনের বছর বয়সে রাজা বেশ্যাদের সম্পর্কে জ্ঞাত হয়। মদ খেতে শেখে, জুয়া খেলতে শেখে। জীবনটা শুরু হয় এইভাবে।
জন্ম থেকে রাজার বা পাটা খাটো। রাজা হাঁটে ত্যাড়া হয়ে। ধড়খানা দশাসই। কিন্তু মুখখানা বিভৎস রাজার। ওপরের ঠোঁট কাটা। ফলে কোদালের মতো তিনটি দাঁত বেরিয়ে থাকে। কথা যায় জড়িয়ে। এই দেখিয়ে ভিখ মাগত রাজা। তাঁকে খাওয়ার পয়সাটা এসে গেলে বেশ্যাপাড়ায় ঢুকে ঘুরঘুর করত। জুয়ার আসরে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসত। খেলুড়েরা তাকে দিয়ে ফুটফরমাস খাটায়, পানটা বিড়িটা আনায়। রাতেরবেলা আনায় বাংলা মদ। এই করে হাত সাফাইয়ের কাজটা শেখে রাজা। বোর্ডে বসলে পয়সা-পাতির হিসেব দেখে না জুয়াড়িরা। তিন আনার জিনিস কিনে রাজা সিকির হিসেব দেখায়! এক বোতল বাংলা কিনে আধলিটা কমিশন পায়। কিন্তু পয়সা পাতির হিসেবে রাজা খুবই কাঁচা। গুলিয়ে ফেলে। মাথার ভেতর কী যেন একটা নেই তার।
তবুও ব্যবসাটা রাজা ধরে ফেলে। আনিটা দোআনিটা করে আসে মন্দ না। ভর পেটে খাওয়া হয়ে যায়। জীবনে কত যে ঘোরপ্যাঁচ, কত যে গলিঘুচি! ঘোরপ্যাঁচ বুঝতে শেখে রাজা, গলিঘুচি দিয়ে চলতে শেখে। মদ মেয়েমানুষ আর জুয়া এই তিনটি জিনিস পুরোপুরি কজা করতে রাজার বয়স পঁচিশ পেরিয়ে যায়।
বেশ্যাপাড়ার বাংলা মদের দোকান করত মাউরা তেওয়ারী। গলিঘুচির ভেতর খুপরি মতন ঘর। সামনের দিকটায় ঝাঁপ খুলে বসে থাকত তেওয়ারীর বাচ্চা ছেলেটা। হরদম। বিক্রি হত দোকানটায়। একবোতল মাল আধাবোতল পানি মিশিয়ে একটু কম রেটে বিক্রি করত বলে তেওয়ারীর দোকানে ভিড়ভাট্টা লেগেই থাকত। বাচ্চা ছেলেটা ঝটপট বোতল তুলে দিত গাহাকের হাতে, দামও নিত চটপট। দেখেশুনে তেওয়ারী ভাবল বেটা হামার কামের আছে। মালুম হয় দোকানটা ঠিকঠাক চালিয়ে নিবে। হামি দোসরা বিজিনিস দেখি।
দোকান ঘরটার মাঝখানে বুকা বেড়ার পার্টিশান দিয়ে পেছনে জুয়ার বোর্ড বসাল তেওয়ারী। পার্টনার নিল রাজাকে। বোর্ড থেকে দেদার পয়সা আসতে লাগল তেওয়ারীর। রাজা তোলে নাল। পার বোর্ড একটা করে দোআনি।
দিনে দিনে উন্নতি করে ফেলল রাজা। তিন মাসের মাথায় চেহারাসুরৎ গেল পালটে। পয়সাপাতি যা পায়, তিন বেলা ভরপেট খেয়েও থেকে যায় বিস্তর। হররোজ মদ খেতে লাগল।
পাড়ার সবচে সুন্দরী ও কম-বয়সী বেশ্যা কমলারানী। রাজা যখন তখন তার ঘরে যায়। পয়সাপাতি সব উজাড় করে দেয় কমলারানীর পায়ে। দেখেশুনে তেওয়ারী গেল ঘাবড়ে। কথা ছিল নালের পয়সা রাজা যা তুলবে তার অর্ধেকটা পাবে তেওয়ারী। রাজা ওসবের ধার ধারে না। হিসেব দেয় না ঠিকঠাকমতো। সারাদিনে কটা বোর্ড হয়, কটা দোআনি ওঠে তার হিশেব কি তেওয়ারী রাখতে পারে।
এই নিয়ে রাজার সঙ্গে একটু আধটু খিটিমিটি হয় তেওয়ারীর। রাজা যে তেওয়ারীকে কিছু দেয় না তা নয়। তো বিশ টাকা পেলে দুটাকা, এই রকম। ফলে দিনকে দিন খিটিমিটিটা বেড়ে যায় তেওয়ারীর সঙ্গে। রাজা ভাবে, আমি হালায় বইয়া বইয়া জান খারাপ কইরা পয়ছা ওঠামু, অর ভাগবি মাউরার পুতেরে দেওন লাগবে। হালায় বোড থনে ছয়ে টেকা পায় তাওবি নালের পয়ছার দিকে নজর! দিমু না! এক পয়ছা বি দিমু না। দেহি হালায় কী করে? তেওয়ারী ভাবে, ছালা বিকমাঘা জারুয়াকে হামি রাজা বানালাম। আর ও ছালা দেবে আমার উপর টেক্কা। দেকে লিব ছালাকে।
একদিন বোর্ড বসেছে, রাজা কমলারানীর ঘরে রাত কাটিয়ে গেছে নাল তুলতে। জেব ফাক্কা, পয়সাপাতির দরকার। পয়লা বোর্ডে হাত দিয়েছে, তেওয়ারী বলল, নাল বনদ। রাজা মিয়া হামার বোর্ডে আত দিবা না। থতমত খেয়ে হাত সরিয়ে আনে রাজা। তারপর কোদালের মতো তিন দাঁত নিচের ঠোঁট কামড়ে, চোখ ট্যারা করে তেওয়ারীর দিকে তাকায়, ক্যালা?
