প্রথম বাড়িটা দিয়ে ইমাম সাহেব একটু থামলেন। লোকজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ও মিয়ারা, আপনেরা কিন্তু গুনবেন। আমার তো খেয়াল থাকব না, একশটা হইলে বইলেন।
লোকজন সব স্তব্ধ হয়ে আছে কেবল ছটফট করছে পরী। একবার মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছে সে, একবার বাপ-ভাইর দিকে। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ওমা, ও বাবা, ভাইজান হুজুর বুবুরে মারতাছে কেন? বুবু তো মইরা যাইব! তোমরা কিছু কও না? ওমা, ও বাবা!
ততক্ষণে দ্বিতীয় বাড়িটা মেরেছেন ইমাম সাহেব, কেউ কিছু বুঝতে পারল না, হঠাৎ করেই পাগলের মতো ছুটে গিয়ে তার হাতের ঝাড়ুটা আঁকড়ে ধরল পরী। ঝাড়ুটা ইমাম সাহেবের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করল। আমার বুবুরে আপনে মারতাছেন। কেন? কেন মারতাছেন আমার বুবুরে?
আচমকা এরকম একটি কাণ্ড, ইমাম সাহেব বেশ থতমত খেলেন। তারপর কানা। হাশেমের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওই হাশেম, এই ছেমড়িডারে ধইরা রাখ।
সঙ্গে সঙ্গে লোহার মতো শক্ত দুহাতে পরীকে ধরল হাশেম। টেনেহেঁচড়ে ভিড়ের একপাশে এনে দুহাতে পরীর দুহাত এমন করে ধরে রাখল, অসহায় শিশুর মতো ছটফট করতে লাগল পরী, চিৎকার করতে লাগল। ছাইড়া দেও আমারে, ছাইড়া দেও। আমার বুবুরে তো মাইরা হালাইল?
পরীর কথা কেউ পাত্তা দিল না।
ইমাম সাহেব তখন অবিরাম ঝাড়ু চালাচ্ছেন। নাকমুখ দিয়ে হুমহাম করে জান্তব শব্দ হচ্ছে তার। কুসুমের গায়ে একটি ঝাড়ুর বাড়ি পড়ে, বহতা হাওয়া সেই লজ্জায় স্তব্ধ হয়। কুসুমের গায়ে একটি বাড়ি পড়ে, সূর্য গুটিয়ে নেয় তার সব আলো, পৃথিবী বিষণ্ণ হয় মেঘের ছায়ায়। কুসুমের গায়ে একটি বাড়ি পড়ে, বৃক্ষরা নত হয় গভীর শোকে, মৌন হয় মুখর পাখিরা। রজতরেখার জল রঙ বদলায়, নীল হয় আশ্চর্য এক বেদনায়। জলের ওপর শ্বাস ফেলতে উঠে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যায় নিরীহ মাছ। ঝোঁপঝাড়ের ছায়ায় বিষাক্ত কালজাত থাবা দিয়ে ধরে অসহায় মেঠো ইঁদুর।
.
কুসুমের গলা আঁকড়ে, তার বুকের কাছে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে পরী। সন্ধ্যের মুখে মুখে ওই অতটুকু শরীরের যাবতীয় শক্তি একত্রিত করে প্রায় হাঁচড়েপাঁচড়ে কুসুমকে সে বাড়ি নিয়ে এসেছে। মা-বাবা এবং তাদের একমাত্র ভাইটি কেউ ফিরেও তাকায়নি কুসুমের দিকে। বাড়ি ফিরে একটি কথাও বলেনি কেউ। প্রত্যেকেই যেন কুসুমের মতো পাথর হয়ে গিয়েছিল। প্রাণ ছিল কেবল পরীর। বোনের জন্য কী রেখে কী করবে কিছুই যেন বুঝতে পারছিল না সে। একবার বোনকে জড়িয়ে ধরে, একবার ছোট্ট দুহাত বোনের মাথায় পিঠে বুলিয়ে দেয়। ঝাড়ুর বাড়িতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া শরীর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। গভীর মমতায় সান্ত্বনা দেয় বোনকে। তুমি খুব ব্যথা পাইছ বুবু। হুজুরে যেমনে তোমারে মারল, আমি জানি তুমি খুব ব্যথা পাইছ। আমারে তো কানা হাশেম ধইরা রাখল। নাইলে আমি তোমারে মাইর খাইতে দিতাম না। দরকার হইলে তোমার মাইরটা নিজে খাইতাম। আমারে যত ইচ্ছা মারত হুজুরে। আমি কিছু কইতাম না।
কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছে পরী। কিন্তু কুসুম নির্বিকার। একবারও পরীর মুখের দিকে তাকায়নি, একবারও কোনও কষ্টের শব্দ করেনি। ঘরের মেঝেতে বিছানো ছেঁড়াখোঁড়া হোগলায় বসেছিল তো বসেই ছিল। চোখে পলক পড়ে না, বুক ঝাঁপিয়ে পড়ে না শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ। একেবারেই বাজ পড়া মানুষ যেন।
এই বাড়িতে আজ চুলো জ্বলেনি। বাড়ির মানুষের কারোরই পেটে কিছু পড়েনি। ক্ষিদের কথা যেন মনেও নেই কারও। কুসুমকে সান্ত্বনা দিতে দিতে পরী এক সময় ফিসফিসে গলায় বলেছিল, সারাদিন তুমি কিছু খাও নি। আমি জানি তোমার খুব ক্ষিদা লাগছে। বেবাকতে ঘুমানের পর চুপে চুপে টিন থিকা মুড়ি ঢাইলা আনমুনে। দুইজনে মিল্লা। খামুনে। আস অহন শুইয়া থাকি।
দুহাতে কুসুমকে ধরে বসে থাকা জায়গায়ই তারপর শুইয়ে দিয়েছিল পরী। নিজে শুয়েছিল কুসুমের গলা জড়িয়ে, বুকের কাছে মুখ গুঁজে। এখনও ওই একই অবস্থায় আছে। তবে গভীর ঘুমে।
আলতো করে পরীর হাতটা নামিয়ে দিল কুসুম, নিঃশব্দে উঠে বসল। বেড়ার ফাঁক ফোকর দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় গতরাতের মতোই তরল হয়ে আছে ঘরের অন্ধকার। আবছা মতো দেখা যায় পরীর পাশে মায়ের আঁচল ঢাকা মুখ, চৌকির ওপর কুসুমের দিকে কাত হয়ে থাকা বাবার মুখ। গভীর ঘুমে ডুবে আছে প্রতিটি মানুষ।
বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পবনের দেয়া নাকফুলটা তারপর বের করল কুসুম। এত ধকল গেল শরীরের ওপর দিয়ে তবু জায়গা মতো রয়ে গিয়েছিল জিনিসটা। এই নাকফুল তো নাকফুল নয়। কুসুমের জীবন, মরণ!
আশ্চর্য এক ঘোর লাগা চোখে নাক ফুলটির দিকে খানিক তাকিয়ে রইল কুসুম। তারপর অতিযত্নে নাকে পরল। পরতে পরতে পবনের উদ্দেশ্যে মনে মনে বলল, এই যে আমি তোমার দেওয়া নাকফুল পরলাম! এই যে আমি তোমার কথা মনে করলাম। তোমার কথা মনে কইরা মরতে পারলেও সুখ আমার।
গতরাতের পর এই প্রথম বুকের ভেতর উথলে উঠল কুসমের তীব্র কষ্টের এককান্না। বুক ফেটে চৌচির হল কুসুমের, চোখ ফেটে চৌচির হল। নিজের অজান্তে উঠে দাঁড়াল কুসুম। তাকের ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে নিল কীটনাশকের শিশি। ইরিক্ষেতের মাজরা পোকা মারার জন্য এনে রেখেছিল মালেক।
