নাদেরের কথা কেউ খেয়াল করল না।
কানা হাশেম তারপর ইমাম সাহেবকে বলল, মালেকরে আপনে জিগান হুজুর।
ইমাম সাহেব মালেকের দিকে তাকালেন। কথা সত্য নাকি মালেক?
মালেকও তার বাবার মতো মাথা নিচু করল। ক্ষীণ গলায় বলল, সত্য।
তাইলে আর কোনও সাক্ষীর দরকার নাই। যেই বাপ স্বীকার করে তার মাইয়া ব্যাভিচার করছে, যেই ভাই স্বীকার করে তার বইন ব্যাভিচার করছে, সেই মাইয়ার ব্যাভিচার প্রমাণের জইন্যে আর কোনও সাক্ষীসাবুদ লাগে না। এই মাইয়ার বিচার এখন করা যায়। কী মিয়ারা, করা যায় না?
লোকজন সমস্বরে বলল, যায়। যায়।
তসবি ধরা হাত নিজের দাড়িতে একবার বুলালেন ইমাম সাহেব। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, কুরআন শরিফে আল্লাহতায়ালা পরিষ্কার বলিয়াছেন যাহারা আল্লাহ প্রদত্ত বিধানমতে বিচার-মীমাংসা না করিবে নিশ্চয় তাহারা কাফের রূপে পরিগণিত হইবে। আমি আল্লাহর খাসবান্দা। আমি কাফের হইতে পারি না। আল্লাহপাকের বিধানমতে এই মাইয়ার বিচার আমি করব। ভাইসব, সুরা বাকারার দ্বিতীয় পারায় দুইশ একুশ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক বলিয়াছেন রমণীদিগকে কাফের পুরুষদের সঙ্গে বিবাহ দিও না। যদিও সেই কাফের পুরুষ তোমাদের চিত্ত আকর্ষণ করে। এই মাইয়া কাফেরের সঙ্গে অর্থাৎ হিন্দু ছেলের সঙ্গে মন দেওয়া-নেওয়া করেছে, অন্যান্য কুকাজ করেছে। আল্লাহর কথা, কুরআনের কথা শোনে নাই। এই মাইয়ার বিচার আল্লাহপাকের বিধানমতেই করতে হবে। ব্যাভিচার সম্বন্ধে সুরা নুরের আঠার পারার দ্বিতীয় আয়াতে বলা হইয়াছে, ব্যাভিচারিণী নারী এবং ব্যাভিচারী পুরুষ, তাহাদের প্রত্যেককে একশত কোড়া লাগাও এবং আল্লাহতায়ালার বিধান পালনে তাহাদের দুইজনের প্রতি তোমাদের মনে কণামাত্র দয়া আসা উচিত নহে। যদি তোমরা আল্লাহতায়ালার প্রতি এবং কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখ। আর উভয়কে শাস্তি প্রদান করিলে একদল মুসলমানের উপস্থিতি প্রয়োজন। একটু থামলেন ইমাম সাহেব, তারপর বললেন, ব্যাভিচারী পুরুষটি এইখানে নাই। আপনাদের উপস্থিতিতে তার বিচার আমরা করেছি। একশ কোড়া তাকে মারা হয় নি। দেড় হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। ওই টাকা মসজিদ পাকা করার কাজে লাগবে। এখন শুধু মাইয়ার বিচার হবে। আল্লাহর বিধান মতে একশ কোড়া মারতে হবে এই মাইয়াকে।
কানা হাশেম বলল, কোড়া পাইবেন কই হুজুর? ইমাম সাহেব হাসলেন। আরে নাদান, কোড়া মানে কোড়া না। ঝাড়ু দিয়াও কোড়ার কাজ চলে। যা মসজিদ থিকা বড় শলার ঝাড়ুটা নিয়া আয়।
কানা হাশেম মহা উৎসাহে মসজিদ ঘরের দিকে ছুটে গেল।
লোকজনের চোখ তখন কুসুমের দিকে। কিন্তু কুসুম আগের মতোই নির্বিকার। মুখখানি পাথরের মতো, চোখে পলক পড়ে না। পাশে দাঁড়িয়ে যে ফুসফুস করে কাঁদছে মা, মুখে আঁচল চাপছে বারবার কুসুম তা খেয়ালই করল না। খেয়াল করল পরী। মাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ওমা কান্দ কেন তুমি? কী হইছে?
অদূরে দাঁড়ানো কানা হাশেমের বউ চাপা স্বরে একটা ধমক দিল পরীকে। এই ছেমড়ি চুপ কর তুই।
পরীও প্রায় খেঁকিয়ে উঠতে গিয়েছিল কানা হাশেমকে ঝাড়ু হাতে ছুটে আসতে দেখে থেমে গেল।
ইমাম সাহেব বললেন, গাছের লগে প্যাঁচ দিয়া বান্ধ। ঝাড়ু মারার সময় যেন দৌড়াইয়া পলাইতে না পারে।
ইমাম সাহেবের পায়ের কাছে ঝাডুটা রেখে দৌড়ে গিয়ে কুসুমকে ধরল কানা হাশেম। তার সঙ্গে জুটল মোল্লা বাড়ির বদর। কোত্থেকে যেন গরু বাঁধবার একগাছা দড়ি নিয়ে এল বদরের বড়ভাই মোতালেব। মুহূর্তে বকুলগাছের সঙ্গে পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলল কুসুমকে। দৃশ্যটি দেখে কেউ কোনও কথা বলল না, হাহাকার করে উঠল কেবল পরী। মাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ওমা বুবুরে বান্ধে কেন? তোমরা কিছু কও না? ও বাবা, ও ভাইজান তোমরা কিছু কও না? বুবুরে বান্ধে কেন?
মিস্ত্রিবউর কান্না তখন আরও বেড়েছে। এতক্ষণ চাপাস্বরে কাঁদছিল এখন গুনগুন করে শব্দ হচ্ছে। খালেক মিস্ত্রির চোখও শুকনো নেই। দুহাটুর মাঝখানে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছে সে। মালেক হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়িয়েছে। এই দৃশ্য সে সহ্য করতে পারবে না। ভিড় ঠেলে বেরিয়ে যাবে, ইমাম সাহেব ঝাড়ু হাতে উঠে দাঁড়ালেন। মালেকের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই ছেমড়া কই যাছ? খাড়া এখানে। এই মাইয়ার শাস্তি বাপ-ভাইয়ের চোখের সামনে দিতে হইব।
মালেক মাথা নিচু করে দাঁড়াল।
ইমাম সাহেব পায়ে পায়ে কুসুমের সামনে গেলেন, ঝাডুটা মাত্র তুলবেন, নাদের বলল, ঝাড়ু না মাইরা তো জরিমানাও করন যায়। মিস্ত্রির কাছ থিকাও যদি দেড়হাজার টেকা আদায় হইত ওই টেকাটাও তাইলে মসজিদ পাকা করনের কামে লাগত। মিস্ত্রিরে জিগান না হুজুর, টেকা দিতে রাজি আছেনি?
ইমাম সাহেব কথা বলবার আগেই হাঁটুতে গুঁজে রাখা মুখ তুলল খালেক মিস্ত্রি। এক হাতে চোখ মুছে পরিষ্কার গলায় বলল, টেকা দিতে রাজি না আমি। আমার কাছে টেকা। নাই। থাকলেও টেকা আমি দিতাম না। এমুন মাইয়া থাকন না থাকন এককথা। একশটা না এক হাজারটা ঝাড়ুর বাড়ি মারেন ওরে।
ইমাম সাহেব ছহি উচ্চারণে বললেন, বিসমিল্লাহির রহমানের রাহিম। তারপরই প্রথম বাড়িটা মারলেন কুসুমকে।
কুসুম এখনও আগের মতোই নির্বিকার। দুজন মানুষ যে তাকে ধরে এনে গরু বাঁধার দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধেছে, সারা গ্রামের মানুষ যে তাকিয়ে তাকিয়ে তাকে দেখছে, ইমাম সাহেব যে মসজিদ ঝাড়ু দেয়ার বেশ লম্বা, বেশ শক্ত একখানা ঝাড়ু দিয়ে শরীরের যাবতীয় শক্তি একত্র করে এইমাত্র তাকে একটা বাড়ি দিলেন কোনও কিছুই যেন গায়ে লাগছে না তার।
