মিস্ত্রি কাঁদ কাঁদ গলায় বলল, তা তো কইবই।
তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, বৈকালের আগে আমারে তুমি উঠাইয়া নেও আল্লা। আমারে তুমি মরণ দেও। এই অপমান আমি সহ্য করতে পারুম না।
মসজিদ ঘরটির পেছন দিককার জঙ্গলে তুর তুর করছে একটি মেঠো ইঁদুর। চঞ্চল চোখে এদিক চায় ওদিক চায় আর বুভুক্ষের মতো খাদ্য খুঁজে বেড়ায়। কালজাত সাপটি ছিল হিজলগাছের নিচের দিককার একটি ডাল প্যাচিয়ে। বিকেলের মুখে মুখে তীক্ষ্ণ এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে কালজাতের গায়ে। শরীর এত তেলতেলে সাপটির, রোদ পড়ে পিছলে যাচ্ছিল। রোদের তাপ সইতে পারে না কালজাত। বিরক্ত হয়ে শরীরের প্যাঁচ খুলেছে, ছায়া খুঁজতে যাবে, জিভ বের করে শোনে বকুলতলায় বহু মানুষের হল্লাচিল্লা আর জঙ্গলের ছায়াময়তায় তুর তুর করছে একটি মেঠো ইঁদুর। মানুষের হল্লাচিল্লার শব্দ ভুলে কালজাত তারপর আততায়ীর মতো নিঃশব্দে এগুতে লাগল মেঠো ইঁদুরের দিকে।
.
পবিত্র কুআরান মাজিদে আল্লাহতায়ালা তার পেয়ারে নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লেল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামকে বলেন, “হে নবী, তোমার স্ত্রীগণ, তোমার কন্যাগণ এবং মোমেন স্ত্রীগণকে বলিয়া দাও যে, তাহারা যেন তাহাদের চাঁদর নিজেদের মুখমণ্ডলের উপরে ঘোমটা আকারে টানিয়া দেয়। বিশ্বাসী নারীদের বল, তাহারা যেন তাহাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাহাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে। তাহারা যাহা সাধারণত প্রকাশ করিয়া থাকে তাহা ছাড়া তাহাদের অন্য আভরণ প্রকাশ না করে, তাহাদের গ্রীবা বা বক্ষ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে।
ঘাটলার অদূরে, মাঠের কোণে একটি হাতাওয়ালা চেয়ারে বসেছেন ইমাম সাহেব। তাঁর পেছনে মসজিদ ঘর, সামনে বকুলগাছ। মাঠের এদিকটায় এসে জড়ো হয়েছে সারা গ্রামের লোক। কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ বসে। তবে কারও মুখে কোনও কথা নেই। ইমাম সাহেব কথা বলার সময় কথা বলা তো দূরের কথা সামান্য শব্দ পর্যন্ত করতে পারবে না কেউ।
খালেক মিস্ত্রি আর মালেক বসে আছে পাশাপাশি। দুজনেরই চেহারা এবং বসার ভঙ্গিতে ফুটে আছে গভীর অসহায়ত্ব, লজ্জা। তাদের পেছনে সার ধরে দাঁড়িয়ে আছে মিস্ত্রিবউ পরী এবং কুসুম। বিকেল বেলার রোদ উঠে গেছে মসজিদ ঘরের চালায়, গাছপালার মাথায়। তবুও কোত্থেকে কেমন করে যেন রোদের মোলায়েম একটি টুকরো এসে পড়েছে কুসুমের মুখে। সেই আলোয় কুসুমকে একেবারেই অচেনা মানুষ মনে হয়। এই মুখখানি যেন এতদিনকার কুসুমের নয়, এই মুখখানি যেন অন্য কারও। এরকম নির্বিকার মুখ কি কোনও মানুষের হয়!
কুসুমের চোখে কোনও পলক পড়ছিল না। ভিড় করা মানুষের মাথার ওপর দিয়ে সে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। কিন্তু আকাশ দেখছিল না কুসুম। কী যে দেখছিল, কেউ তা জানে না।
কথা শেষ করে কুসুমের দিকে তাকালেন ইমাম সাহেব। তসবি ধরা হাতের আঙুল তুলে বললেন, এই মাইয়া মোমিন না। এই মাইয়া হইল কমিন। সে কোনও পরদা মানে না। সে মাছ ধরতে নদীতে যায়, সে কোনও ঘোমটা দেয় না। ঘোমটা দেওয়ার কথা বললে সে ইমাম সাহেবের মুখে মুখে তক্ক করে। ইমাম সাহেবরে চোখ রাঙ্গায়।
একথা শুনে লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন ওঠে। এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কুসুমের নিয়ে। মুখর হয়। ইমাম সাহেব হুংকার ছাড়েন, খামোস। সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয় সবাই। গাছের পাতায় হাওয়া বয়ে যাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ থাকে না।
ইমাম সাহেব বললেন, আমার কথা শোনে না, এত বড় কলিজার পাটা মাইয়ার! আমি কি কাঠমোল্লা? উল্টাপাল্টা ফতোয়া দেই? আমি প্রথমে হইলাম ক্বারী তারপর হইলাম হাফেজ তারপর মাওলানা। ছহি কইরা মানে শুদ্ধ কইরা কুরআন শরিফ পড়তে শিখেছি, তারপর কুরআন শরিফ মুখস্ত করেছি তারপর শিখেছি কোরানের অর্থ। দেশগেরামের বেবাক মানুষ আমারে মানে, এই মাইয়া মানে না। যেদিন আমার লগে বেদ্দপি করছে। ওই দিনই আমি বুঝছি এই মাইয়া বদ, চরিত্রহীন। ওর মনে যা চায় ও তাই করতে পারে। খালি মা বাপ ভাই বইনের ইজ্জত ও ডুবায় নাই, বংশের ইজ্জত ডুবায় নাই, পুরা গেরামের ইজ্জত ডুবাইছে। ও মিয়ারা, কী বলেন আপনেরা? ডুবায় নাই?
লোকজন সমস্বরে বলল, ডুবাইছে। ডুবাইছে।
ইমাম সাহেব খালেক মিস্ত্রির দিকে তাকালেন। তুমি কী কও মিস্তিরি?
এখানে এসে বসার পর থেকেই মাথা নিচু হয়ে আছে খালেক মিস্ত্রির। ইমাম সাহেবের কথায় আরও নিচু হয়ে গেল। থুতনি গিয়ে হাঁটুতে লাগল তার। জড়ানো গলায় কোনোরকমে সে বলল, জ্বে হুজুর ডুবাইছে।
তয় তোমার মাইয়ায় যে ব্যাভিচার করছে তুমি তা স্বীকার করলা?
এ কথার সঙ্গে সঙ্গে কানা হাশেম লাফ দিয়ে ওঠে দাঁড়াল। স্বীকার না কইরা যাইব কই! বাড়ির বেবাক মানুষে গিয়া বেড় দিয়া ধরছে। পয়লা দেখছি আমি। দেইখা তো ডরাইয়া গেছি। মনে করছি বাঁশতলায় জ্বিনপরিতে মিলন ঘটছে। পরে দেখি, না, জ্বিনপরি না তো। এ তো আমগ কুসুম, এ তো নশঙ্করের পবনা। বাঁশতলায় কিষ্ণলীলা হইতাছে। পরে আমি গিয়াই তো মালেকরে ডাইকা উঠাইছি। কিরে মালেক, উঠাই নাই?
মালেক কোনও কথা বলল না।
পুর্ব পাড়ার নাদের দাঁড়িয়ে ছিল তার বন্ধু মিজানের সঙ্গে। হাশেমের কথা শুনে মিজানের দিকে তাকিয়ে বলল, হাশেম হমুন্দির পুতে কানা হইলে কী হইব আসল জিনিস বেবাকই দেখে।
