মালেক নড়ল না। পা দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গেছে তার। টেনে তুলতে পারছে না। তার বোন কুসুম করেছে এমন কাজ এ যেন তার বিশ্বাসই হচ্ছে না।
খালেক মিস্ত্রি মিস্ত্রিবউ আর পরীও এসে দাঁড়িয়েছে ভিড়ের মধ্যে। বয়সের তুলনায় পরী একটু বোকাসোকা। ব্যাপারটার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারছিল না সে। মাকে জিজ্ঞেস করল, ওমা, কী হইছে? এত মানুষ কেন এখানে? বুবু কী করতাছে?
পরীর কথা চাপা পড়ে গেল খালেক মিস্ত্রির হুংকারে। থাবা দিয়ে কুসুমের চুলের মুঠি ধরল সে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, বজ্জাত মাইয়া, এমনে চুনকালি দিলি আমার মুখে! তরে আমি জবাই কইরা ফালামু। জবাই কইরা তরে আমি গাঙ্গে ভাসাইয়া দিমু। আয় ঘরে আয়।
টেনে হেঁচড়ে কুসুমকে নিজের উঠোনের দিকে নিয়ে চলল মিস্ত্রি। কুসুম কোনও শব্দ করল না কিন্তু পরী একেবারে তেড়ে উঠল। দৌড়ে গিয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবার ওপর। কী করছে বুবু? তুমি এমুন করতাছ কেন? ছাইড়া দেও, বুবুরে তুমি ছাইড়া দেও বাবা।
একহাতে পরীর ঘাড় বরাবর বিশাল একটা ধাক্কা দিল মিস্ত্রি। পরী একেবারে উড়ে গিয়ে পড়ল খানিক দূরে। বেশ ব্যথা পেল, তবু তা গায়ে লাগাল না। ওঠে মিস্ত্রি এবং কুসুমের পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে বলল, ছাইড়া দেও, বুবুরে তুমি ছাইড়া দেও বাবা। মিস্ত্রি পাত্তা দিল না।
.
বড়ঘরের দাওয়ায় বসে ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদছে মিস্ত্রিবউ। বিলাপ করছে। আমার পেটের মাইয়া হইয়া এমুন কাম করল কুসুম! এমুন কইরা মান ইজ্জত খোয়াইল!
কুসুম বসে আছে ঘরের মেঝেতে। একেবারেই যেন পাথর হয়ে আছে সে। চোখে পলক পড়ে না। মুখে কোনো বিকার নেই। পরী বসে আছে তার গা ছুঁয়ে। যেন বোনটিকে সে পাহারা দিচ্ছে।
কাঁদতে কাঁদতে, বিলাপ করতে করতে হঠাৎ করেই যেন ক্ষেপে গেল মিস্ত্রিবউ। কুসুমের দিকে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করে বলল, ওই মাগি, করছিলি করছিলি মোসলমান পোলার লগে করতি। বিয়াশাদি দিয়া দিতাম। ইজ্জতটা বাচত। অহন তো আমার এই কূলও গেল ওই কূলও গেল! তোর মতন মাইয়ারে আমি বিয়া দিমু কেমনে? কে বিয়া করব তোরে?
চট চট করে তিনচারবার কপাল চাপড়াল মিস্ত্রিবউ। বেবাক এই কপালের দোষ! এমুন দুঃখও আছিল কপালে!
খালেক মিস্ত্রি বসে আছে অদূরে। আজ সে মণ্ডল বাড়ির কাজে যায়নি। অমায়িক মুখখানি তার থমথম করছে। ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড রাগে ফেটে যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সামলাচ্ছে বলে গালের চাপদাড়ির আড়ালে ফুলে ফুলে উঠছে মাংস। স্ত্রীকে কপাল চাপড়াতে দেখে মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল মিস্ত্রি। প্রকাণ্ড একটা ধমক দিল স্ত্রীকে। এই মাগি, অহন এত বিলাপ করছ কেন? অহন কেন কপাল থাবড়াস? আগে মনে আছিল না তোর? মাইয়া সিয়ানা হইলে যে চোখে চোখে রাখতে হয় বোঝছ নাই তুই?
বুঝুম না কেন? আমি তো চোখে চোখেই রাখছি! খারাপ তো কোনওদিন কিছু দেখি নাই! আমারে কইত আল্লারে ও বহুত ডরায়, ধর্মরে ডরায়। অহন তো দেহি সব মিথ্যা। আল্লারে ডরাইলে, ধর্মরে ডরাইলে কেউ এমুন কাম করে! ওরে জিগান কেন এমুন করল?
স্ত্রীর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল মিস্ত্রি। ঘরে ঢুকেই ধাম করে একটা লাথি মারল কুসুমের পেট বরাবর। কোক করে একটা শব্দ করল কুসুম, উড়ে গিয়ে বেড়ার সঙ্গে পড়ল। পাশে বসা পরী এতটা কল্পনাও করেনি। সে একেবারে হকচকিয়ে গেল। দিশেহারার মতো ছুটে গিয়ে কুসুমকে ধরল। কুসুম কোনও শব্দ করল না, কাঁদল না। আগের মতোই পাথর সে। চোখে পলক পড়ে না, মুখে কোনও বিকার নেই।
কুসুমকে বোধহয় আরও মারত মিস্ত্রি, মালেককে দেখে মারল না। মালেক এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে। মুখখানা লজ্জিত দুঃখিত তার।
ছেলেকে দেখে ঘর থেকে বেরুতে খালেক মিস্ত্রি বলল, পবনারে কী করছে?
মালেক বলল, দেড় হাজার টেকা জরিমানা।
ইমাম সাবে বিচার করছে?
হ। মণ্ডলরা আইছিল পবনরে ছাড়াইয়া নিতে। হইরা মণ্ডল খাড়াইয়া হাতজোড় কইরা কইল, আমার পোলায় অন্যায় করছে এর লেইগা আমি হাতজোড় কইরা মাফ চাইতাছি। বিচারে আপনেরা আমার পোলারে যেই শাস্তি দেন আমি মাইনা নিমু। তয় আমার একখান কথা আছে, আমি মনে করি দোষ আমার পোলার থিকা মিস্তিরির মাইয়ায় বেশি করছে। পুরুষ মানুষে অনেক কিছু করতে পারে, মাইয়ারা পারে না। আমার পোলায় তো জোর কইরা মিস্তিরির মাইয়ারে ঘর থিকা বাইর করে নাই। মাইয়া স্বেচ্ছায় বাইর হইয়া আইছে। দোষ মাইয়াডারই বেশি।
খালেক মিস্ত্রি মাথা নাড়ল। সত্য কথাই কইছে মণ্ডলে।
সালিশের মানুষরাও কইল, ইমাম সাবেও কইল মণ্ডলের কথা ঠিক। এর লেইগাই পবনের গায়ে হাত উঠায় নাই। দুই হাজার টেকা জরিমানা করল। হইরা মণ্ডল ইমাম সাবের হাতে পায়ে ধইরা পাঁচশো টেকা কমাইছে।
টেকা আদায় হইছে?
হ। লগে লগেই টেকা দিয়া পবনরে ছাড়াইয়া নিছে হইরা।
টেকাডাঃ কার কাছে?
ইমাম সাবের কাছে। এই টেকা বলে মসজিদ পাকা করনের কামে লাগব।
মিস্ত্রিবউ অস্থির গলায় বলল, যেই কামে ইচ্ছা লাগুক। কুসুমের কী হইব হেইডা কছ না কেন?
মালেক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কী হইব আমি কেমনে কমু! বৈকালে বিচার বসব। গেরামের বেবাক মানুষরে বকুলতলায় যাইতে কইছে ইমাম সাবে। কুসুমের লগে যাইতে কইছে আমগ বেবাকতেরে।
