আনমনা ভঙ্গিতে জিনিসটা নিল কুসুম। নিয়ে ব্লাউজের ভেতর, বুকের কাছে রেখে দিল। তারপর দুহাতে আঁকড়ে ধরল পবনের দুটো হাত। কোত্থেকে যে আকুল করা এক কান্না এল কুসুমের, সেই কান্নায়, চোখ ভেসে গেল তার, গাল ভেসে গেল। কাঁদতে কাঁদতে কুসুম বলল, পবনদাদা, আমি আপনেরে বহুত কষ্ট দিলাম। মন ভাইঙ্গা দিলাম আপনের। আপনে আমারে মাফ কইরা দিয়েন।
একথায় পবনেরও বুক ফেটে গেল, চোখ ভেসে গেল কান্নায়। দুহাতে পাগলের মতো কুসুমকে সে বুকে চেপে ধরল। জড়ানো গলায় বলল, মানুষের ধর্ম মানুষরে কেন মানুষের কাছ থিকা দূরে সরাইয়া দেয়?
নিজের অজান্তে কুসুমও তখন জড়িয়ে ধরেছে পবনকে। হু হু করা কান্নায় বুক ভাসাচ্ছে পবনের।
.
রাত দুপুরে খালেক মিস্ত্রির বাঁশঝাড় তলায় দুজন মানুষকে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল মিস্ত্রিবাড়ির তিন শরিকের এক শরিক কানা হাশেম। পেশাব করতে বেরিয়ে উঠোনের কোণের দিকটায় এসেছে সে, লুঙ্গি তুলে মাত্র বসতে যাবে, দেখে বাঁশঝাড়ের আলোআঁধারিতে এই দৃশ্য। প্রথমে সে খুব চমকেছে। কানা মানুষরা তো সব একচোখ দিয়ে দেখে! একচোখ দিয়ে দেখা কোনও কোনও বাস্তব দৃশ্যও কখনও কখনও অবাস্তব মনে হয়। তার ওপর সেই চোখে যদি থাকে ঘুমভাব তাহলে তো কোন কথাই নেই।
কানা হাশেমেরও তাই হল। দৃশ্যটি তার একেবারেই বাস্তব মনে হল না। মনে হল সে কোনও অলৌকিক দৃশ্য দেখছে। গৃহস্থ বাড়ির বাঁশঝাড়গুলোতে নিয়মিত আসাযাওয়া করেন তেনারা। রাত দুপুরের ম্যাট ম্যাটে জ্যোৎস্নায় সাদা পোশাকপরে আকাশে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন মদ্দাগুলো, মাদিগুলো ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদেন। তেমন দুজন বোধহয় খালেক মিস্ত্রির বাঁশঝাড় তলায় আজ মিলিত হয়েছেন। মদ্দাটা পরে আছেন শাদা পোশাক, মাদিটা ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছেন।
তারপর আর কথা কী, তোলা লুঙ্গি মুহূর্তে নামিয়ে ফেলল হাশেম। তলপেটের একেবারে তলায় নেমে আসা পেশাব কখন যে ওপর দিকে উঠে গেল হাশেম তা টেরই পেল না। বাবাগো বলে চিল্লায়ে একখানা দৌড় দিয়ে ঘরে মাত্র ঢুকতে যাবে, খোলা দরজায় বউকে দেখতে পেল। একই উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরুচ্ছিল হাশেমের বউ। স্বামীর অমন। দিশেহারা ভাব দেখে বলল, কী হইছে আপনের? এমুন করতাছেন কেন?
বউকে দেখে ধরে প্রাণটা যেন এল হাশেমের। তবে গলার স্বর গলায় আটকে গেছে বলে কথা সে বলতে পারল না। কায়ক্লেশে আঙুল তুলে খালেক মিস্ত্রির বাঁশঝাড় তলাটা দেখাল। ব্যাপারটার আগামাথা কিছুই বুঝল না বউ। গলা নামিয়ে বলল, কী?
হাশেমের গলায় এবার স্বর ফুটল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ক্ষীণ স্বরে সে বলল, তারা একজন না। দুইজন।
ব্যাপারটা তবু বুঝল না হাশেমের বউ। গভীর সন্দেহের গলায় বলল, কও কী! দেখি তো।
হাশেম আর কথা বলার সুযোগ পেল না। তার বউ দ্রুত হেঁটে উঠোনের কোণের দিকে চলে গেল।
হাশেমের হৃদপিণ্ডটা তখন চাঁইয়ে আটকেপড়া সরপুঁটির মতো লাফাচ্ছে। ঘরে ঢুকে যে দরজা দেবে, বউটা তো বাইরে রয়ে গেল! তেনাদের নজরে যদি পড়ে যায় তাহলে তো সর্বনাশ হবে!
কী করবে বুঝে ওঠার আগেই হাশেমের বউটি ফিরে এল। হাশেমের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, মাইয়াডারে তো চিনলাম, কুসুম। পোলাডারে চিনলাম না।
একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কানা হাশেম একেবারে বীরপুরুষ হয়ে গেল। সিনা টান করে বলল, কও কী! বাঁশতলায় তাইলে কিষ্ণলীলা হইতাছে! তুমি এক কাম কর, বাড়ির বেবাকতেরে ডাইকা উঠাও আমি যাইয়া মালেকরে ডাকি। চাইরদিক দিয়া বেড় দিয়া ধরি দুইজনরে। কিষ্ণলীলা ছুটাইয়া দেই।
বউ কী বলল হাশেম আর পাত্তা দিল না। লুঙ্গি কাছা মেরে, দ্রুত তবে একেবারেই নিঃশব্দে খালেক মিস্ত্রির পাটাতন ঘরের পেছন দিকটায় গিয়ে দাঁড়াল। ঘরের এই দিককার জানালার সঙ্গে মালেকের চৌকি। জানালা খোলা রেখে ঘুমোয় মালেক। আজও রেখেছে। সেই জানালার সামনে দাঁড়িয়ে গলা যতটা সম্ভব খাট করে মালেককে ডাকতে লাগল হাশেম। মালেক, ও মালেক ওঠ। তাড়াতাড়ি ওঠ।
দু তিনবার ডাকার পর সাড়া দিল মালেক। জানালার দিকে তাকিয়ে কানা হাশেমকে। চিনতে পারল। ধড়ফড় করে বিছানায় ওঠে বসল। কী হইছে?
মুখের হাসি কান পর্যন্ত টেনে হাশেম বলল, তগ বাঁশতলায় কিষ্ণলীলা হইতাছে। তাড়াতাড়ি আয়।
মালেক কিছুই বুঝল না, তবে দরজা খুলে বেরুল।
বাঁশঝাড় তলায় তখন মিস্ত্রিবাড়ির লোকজন তো আছেই আশপাশের বাড়ি থেকেও লোকজন এসে জুটেছে। চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে পবন আর কুসুমকে। কানা হাশেমের বউ খুবই তৎপরতার সঙ্গে করতে পেরেছে কাজটা। লোকজন বেশ হল্লাচিল্লা করছে, পবন আর কুসুম আছে স্তব্ধ হয়ে।
মালেককে নিয়ে বাশঝাড় তলায় এসেই প্রকাণ্ড একখানা লাফ দিল কানা হাশেম। চিৎকার করে বলল, এই বাড়িতে কিষ্ণলীলা! এত বড় সাহস! কেষ্ট ঠাকুরডা কে?
সবেধন নীলমণি চোখটি তীক্ষ্ণ করে পবনের মুখের দিকে তাকাল হাশেম। পবনকে চিনতে পেরে আরও জোরে চিৎকার দিল। আরে এইডা তো নশঙ্করের পবন না! হইরা জাউল্লার পোলা! ছ্যা ছ্যা ছ্যা! হিন্দু পোলার লগে মোসলমান মাইয়ার কিষ্ণলীলা! হায়। হায়রে মিস্ত্রিবাড়ির ইজ্জত আর রইল না! ওই মালেক, গরু বান্ধনের দড়ি ল। বান্ধ মালাউনের বাচ্চারে।
