কুসুম মনে মনে বলল, আর একটু খাড়ান পবনদাদা, আমি আসতেছি। তয় এইটাই আমাগ শেষ দেখা। আমি আপনেরে মাথার কিরা দিমু। আইজকার পর আপনে আমার লগে আর দেখা করতে পারবেন না। দেখা করতে চাইলে আমার মরা মুখ দেখবেন। আপনের লেইগা মইরা যামু আমি।
নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল কুসুম। দরজা খুলল।
বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর কাত হয়ে আছে ক্ষয়া চাঁদ। চাঁদের আলো তেমন স্বচ্ছ নয়, রজতরেখার জলের মতো সামান্য ঘোলাটে। এরকম আলোয় মানুষের ঘরবাড়ি কেমন দুঃখী মনে হয়। যেন বা অনাদিকালের কোনও গভীর দুঃখ বুকে চেপে দাঁড়িয়ে আছে। গাছের পাতায় পাতায় খেলছে নিশীথবেলার মগ্ন হাওয়া। হাওয়ার শব্দের সঙ্গে মিশেছে ঝিঁঝির ডাক। দূরে কোথায় একাকী ডেকে ক্লান্ত হচ্ছে এক রাতপাখি। ডানায় চাঁদের আলো মেখে উড়ে যায় বাদুড়। কুসুমদের বাড়ির বাশঝাড় তলায় দাঁড়ানো পবনের পায়ের কাছে ঘুর ঘুর করে একটি সাহসী ইঁদুর। ঝরা পাতায় সর সর করে শব্দ হয়। কিন্তু এসবের কিছুই খেয়াল করে না পবন। একদৃষ্টে কুসুমদের বড় ঘরটির দিকে তাকিয়ে আছে সে। অদ্ভুত এক অভিমানে বুক ফেটে যাচ্ছে তার, চোখ জ্বালা করছে।
কুসুম কি সত্যি সত্যি বেরুবে না! এতটা নিষ্ঠুর সে হয় কী করে! একবারও কি পবনের কথা সে ভাবছে না! নাকি নিশ্চিন্তে ডুবে আছে গভীর ঘুমে! পবন এসে যে দরজায় টোকা দিয়েছে শুনতে পায়নি! পবন এসে যে বাঁশঝাড় তলায় দাঁড়িয়ে আছে সে কথা কি তার মনে নেই!
পবন মনে মনে বলল, তবু আমি ফিরা যামু না। তবু আমি দাঁড়াইয়া থাকুম। সারারাত দাঁড়াইয়া থাকুম। সকাল হইলেও যামু না। দেখি কুসুম আমার কাছে কেমনে না আসে। দরকার হইলে কুসুমের বাপভাই আমারে ধরুক, মারুক যা ইচ্ছা তাই করুক, আমি যামু না।
ঠিক তখুনি ঘরের দরজা খুলে, সাবধানী চোখে চারদিক তাকাতে তাকাতে নরম পায়ে বাঁশঝাড় তলার দিকে হেঁটে এল কুসুম। দেখে আনন্দে একেবারে আত্মহারা হয়ে গেল পবন। সামান্য এগিয়ে গিয়ে দুহাতে কুসুমের একটা হাত ধরল সে। মুগ্ধ গলায় বলল, আমি জানতাম তুমি আসবা। তুমি না আইসা পারবা না।
আলতো করে হাতটা ছাড়িয়ে নিল কুসুম। ধীর শান্ত গলায় বলল, অনেক কিছু চিন্তা কইরা আসলাম।
কী চিন্তা?
শোনলে আপনে খুব কষ্ট পাইবেন। তাও না বইলা আমার কোনও উপায় নাই।
পবন একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, কপালে কষ্ট থাকলে তো পাইতেই হইব! কও শুনি।
কুসুম সরাসরি পবনের মুখের দিকে তাকাল। নদীর পারেও এই সব কথা আপনেরে আমি বলছি। আপনে শোনতে চান নাই, বোঝতে চান নাই। পবনদাদা, আমারে আপনের কথা দেওন লাগব আইজকার পর আপনে আর আমার লগে দেখা করনের চেষ্টা করবেন না। আমার চিন্তা আপনে বাদ দিয়া দিবেন।
পবন পরিষ্কার গলায় বলল, এইটা আমি পারুম না।
কথাটা শুনে কুসুম খুব দুঃখী হয়ে গেল। তাইলে তো আমার অন্য ব্যবস্থা করন লাগে।
কী ব্যবস্থা?
কুসুম উদাস গলায় বলল, না আপনেরে কোনও ঝামেলায় ফালামু না আমি। যা করনের নিজেই করুম।
পবন একটু ভয় পেয়ে গেল। এমুন কইরা কথা কইতাছ কেন? কী করবা কও আমারে! ইরিক্ষেতের মাজরা পোকা মারণের লেইগা কীটনাশক আইনা রাখছে ভাইজানে। কীটনাশক তো বিষ। পুরা এক শিশি খাইয়া ফালামু।
কুসুমের কথা শুনে পবন একেবারে দিশেহারা হয়ে গেল। দুহাতে পাগলের মতো কুসুমের একটা হাত ধরল। ভাঙাচোরা গলায় বলল, না না।
এছাড়া আমার কোনও উপায় নাই।
উপায় থাকব না কেন! আমি যে তোমারে বললাম চল দেশগেরাম ছাইড়া পলাইয়া যাই, তুমি রাজি হইতাছ না কেন?
এইটা আমার পক্ষে সম্ভব না।
কেন সম্ভব না? এমুন হয় না দুনিয়াতে? হিন্দু মাইয়া পলাইয়া যায় না মুসলমান পোলার হাত ধইরা? মুসলমান মাইয়া পলাইয়া যায় না হিন্দু পোলার হাত ধইরা?
যায়। কিন্তু আমি তেমুন মাইয়া না। আমি আপনেরে কতবার কমু আমি আল্লারে বহুত ডরাই, ধর্মরে বহুত ডরাই।
প্রেম কোনও ধর্ম মানে না। আমারে দেখ, আমি তো মানতাছি না।
সবাই এক রকম হয় না। আপনে যা পারতাছেন আমি তো পারতাছি না।
এবার কুসুমের হাত দুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরল পবন। কাতর গলায় বলল, তুমি এমুন কইর না কুসুম। তুমি আমারে একটু দয়া কর। আমার জীবনটা তুমি নষ্ট কইরা দিও না। আমার মনটা তুমি ভাইঙ্গা দিও না। আমি শুনছি তোমাগ ধর্মে আছে একজন মানুষের মন ভাঙ্গা আর একখান মসজিদ ভাঙ্গা সমান কথা। আমি হিন্দু হইতে পারি কিন্তু মানুষ তো! আমার মন তুমি কেন ভাঙ্গবা?
পবনের অনুনয়ে বুকটা হু হু করতে লাগল কুসুমের। তীব্র কান্নায় ফেটে যেতে চাইল। চোখ। তবু নিজেকে আগের মতোই শক্ত করে রাখল সে। নির্বিকার গলায় বলল, আপনে এমুন করলে আমার সামনে ওই একটাই রাস্তা।
নিজের অজান্তেই যেন কুসুমের হাত তারপর ছেড়ে দিল পবন। অপলক চোখে খানিক তাকিয়ে রইল কুসুমের মুখের দিকে, তারপর গভীর করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক আছে, আমার মুখ তোমারে আমি আর কোনওদিন দেখামু না। এই আমগ শেষ দেখা। তয় আমার একখান অনুরোধ তুমি রাইখো। ঢাকা থিকা তোমার লেইগা ছোট্ট একখান নাকফুল আনছিলাম। সাদা পাথরের নাকফুল। কোনদিন আমার কথা মনে কইরা এই। নাকফুলটা তুমি পইরো।
কথা বলতে বলতে শেষদিকে গলা ধরে এল পবনের। বুক পকেটে হাত দিয়ে কাগজে ছোট্ট করে জড়িয়ে রাখা নাকফুলটা বের করল সে। কুসুমের হাতে দিল।
