তাই করল কুসুম। একহাতে চোখ দুটো খানিক চেপে রেখে গভীর করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর জাল বাগিয়ে জলে নামল।
.
টুকটুক করে তিনটি টোকা পড়ল দরজায়। সেই শব্দে চমকে উঠল কুসুম, বুকটা ধড়ফড় করতে লাগল। তবু নিঃশব্দে মাথাটা সামান্য তুলল সে, বুঝতে চাইল কেউ টের পেয়েছে কিনা। বোধহয় পায়নি, পেলে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিত।
এই ঘরে চারজন মানুষ তারা। চৌকিতে আছে বাবা, মেঝেতে মা পরী আর কুসুম। মালেক থাকে পাটাতন ঘরে। জোয়ান মর্দ ছেলে মা-বাবা-বোনদের সঙ্গে একঘরে থাকে কী করে!
এখন কত রাত কে জানে! ঘরের ভেতর নিরেট অন্ধকার থাকার কথা কিন্তু অন্ধকারটা তেমন নয়। বেড়ার ফাঁকফোকড় দিয়ে চাঁদের আলো যতটুকু পারে এসে ঢুকেছে। জমাট অন্ধকার হালকা করে দিয়েছে। তীক্ষ্ণ চোখে তাকালে প্রতিটি মানুষের মুখ দেখা যায়। মানুষগুলোর মুখ দেখার চেষ্টা করল কুসুম।
তার পাশেই শুয়ে আছে পরী। দশ বারো বছরের মেয়ে কিন্তু শোয়ার ভঙ্গিটা একেবারেই শিশুর মতো। হাত পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে আছে। মুখটা কাত করা কুসুমের দিকে। মাথাটা হেলে পড়েছে বালিশ থেকে। ঠোঁট বোধহয় সামান্য ফাঁক হয়ে আছে পরীর, লালা ঝরে বালিশ ভিজছে। বিশ্রী একটা গন্ধ আসছে মুখের কাছ থেকে। নিশ্চয় গভীর ঘুমে পরী নয়ত হাত দিয়ে লালা মুছত।
পরীর ওপাশে শুয়ে আছে মা। অদ্ভুত এক অভ্যেস আছে মায়ের, যখনই শোয় শাড়ির আঁচলে মুখখানি একেবারে ঢেকে শোয়। ঘুমোয় না জেগে থাকে বোঝা যায় না। মায়ের দিকে তাকিয়ে কুসুমের ইচ্ছে হল দু আঙুলের ডগায় আলতো করে ধরে আঁচলটা সরিয়ে দেয় মুখ থেকে। চোখ দেখে বোঝার চেষ্টা করে ঘুমিয়ে আছে সে না জেগে।
না, তা করা ঠিক হবে না। যদি ঘুমিয়ে থাকে মা তাহলে মুখ থেকে আঁচল সরাবার সঙ্গে সঙ্গে জেগে যাবে। ধড়ফড় করে উঠে বসবে। আর যদি জেগে থাকে তাহলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবে, কী হইছে কুসুম? এমুন করতাছস কেন? বাইরে যাবিনি?
রাত বিরেতে একা ঘরের বার কখনও হয় না কুসুম। মা কিংবা পরীকে ডেকে নেয়। মায়ের মুখের দিকে কুসুম তারপর মগ্ন হয়ে তাকিয়ে রইল। কান পেতে বোঝার চেষ্টা করল তার শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ। গভীর ঘুমে ডুবে থাকা মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস বেশ ভারী হয়।
খানিক তাকিয়ে থেকে কুসুম বুঝে গেল মায়ের শ্বাসপ্রশ্বাস বেশ ভারী।
তারপর বাবার দিকে তাকাল কুসুম। অবশ্য না তাকালেও হত। দিনভর মণ্ডলবাড়িতে কাজ করে এসেছে, বেড়ার দিকে মুখ ফিরিয়ে যেমন করে নাক ডাকাচ্ছে এখন ফজরের আজানের আগে কিছুতেই ঘুম ভাঙবে না তার। এত কিছু দেখে বুঝেও কিন্তু কুসুম তারপর উঠে দাঁড়াল না, দরজা খুলে বেরুল না। যেমন নিঃশব্দে মাথা তুলেছিল তেমন নিঃশব্দেই মাথা রাখল বালিশে। বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়তে চাইল, দীর্ঘশ্বাসটা কুসুম চেপে চেপে ফেলল। দীর্ঘশ্বাসের শব্দে যেন কেউ না জাগে!
নদীতীর থেকে ফিরে আসার সময়ই কুসুম ভেবে রেখেছিল রাতেরবেলা কিছুতেই ঘর থেকে বেরুবে না সে। যতক্ষণ ইচ্ছে বাঁশঝাড় তলায় দাঁড়িয়ে থাক পবন। কতক্ষণই বা থাকবে! অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে এক সময় নিশ্চয় ফিরে যাবে। আর যদি একান্তই না যায় সকাল হলে তো যাবেই। লোকজন জেগে ওঠার পর কি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে! কাল থেকে নদীতে আর মাছও ধরতে যাবে না কুসুম। মাকে বলবে তার শরীর খারাপ। মা হয়ত পরীকে পাঠাবে। পরী ছোট্ট মানুষ, কুসুমের মতো দ্রুত মাছটা ধরতে পারবে না। সময় লাগবে, তবু কাজ তো চলবে। কিছুদিন নদীতীরে না গেলে, কুসুমের সঙ্গে দেখা না হলে টানটা পবনের কমে যাবে। যদি দরকার হয় নদীতীরে কুসুম আর কোনওদিন যাবেই না। কোনও না কোনও ভাবে মাকে বোঝাবে। বাবা বলেছে মণ্ডল বাড়ির কাজ শেষ করে কুসুমের বিয়ে দেবে। ততদিনে ক্ষেতের ধানও উঠবে ঘরে। সব মিলিয়ে দুতিন মাসের ব্যাপার। দুতিনটা মাস পবনের সঙ্গে আর দেখা না হলেই হল। তারপর পবন আর তাকে পাবে কোথায়! কোথাকার কোন গ্রামে বিয়ে হয়ে যাবে তার। বছর দুবছরে একবার বাপের বাড়ি নাইওর আসবে। পবনের সঙ্গে এই জীবনে হয়ত আর দেখাই হবে না।
কিন্তু পবনের কথা কী একেবারেই ভুলে যেতে পারবে কুসুম! চোখ জুড়ে কী থেকে যাবে পবনের মায়াবি মুখখানি! মনে কি রয়ে যাবে না তাকে নিয়ে অচিন নদীতীরে গিয়ে ঘর বাঁধতে চেয়েছিল একজন মানুষ। যে কোনও সমাজ মানতে চায়নি, যে কোনও ধর্ম মানতে চায়নি! দূর কোনও গ্রামে গৃহস্থবাড়ির বউ হয়ে স্বামীসংসার নিয়ে যখন ব্যস্ত হবে কুসুম, হঠাৎ হাওয়ায় তার কাছে কি ভেসে আসবে না পবনের গায়ের একটুখানি গন্ধ! মনের ভেতরটা কি আনচান করে উঠবে না তার! পবনের কথা ভেবে কুসুম কি তখন উদাস হবে না! সারা জীবনের জন্য এ কোন কষ্টের মধ্যে পড়ে গেল কুসুম! এই যে পবন এখন বাঁশঝাড় তলায় দাঁড়িয়ে আছে এই কষ্টই তো সহ্য করতে পারছে না সে। তার কেবল মনে হচ্ছে কাল রাতদুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল পবন, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে কুসুমের সঙ্গে দেখা করেছে তারপর শ্যালো নৌকোয় চড়ে গেছে ঢাকায়। ফিরতে ফিরতে নিশ্চয় রাত হয়েছে। দুপুরে ভাত খেয়েছে কিনা, রাতে ভাত খেয়েছে কিনা কে জানে! এক পলকের জন্য ঘুমিয়েছে কি ঘুমোয়নি কে জানে, বাঁশঝাড়তলায় এসে অপেক্ষা করছে। যে মানুষটি এত কষ্ট করছে কুসুমের জন্য, কুসুম কি কিছুই করবে না তার জন্য?
