কিন্তু মুখে কুসুম বলল অন্য কথা। আমি তো আইজ গাঙ্গে আসতেই চাই নাই।
কথাটা শুনে আঁতকে উঠল মানুষটি। কেন আসতে চাও নাই?
আপনের লাইগা! আপনে যে কী শুরু করছেন!
খারাপ কিছু তো আমি করতাছি না। আমার মন চায় তোমারে দেখতে, আমি তোমারে দেখতে আসি।
মন চাইলেই কি সব কাম করতে পারে মানুষে! আমার মনও তো কত কিছু চায়। জোর কইরা মনরে বাইন্দা রাখি আমি।
তুমি পার, আমি পারি না।
কেন পারেন না আপনে?
কইতে পারি না। আমার খালি মনে হয় তোমার মুখখান একবার না দেখলে আমার কোনও কাম হইব না। তোমার মুখ না দেইখা আড়তে গেলে কোনও মাছ পামু না। বরফ দেওয়া মাছ নৌকায় উঠাইয়া দেখুম বরফের মইধ্যে থাইকাও পইচা গেছে বেবাক মাছ। হাজার হাজার টেকা লোকশান হইয়া যাইব। তয় সেই লোকশানরে আমি ডরাই না। আমি ডরাই নিজেরে, আমি ডরাই মরণরে। আমার খালি মনে হয় একদিন তোমার মুখ না দেখলে আমি আর বাচুম না। আমি মইরা যামু। আইজ তুমি না আইলে এই গাছতলায় বইসাই মইরা যাইতাম আমি।
কথা বলতে বলতে শেষদিকে গলা ধরে এল মানুষটির। চোখ ছলছল করে উঠল। মানুষটির মুখের দিকে তাকাতে পারল না কুসুম। বুকটা উথালপাথাল করছে তার। চোখ দুটো ফেটে যেতে চাইছে। তবু নিজেকে সামলাল কুসুম। নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, এমুন করন ঠিক হইতাছে না আপনের। মন শান্ত করেন, জোর কইরা বান্ধেন মনরে। মা বাপের একমাত্র পোলা আপনে। আপনেরে লইয়া কত স্বপ্ন তাগ। বাড়িতে পাটাতন ঘর উঠাইব আপনের বাপে, আপনেরে বিয়া করাইব। মা-বাপের কথামতন বিয়া কইরা ফালান, বিয়া করলে সব ঠিক হইয়া যাইব।
না ঠিক হইব না। পাটাতন ঘরে সোনার পালঙ্কে রাজকন্যা লইয়া শুইলেও ঘুম আসব না আমার। আমার খালি তোমার কথা মনে হইব। তুমি লগে থাকলে আমার কোনও পাটাতন ঘর লাগব না, খাটপালঙ্ক কিচ্ছু লাগব না। তোমারে লইয়া গাছতলায় শুইয়া থাকলেও সুখে ঘুমাইতে পারুম আমি। তুমি ছাড়া কেউ আমার বউ হইতে পারব না।
কুসুম অসহায় গলায় বলল, এই কথা কইয়েন না। এই কথা শোনলে আমার পাপ হইব।
কিসের পাপ?
এবার নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না কুসুম। বুক ফেটে গেল তার, চোখ ফেটে গেল। কান্নাকাতর গলায় কুসুম বলল, পবনদাদা, আপনে বোঝেন না কেন আপনে হিন্দু! মুসলমান মাইয়া আপনের বউ হইতে পারে না।
ফ্যাল ফ্যাল করে কুসুমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল পবন। তারপর বলল, আমি হিন্দু মুসলমান বুঝি না, আমি বুঝি তোমারে। আমি কোনও ধর্ম বুঝি না, আমি বুঝি মানুষ।
এই সব কথা সমাজের মানুষে শুনব না, বুঝব না। হিন্দু-মুসলমানের বিয়া দেশগেরামে কেউ মাইনা নিব না।
না নিলে দেশ গেরামে থাকুম না। তোমার হাত ধইরা এই গেরাম ছাইড়া চইলা যামু।
কই যাইবেন?
নদীর ওপারকার ধু ধু প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নময় হয়ে গেল পবনের দুচোখ।
বহুত দূরের অচিন কোনও নদীর তীরে গিয়া ঘর বান্ধুম। সারাদিন মাছ ধরুম নদীতে। দুইজন মানুষের জীবন সুখে কাটব। আমি হিন্দু তুমি মুসলমান এই কথা কেউ জানব না। দিনে দিনে আমরা দুইজনেও জাতধর্ম ভুইলা যামু। তুমি আমার লগে যাইবা কুসুম?
পবনের কথা শুনতে শুনতে তার চোখের স্বপ্ন যেন কুসুমের চোখে এসেও ভর করেছে। এরকম একটি জীবনের ছবি যেন সেও দেখতে শুরু করেছে। দেখতে দেখতে আশ্চর্য এক ঘোর লেগে গেছে তার চোখে। পবনের শেষ কথাটি সে শুনতেই পেল না।
পবন আবার বলল, যাইবা কুসুম?
আলতো করে পবনের দিকে মুখ ফেরাল কুসুম। কথা বলল না। জালের ভেতর থেকে কীরকম চোখ করে যে পবনের দিকে তাকিয়ে রইল!
কুসুমের মুখের দিকে তাকিয়ে মায়াবি গলায় পবন বলল, ঠিক আছে এখন না কইতে চাইলে রাইতে কইয়ো। রাইতে তোমগ বড়ঘরের পিছনে যে বাঁশঝাড় আছে ওই বাঁশঝাড় তলায় আসুম আমি। ঘরের দরজায় টুকটুক কইরা তিনখান টোকা পড়লে তুমি বুঝবা আমি আসছি। তখন সাবধানে দরজা খুইলা বাইর হইবা।
কুসুম মাথা নেড়ে বলল, না।
পবন ম্লান হাসল। ঢাকা থিকা একখান জিনিস আনুম তোমার লেইগা। ওইটা দিয়া আসুম আর শুইনা আসুম তুমি কী কও।
কুসুম আবার বলল, না। রাইতে আপনে আমগ বাড়িত যাইয়েন না। আমি বাইর হমু না।
কেন?
এমনেই। যা শোনতে চান এখনই শুইনা যান। আমি আপনের লগে কোনখানে যামু না। আল্লারে আমি বহুত ডরাই, ধর্মরে বহুত ডরাই। ধর্ম ত্যাগ আমি করতে পারুম না। আমার আশা আপনে ছাইড়া দেন।
পবন অবুঝ গলায় বলল, না তা আমি ছাড়ুম না। রাইতে তোমগ বাঁশঝাড় তলায় গিয়া দাঁড়াইয়া থাকুম। তোমার ইচ্ছা হইলে বাইর হইবা না ইচ্ছা হইলে হইবা না। আমি দাঁড়াইয়াই থাকুম।
পুবের আকাশ ঘারুয়া মাছের মুখের ভেতরকার মতো লাল হয়ে উঠেছে কখন! সূর্য উঠছে। নদীর দুপারে জড়ো হচ্ছে মাছলোভী মানুষ। এসব দেখে পবন আর দাঁড়াল না। কড়ুইতলা ছাড়িয়ে দ্রুত হেঁটে সড়কের দিকে চলে গেল।
কুসুমের তখন কী যে অসহায় লাগছে! বুক ফেটে যেতে চাইছে গভীর কান্নায়। ইচ্ছে করছে নদীতীরের বেলেমাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদে। কিন্তু তেমন কান্না কাঁদবারও ক্ষমতা নেই কুসুমের। তাকে ওভাবে কাঁদতে দেখলে নদীতে মাছ ধরতে আসা মানুষ ভিড় করবে চারপাশে, হাজারো প্রশ্নে জর্জরিত করবে কুসুমকে। তারচে বুকের কান্না বুকে চেপে রাখা ভালো। চোখের কান্না লুকিয়ে রাখা ভালো চোখের ভেতর।
