আজও গেছে, তবে বেশিদূর নয়। মসজিদের পেছনটা ঝোঁপঝাড়ে আকীর্ণ। দিনমান ছায়াময়, শীতল একখানা ভাব জায়গাটায়। সাপটি আজ এই জায়গায় চড়ছে। গতিটা ধীর মন্থর কিন্তু মেজাজটা তিরিক্ষি। অকারণেই ফণা তুলতে ইচ্ছে করছে। ওপরের পাটিতে ভাঁজ করে রাখা বিষদাঁত খুলে দংশাতে ইচ্ছে করছে কাউকে। বোধহয় এজন্যই থেকে থেকে মাথা তুলে চারপাশটা দেখছিল কালজাত।
ঠিক কালজাতের ভঙ্গিতে ইমাম সাহেবও আজ মাথা তুলছিলেন। মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন। খানিক আগে নামাজ শেষ করে যে যার বিষয় কর্মে ফিরে গেছে। কেবল ইমাম সাহেব যাননি, সামনের মাঠটায় পায়চারী করছেন। মেজাজটা কেন যে খারাপ হয়ে আছে তার! এ অবস্থায় কুসুম পড়ে গেল তার মুখোমুখি। এমনিতেই বেশ আনমনা ছিল মেয়েটি, তার ওপর চারদিকে পরিষ্কার আলো ফুটে উঠছে দেখে দ্রুত পায়ে হাঁটছিল, ইমাম সাহেবকে সে খেয়াল করেনি। ফলে মাথায় ঘোমটা দেয়ার কথা মনে ছিল না। এই ব্যাপারটি মাথায় আগুন ধরিয়ে দিল ইমাম সাহেবের। তসবি ধরা হাত বাড়িয়ে কুসুমের পথ রোধ করলেন তিনি। এই ছেমড়ি, খাড়া।
থতমত খেয়ে দাঁড়াল কুসুম।
ইমাম সাহেব বললেন, তুই খালেক মিস্তিরির মাইয়া না?
হ।
মাথায় ঘোমটা নাই কেন?
কুসুম অপরাধীর গলায় বলল, ঘোমটা দিতে মনে আছিল না।
এবার ফণা তোলা কালজাতের মতো হিসহিস করে উঠলেন ইমাম সাহেব। বেশরম বেতমিজ মাইয়া, আবার মুখে মুখে কথা কয়! ঘোমটা দিতে মনে আছিল না! আগে না হয় মনে আছিল না, এতক্ষণ ধইরা যে আমার সামনে খাড়াইয়া রইছস ঘোমটা দিলি না কেন?
কুসুম একটা ঢোক গিলল। অসহায় গলায় বলল, কেমনে ঘোমটা দিমু! আমার একহাতে জাল আরেক হাতে হাঁড়ি।
কিন্তু একথায় বিন্দুমাত্র নরম হলেন না ইমাম সাহেব। বরং আরও রাগলেন। দাঁত কটমটিয়ে বললেন, কস কী! আরে কস কী তুই! জালহাঁড়ি ফালাইয়া দে। আগে পরদা তারপর অন্য কাম।
এবার কুসুম একটু রাগল। মুখ গোঁজ করে গম্ভীর গলায় বলল, আমগ মতোন মানুষের পরদা চলে না। পেটে ভাত না থাকলে পরদা দিয়া কী হইব! জালহাঁড়ি ফালামু কেন! আমি মাছ ধইরা না আনলে বাড়ির মানুষে খাইব কী! আগে খাওন তারপর পরদা।
ইমাম সাহেব কল্পনাও করেননি মেয়েটি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে এতগুলো কথা বলবে। তিনি একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। হা করে কুসুমের মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইলেন, তারপর আগের মতোই দাঁত কটমটিয়ে বললেন, আমার সামনে খাড়াইয়া এইভাবে কথা! তোরে তো আমি কোতল কইরা ফালামু। একে বেপরদা তার উপর বড় বড় কথা। তোরে তো আল্লায়ও আমার হাত থিকা বাঁচাইতে পারব না।
কুসুম নির্বিকার গলায় বলল, আল্লায় যদি না বাঁচায় তাইলে আর বাঁচুম কেমনে! আল্লায় না বাঁচাইলে মানুষ কি বাঁচে?
বলে আর দাঁড়াল না। দ্রুত নদীর দিকে হাঁটতে লাগল। ইমাম সাহেব তখনও তাকিয়ে আছেন কুসুমের দিকে। বিশাল ক্রোধে বুক ফেটে যাচ্ছে তার।
.
নদীর জলে মাত্র পা ছোঁয়াবে কুসুম, কড়ইতলার মানুষটি তার পেছনে এসে দাঁড়াল। এত দেরি করলা কেন? আমি সেই কখন থিকা বইসা আছি!
গলায় অভিমান এবং অপেক্ষার কষ্ট ছিল মানুষটির। শুনে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল কুসুমের। মানুষটির দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়াল সে। মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে তার মুখের দিকে তাকাল, তারপরই চোখ নামিয়ে নিল। মাছ রাখার হাঁড়িটা আছে পায়ের কাছে, দুহাতে বাগিয়ে ধরেছিল জাল, আলতো করে সেই জাল বুকের কাছে দাঁড় করাল কুসুম। তিনটি সরু বাঁশ ত্রিভুজের মতো করে, বাঁশের তিনকোণে বেঁধে দেয়া হয়েছে জাল। জালের যে মাথা দুহাতে ধরে জলের তলা দিয়ে ঠেলে নিতে হয় সেই মাথার বাঁশ দুটো। সামান্য বাড়িয়ে রাখা। বুকের কাছে দাঁড় করাবার ফলে জালের এই মাথাটি এখন কুসুমের মুখ ছাড়িয়ে অনেক দূর উঠেছে। হঠাৎ করে তাকালে মনে হয় জালের ফাঁদে আটকা পড়েছে কুসুম। সে নিজেই যেন রজতরেখার একখানা অসহায় মাছ। হাতজালে তাকে বন্দি করেছে কোনও চতুর জেলে।
কিন্তু এসবের কোনও কিছুই খেয়াল করল না মানুষটি। বলল, আমি যখন কডুইতলায় আসলাম তার অনেকক্ষণ পর মোরগে বাগ দিল, আজান হইল। আসমানে চান্দ আছিল। চান্দের আলোয় নশঙ্কর থিকা হাঁইটা আসছি।
কুসুম নরম গলায় বলল, কেন আসছেন?
মানুষটি দুঃখী গলায় বলল, জান না কেন আসছি! তোমার লগে দেখা না কইরা কামে যাইতে পারি না আমি। আইজ মাছের চালানের লগে নিজেরও ঢাকা যাওনের কথা আমার। শ্যালো নৌকায় বরফ দেওয়া মাছ ভইরা বইসা রইছে মাঝিরা। আমি না গেলে নৌকা ছাড়ব না। আমার অনেক দেরি হইয়া গেল।
কুসুম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেন যে আপনে এমুন করতাছেন!
এমুন আমি করতে চাই না। সত্যই করতে চাই না। চাই তোমারে ভুইলা যাইতে, ভুইলা থাকতে পারি না। আমার শুইয়া শান্তি নাই, বইসা শান্তি নাই, খাইয়া শান্তি নাই, কামে শান্তি নাই। সব সময় আমার খালি তোমার কথা মনে হয়। তোমার মুখখান খালি আমার চোখের সামনে দেখি। ঘুমাইলে স্বপ্ন দেখি তোমারে, জাইগা থাকলেও স্বপ্নের মতোনই দেখি তোমারে। কোনটা স্বপ্ন কোনটা সত্য বুঝতে পারি না। ঘুমে থাকি না। সজাগ থাকি বুঝতে পারি না। রাইত কাটে ছটফট ছটফট কইরা। খালি মনে হয় কখন সকাল হইব, কখন কড়ইতলায় যামু, কখন তোমার মুখখান একটু দেখুম! তোমার মুখ না দেইখা আমার শান্তি নাই। কুসুম মনে মনে বলল, আমারও তো এমুনই হয়। আমিও তো এক ফোঁটা ঘুমাইতে পারি না রাইতে। খালি মনে হয় সকাল হয় না কেন, গাঙ্গের পারে যাই না কেন আমি! আমারও তো আপনের মুখখান খালি দেখতে ইচ্ছা করে। আপনের কথা ভাইবা দেখেন আমার মুখখান কেমুন শুকাইয়া গেছে! চোখ দুইখান দেখেন কেমুন বইসা গেছে। চোখের কোলে এমুন কইরা কালি পড়ছে যেন চোখে কাজল দিছি আমি।
