কথা শেষ করে বাক্সটা কাঁধে নিল মিস্ত্রি। তারপর কুসুমের দিকে তাকাল, তাকিয়ে অবাক হল। কোন ফাঁকে একেবারেই আনমনা হয়ে গেছে মেয়েটি। কী যেন ভাবছে।
মিস্ত্রি হাসিমুখে বলল, কী গো মা, কী চিন্তা কর?
কুসুম একটু চমকাল। তারপর বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। কিছু না।
তয় লও বাইর হই।
কুসুম কথা বলবার আগেই মিস্ত্রিবউ বলল, মাইয়ার লগে বাইর হইয়া আপনের লাভ কী! মাইয়া যাইব একদিকে আপনে যাইবেন আরেক দিকে।
মিস্ত্রি আবার হাসল। তবুও বাপ মাইয়ায় এক লগে কামে বাইর হইলাম এইডা চিন্তা কইরা আমার বহুত ভালো লাগব। কুসুম যদি আমার মাইয়া না অইয়া পোলা হইত বহুত ভালো হইত!
কেন পোলা আপনের আছে না?
যে আছে সে তো আমার পোলা না। জমিদারের পোলা। ঘুম থিকা ওঠে বেলা দশটায়। ও যদি পবনের মতোন কামের হইত তাইলে আমার সংসারের চেহারা ঘুইরা যাইত। বুড়াকালে মিস্ত্রিগিরি করণ লাগত না। হোন, মালেকরে আইজ বাজারে পাঠাইয়ো। দুই বোতল কীটনাশক যেন আইন্না রাখে। ইরি ক্ষেতে মাজরা পোকা হইছে। পানির লগে অষুদ মিশাইয়া পিচকারি দিয়া ক্ষেতে ছিটাইয়া দেওন লাগব। নইলে কিন্তু ধান বাচব না। মণ্ডল বাড়ির কাম আর ক্ষেতের ধান এই দুইডা এক কইরা এই বছরই কুসুমের বিয়া দিয়া দিমু।
বিয়ের কথা শুনে হঠাৎ করেই ছটফট করে উঠল কুসুম। চঞ্চল গলায় বলল, আমি যাই বাবা। আমার দেরি হইয়া গেল।
মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার হাসল মিস্ত্রি। আর একটু খাড়াও মা। এক লগেই যাই।
মিস্ত্রিবউ বিরক্ত হয়ে বলল, মাইয়াডারে আটকাইয়া রাখতাছেন কেন! ওর লগে আপনি কেমনে যাইবেন? নাস্তাপানি না খাইয়া বাড়িত থন বাইর হইবেননি! দোফইরার খাওন লইয়া যাইবেন না? হিন্দু বাড়িত কামে যাইবেন এই কথা তো আমারে আগে কন নাই! মিস্ত্রি অবাক গলায় বলল, কওনের কী আছে! কামের লগে হিন্দু বাড়ি মোসলমান বাড়ির সমন্ধ কী!
সমন্ধ আছে। হিন্দু বাড়িতে কি আপনে খাইতে পারবেন? গুড়মুড়ি লইয়া যান। আইজকার মতোন খাইয়া লইয়েন। কাইল থিকা আটারুটি বানাইয়া দিমুনে।
মুখের কাঁচাপাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে অমায়িক গলায় মিস্ত্রি বলল, এই সব লইয়া তুমি চিন্তা কইর না। গুড়মুড়ি মণ্ডল বাড়িত থিকাও দিব আমারে। আটারুটি না, দোফরে ভাতই খাওয়াইব। ধর্ম এত সস্তা জিনিস না যে হিন্দু বাড়িত ভাত খাইলে চইলা যাইব! তারপর মেয়ের দিকে তাকাল মিস্ত্রি। ল মা।
কুসুম কোনও কথা বলল না। বাবার পিছু পিছু দ্রুত হাঁটতে লাগল। বারবাড়ি তখনও ছাড়িয়ে যায়নি, পেছনে মিস্ত্রিবউর গলা শুনতে পেল দুজন মানুষ। চিৎকার করে ছোট মেয়েটিকে ডাকছে সে। পরী, ও পরী উঠছ না? বেলা হইয়া গেল তাও ঘুম ভাঙ্গে না মাইয়ার! ও পরী, ওঠ।
হাঁটতে হাঁটতে মেয়ের মুখের দিকে তাকাল মিস্ত্রি। হাসল। তোর মার কামডা দেখছচ মা! জুয়ান পোলাডা ঘুমাইয়া রইছে তারে ডাকে না, ডাকে ছোড মাইয়াডারে। কুসুম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, দুনিয়াতে মাইয়াগ কোনও দাম নাই।
.
পায়ে চলা পথটির পাশে বিষণ্ন একখানা মাঠ পড়ে আছে। মাঠের উত্তরে গ্রামের মসজিদ। এখনও পাকা হয়নি মসজিদ। টিনের বিশাল একখানা ঘরে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ আদায় করে মুসল্লিরা। ইমাম আছেন মাওলানা আবদুর রহিম।
মসজিদের লাগোয়া বাধান ঘাটলার সুন্দর একখানা পুকুর। পুকুরের তিনপার জুড়ে নানা রকমের আগাছার জঙ্গল। সেই জঙ্গল ফুটো করে আকাশে মাথা তুলেছে বেশ কয়েকটি হিজল মাদার আর একটি গাবগাছ। গাবগাছটির খোড়লে থাকত অতিকায় লম্বা শরীরের প্রাচীন এক কালজাত সাপ। কিছুকাল হল আবাস পাল্টেছে সে। দিনমান চারদিকের ঝোঁপ জঙ্গলে চড়ে, রাতেরবেলা এশার নামাজ সেরে মুসল্লিরা যখন বাড়ি ফিরে যায়, চারদিক যখন গভীর নির্জনতায় ডোবে, ঝিঁঝির ডাক আর গাছের পাতা ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ায় শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ যখন শোনা যায় না, লম্বা শরীর টেনে সাপটি তখন এসে ঢোকে মসজিদ ঘরে। ইমাম সাহেব যেখানে সেজদায় যান সেই জায়গাটির পাশে শুকনো শীতল মাটিতে শরীর গুটিয়ে পড়ে থাকে। ফজরের আজানের সময়, মানুষের সাড়া পেয়ে জায়গাটা সে ছেড়ে যায়। তবে আচমকা ঘুম ভাঙার ফলে মেজাজটা তখন খুবই তিরিক্ষি থাকে কালজাতের। চারপাশের সব মানুষকে দংশাতে ইচ্ছে করে।
পুকুরের এপারে, মাঠের কোণে আছে একটি বকুল গাছ। গাঢ় সবুজ পাতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে গাছটি। এই গাছতলায় গ্রামের বিচার সালিশ বসে। ইমাম সাহেব বিচার করেন। খুবই পরহেজগার লোক তিনি। গোড়ালি অব্দি লম্বা, সাদা ধপধপে পাঞ্জাবি পরে থাকেন। পাঞ্জাবির তলায় লুঙ্গি। তবে সেই লুঙ্গি বলতে গেলে দেখাই যায় না। পাঞ্জাবির আড়ালে চাপা পড়ে থাকে। পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল ইমাম সাহেবের, মাথায় সারাক্ষণই আছে সাদা গোলটুপি। টুপির চারপাশে জরির কাজ করা। ভাটার মতো চোখে তাঁর সুরমা দেয়া, গাবের ডালার মতো শক্ত হাতে তসবি। গাভীন গরুর পেটের মতো মোটা শরীর থেকে ভুরভুর করে বেরয় আতরের তীব্র গন্ধ। মুখের দাড়ি লম্বা হয়ে বুক ছুঁয়েছে। কাঁচা পাকায় মেশান দাড়ি মেহেদির রঙে রাঙানো।
এই মানুষের কথা অমান্য করে, কার সাধ্য! ইমাম সাহেবের বিচার দেশের আইন কানুনের তোয়াক্কা করে না। তিনি তাঁর মতো রায় ঘোষণা করেন, রায় কার্যকর করেন। প্রতি ওয়াক্তের আজান শেষ হওয়ার পর পরই চারপাশের বাড়িঘর থেকে নামাজি মানুষ বেরিয়ে মসজিদে এসে জড়ো হয়। ঘাটলায় বসে ওজু করে তারপর ইমাম সাহেবের পেছনে কাতার বেঁধে নামাজ পড়ে। মসজিদে মানুষের সাড়া পেয়ে বিরক্ত হয়ে গুটিয়ে রাখা শরীরের ভঁজ খোলে কালজাত। তারপর টিনের বেড়া এবং তলার মাটির ফাঁক দিয়ে শরীর গড়িয়ে বেরিয়ে যায়।
