পুর্ব দিককার পাটাতন ঘরের মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ছে খালেক মিস্ত্রি। আল্লাহু আকবার বলে এইমাত্র রুকুতে গেল সে। দুহাতে দুহাঁটু চেপে ধরে, মাথা পিঠ ও কোমর সমানভাবে রেখে দোয়া পড়ল। তারপর ছামিয়াল্লাহু লিমান হামিদা বলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। এবার আল্লাহু আকবার বলে সিজদায় যাবে। ঠিক তখুনি স্বামীর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল মিস্ত্রিবউ। মেয়েকে তাড়া দিয়েই স্বামীর দিকে তাকিয়েছিল সে।
কিন্তু মেয়েটির আজ কী হয়েছে? এখনও যে বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে না! মায়ের কথার জবাবও তো দিল না!
মিস্ত্রিবউ তারপর কুসুমের সামনে এসে দাঁড়াল। ভুরু কুঁচকে বলল, কী হইছে তোর?
ঘরের চালা থেকে চোখ ফিরিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাল কুসুম। আনমনা গলায় বলল, কিছু হয় নাই।
তাইলে যে বইয়া রইছস!
কী করুম?
মিস্ত্রিবউ খুবই অবাক হল! কস কী? গাঙ্গে যাবি না?
আদুরে শিশুর মতো মুখ করে কুসুম বলল, আইজ গাঙ্গে যাইতে ইচ্ছা করতাছে না মা।
কেন?
এমনেই।
শইল খারাপ হইছেনি?
এ কথায় কুসুম বেশ লজ্জা পেল। মাথা নিচু করে বলল, না।
তয়?
তয় আবার কী! কইলাম যে এমনেই!
এবার তীক্ষ্ণ চোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকাল মিস্ত্রিবউ। তাকিয়ে চমকে উঠল। মিষ্টি মুখখানি মেয়েটির কেমন খসখসে হয়ে আছে। কালো, শুকনো দেখাচ্ছে। চোখের কোল বেশ বসে গেছে, গাঢ় হয়ে কালি পড়েছে। চোখের পাপড়িতে কীরকম একটা ঘুম ঘুম ভাব। এমন হয়েছে কেন? রাতের বেলা কি ঘুমোয়নি কুসুম! একরাত না ঘুমিয়েই কি এমন চেহারা হয়ে গেছে মেয়েটির! নাকি বেশ কয়েক রাত ধরেই ঘুম হচ্ছে না তার! উতলা গলায় মিস্ত্রিবউ তারপর বলল, রাইতে ঘুমাস নাই?
কুসুম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। না, ঘুম আসে নাই।
কেন?
কী জানি!
তোর চোখ মুখ দেইখা তো মনে হয় খালি আইজ রাইতেই না অনেক রাইত ধইরাই ঘুমাস না তুই।
হ তিন চাইর রাইত ধইরা ঘুম আসে না আমার। রাইতভর জাইগা থাকি।
আমারে কস নাই কেন?
কুসুম শুকনো মুখে হাসল। কইলে কী করতা? দোয়াদরুদ পইড়া ঘুম পাড়াইতা আমারে?
এ কথা শুনে মিস্ত্রিবউ একটু রাগল। গম্ভীর গলায় বলল, আল্লাখোদার নাম লইয়া ঠাট্টা করিস না।
কুসুম আবার উদাস হল, আনমনা হল। আল্লাখোদার নাম লইয়া ঠাট্টা আমি করি না মা। আল্লারে আমি বহুত ডরাই। ধর্মরে বহুত ডরাই। এর লেইগাই……।
কুসুমের কথা শেষ হওয়ার আগেই মিস্ত্রিবউ বলল, ডরানই ভালো। আল্লাখোদারে ডরাইলে মানুষে আর খারাপ কাম করতে পারে না। ধর্মরে ডরাইলে ভালো থাকে মানুষ। একটু থামল মিস্ত্রিবউ। তারপর বলল, তুই কোনও চিন্তাভাবনা করসনি?
কুসুম ম্লান হাসল। কী চিন্তা করুম?
এই বয়সের মাইয়াগো কতপদের চিন্তা থাকে! পুরুষমানুষের চিন্তা, বিয়াশাদির চিন্তা।
কথাটা শুনে ভেতরে ভেতরে বেশ চমকাল কুসুম। কিন্তু মাকে তা বুঝতে দিল না। চোখ পাকিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। রুক্ষ্ম গলায় বলল, আকথা কইয়ো না।
মিস্ত্রিবউ সঙ্গে সঙ্গে বলল, তয় ঘুম আসে না কেন তোর?
কুসুম উঠে দাঁড়াল। আমার ঘুম লইয়া তোমার আর চিন্তা করণ লাগব না। তুমি তোমার কাম কর গিয়া। আমি গেলাম।
রান্নাচালার একপাশে রাখা আছে ভেঁসালের মতো দেখতে একখানা হাতজাল। জালের পাশে রাখা সরু গলার মাটির একখানা হাঁড়ি। দ্রুত হাতে জালটা নিল কুসুম, হাঁড়িটা নিল। দেখে খুশি হয়ে গেল মিস্ত্রিবউ। মায়াবি গলায় বলল, মাছ ধইরা আসনের পর মাথায় নাইড়কল তেল দিয়া দিমুনে মা। নাইড়কল তেলে মাথা ঠাণ্ডা হয়। তেল দিয়া ভালো কইরা মাথা আঁচড়াইয়া দিলে বহুত আরাম লাগব। ঘুম হইব। বাড়িত আইসাই ঘুমাইয়া থাকিস তুই। আইজ আর কোনও কাম করণ লাগব না।
কিন্তু মায়ের কথা তেমন পাত্তা দিল না কুসুম, মায়ের মুখের দিকে আর তাকালও না। তাকাল পাটাতন ঘরের দিকে। নামাজ শেষ করে কখন ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। খালেক মিস্ত্রি। মাথায় গোল সাদা টুপিটা এখনও আছে তার। বিড়বিড় করে দোয়াদরুদ পড়ছে আর খুবই মনোযোগ দিয়ে মিস্ত্রি কাজের যন্ত্রপাতি রাখার কাঠের বাক্সটা গোছাচ্ছে। অন্য কোনওদিকেই খেয়াল নেই তার।
এই দৃশ্য দেখে বেশ অবাক হল কুসুম। সে বেরুচ্ছে মাছ ধরতে, বেশ খানিকটা দেরি আজ হয়ে গেছে। তার ওপর মায়ের সঙ্গে হয়েছে ওসব কথা, সব ভুলে বলল, বাবায় আইজ কামে যাইতাছেনি? কোন বাড়ির কামে যায়?
স্বামীকে যন্ত্রপাতির বাক্স গোছাতে দেখে মিস্ত্রিবউও কম অবাক হয়নি। কুসুমের কথা শুনে তার দিকে মুখ ফেরাল না সে। দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল, কী জানি! আমারে তো কিছু কয় নাই।
মা মেয়ে দুজনেই তারপর দ্রুত হেঁটে খালেক মিস্ত্রির সামনে এসে দাঁড়াল। কুসুম কথা বলবে তার আগেই হাসিমুখে মেয়ের মুখের দিকে তাকাল খালেক মিস্ত্রি। কী গো মা অহনও যাও নাই?
কুসুম বলল, যাইতাছি।
তারপর একটু থেমে বলল, ও বাবা, কোন বাড়ির কামে যাও তুমি?
আমগ গেরামের কোনও বাড়িতে না মা। যামু নশঙ্কর। মণ্ডল বাড়িতে কাম আছে। মণ্ডল বাড়ির কথা শুনে বুকে কীরকম একটা ধাক্কা লাগল কুসুমের। মুখে উদাসীনতার ছায়া পড়ল। কেউ তা খেয়াল করল না।
মিস্ত্রি বলল, মণ্ডলগ তো বহুত বড় বাড়ি। আমগ এই বাড়ির চে অনেক বড়। আমগ বাড়িতে আমরা তিন শরিক মণ্ডল বাড়িতে পাঁচ শরিক। আমি যামু হরিপদর সীমানায়। বাপে পোলায় মাছের কারবার কইরা ভালো টেকার মালিক হইছে হরিপদ। দিঘিরপার বাজার থিকা শ্যালো নৌকায় কইরা মাছ চালান দেয় ঢাকার টাউনে। বাড়িতে দুইখান ঘর আছিল, বড় ঘরখান চৌচালা, চাইরদিকে ঢেউটিনের বেড়া। ছোট ঘরখানও চৌচালা তয় বেড়া টিনের না, মুলি বাঁশের। ওই বেড়া অহন বদলাইব। ঢেউটিনের বেড়া লাগাইব ঘরে। টিন কাঠ বেবাক আইন্না রাখছে। আইজ থিকা কাম করুম আমি। এই কাম শেষ হইলে আরেকখান বড় কাম আছে হরিপদর বাড়িতে। একমাত্র পোলা হইল পবন, পবনরে বিয়া করাইব। এর লেইগা একখান পাটাতন ঘর উঠাইব বাড়িতে। ওই ঘরটার কামও আমি করুম। এক দেড়টা মাস ভালোই কাম থাকব হাতে।
