ওখানে আর ফিরতে ইচ্ছে করে না। আরিফ আবার বসে পড়ে। বসে পকেট থেকে সিমেন্টের ইনডেন্টটা বের করে। তারপর কুচি কুচি করে হেঁড়ে কাগজটা। ছিঁড়ে হাওয়ায় অন্ধকারে ভাসিয়ে দেয়। কাগজগুলো উড়ে উড়ে আরিফের চারপাশে পড়ে। আরিফ খানিকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। তারপর সেই ছেঁড়াখোঁড়া কাগজগুলোর ওপর লুটিয়ে পড়ে কাঁদে। গুমরে গুমরে কাঁদে। অন্ধকারে আরিফের কান্না কেউ দেখে না।
মেয়েটির কোনও অপরাধ ছিল না
বহুকালের পুরনো যে কড়ুইগাছটি নদীতীর অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে আছে, তার মাথার ওপরকার আকাশ একটু একটু করে ফর্সা হচ্ছে। গাছের ঘন ডালপালা এবং ঝিরঝিরে পাতায় জমে আছে গাঢ় অন্ধকার, সেই অন্ধকারের ছায়া পড়েছে তলায়। ফলে গাছতলায় যে একজন মানুষ বসে আছে তার মুখটি স্পষ্ট দেখা যায় না। সাদা শার্ট পরে আছে বলে অন্ধকার গাছতলায় অস্পষ্টভাবে ফুটে আছে সে। অস্থির ভঙ্গিতে বিড়ি টানছে বলে টানে টানে বিড়ির আগুন জোনাকির মতো জ্বলছে।
খানিক আগে ফজরের আজান হচ্ছিল। সেই পবিত্র শব্দে ঘুমক্লান্তিতে নিঝুম হয়ে থাকা চারপাশের গ্রাম আড়মোড়া ভেঙেছে। ধর্মপ্রাণ নামাজি মানুষ বিছানা ছেড়েছে। গৃহস্থ বাড়ির খোয়াড়ে বসে গলা ছেড়ে ডাকতে শুরু করেছে ডাকাবুকো মোরগগুলো। কাছে কোথাও, কোনও বাড়ির গোহাল থেকে ভেসে আসছে একটি গাইগরুর হাম্বা ডাক। থেকে থেকে এমন করে ডাকছে সে, বোধহয় পাল খাওয়ার সময় হয়েছে। গ্রাম জুড়ে নিবিড় হয়ে থাকা ঝোঁপঝাড় এবং গাছপালার ঝুঝকো অন্ধকার থেকে গলা বাড়িয়ে আকাশ এবং খোলা মাঠপ্রান্তর কিংবা শস্যের উদার মাঠের দিকে তাকাচ্ছিল সদ্য ঘুমভাঙা পাখি। কলকাকলিতে মুখর হচ্ছিল, আলোর আঁচে বুঝে নিচ্ছিল রাত পোহাবার কত দেরি! ভোরবেলাকার একলা দোয়েল অন্ধকারের তোয়াক্কা না করে লাফ দিয়ে নেমেছে গৃহস্থ বাড়ির আঙিনায়। গভীর আনন্দে বিভোর হয়ে ডাকছে, টুকটুক টুকটুক করে লাফাচ্ছে। ডাকে ডাকে লেজ পিঠে উঠছে দোয়েলের, লেজ নামছে।
কড়ুই গাছটির গা ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া নদীর জলে ছিল আশ্চর্য রকমের শান্ত সমাহিত ভাব। এই নদীর নাম রজতরেখা। বর্ষায় জলে টইটম্বুর নদী, বান বন্যায় অশান্ত, একাকার। গ্রীষ্মে যেন বা চিরল খাল, জলের টানে জল চলে যায় কোন সুদূরে।
নদীর এপারে মানুষের বসতি, কত গ্রাম! দক্ষিণে দিঘিরপার বেসনাল কামাড়খাড়া, উত্তরে বানীখাড়া পুরা। পশ্চিমে আছে গ্রাম নশঙ্কর। পুবে, নদীর ওপার জুড়ে দীর্ঘ চরাভূমি, ধু ধু মাঠপ্রান্তর। বহুদূরে গ্রামবালিকার ভুরুরেখার মতো গাছপালার আভাস, মানুষের ঘরবাড়ি। এপারকার রাখাল বালক নদী সাঁতরে গরুর পাল নিয়ে যায় ওপারে চরাতে। এপারকার সব পাখি খাদ্যের খোঁজে উড়ে যায় ওপারে, দিন শেষের আলো ভেঙে ফিরে আসে।
রজতরেখার জলতলা ভরে আছে হাজারো মাছে। চিংড়ি বেলে, পাবদা পুঁটি, চাপিলা টাটকিনি, কাজলি শিলং, ঘারুয়া খল্লা, বাচা রিঠা কত রকমের যে মাছ! মাছের লোভে দূর দূরান্তের বিল কিংবা নদীর চর থেকে উড়ে আসে ধলীবক, কানীবক। শীতকালে আসে দূরদেশের পাখি। সারস, বেলেহাঁস, চখা। তাদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয় দেশগ্রামের পানকৌড়ি, কাদাখোঁচা। গৃহস্থের ছেড়ে যাওয়া বাড়ির ঝোঁপঝাড় কিংবা হিজলের ছায়া থেকে জলে এসে নামে ডাহুক ডাহুকী। পাখিদের সঙ্গে মানুষও নামে রজতরেখায়। মাছের লোভ পাখিদের চেয়ে মানুষেরও কম নয়। ভোরের আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নদীর দুপারে সাড়া পড়ে যায়। হাতজাল ঝাঁকিজাল টানাজাল, কত রকমের জাল যে নামে নদীর জলে! দুপুর অব্দি চলে জাল দিয়ে মাছ ধরা। দুপুরের পর ছোট ছোট ডিঙি নাওয়ে ভরে যায় নদীখানি। খাওয়াদাওয়া শেষ করে নৌকোয় বসে আয়েশি ভঙ্গিতে বড়শি ফেলে লোকে। টিমটিমে আলোর হারিকেন জ্বেলে সারারাত ধরেও বড়শি বায় কোনও কোনও গরিব জেলে! রাতভর বড়শি পেতে রাখে কেউ, চাই পেতে রাখে, ভোরবেলা এসে তোলে। নদীর ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে কত না মানুষ! এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষই মাছ কিনে খায় না। এক ফাঁকে বাড়ির কেউ এসে নদীতে নামলেই হল, দিনের মাছটা হয়ে যায়।
কুসুমদের সংসারের মাছটা ধরে কুসুম। ভোরের আলো ফুটে উঠবার আগেই ছোট্ট হাতজাল নিয়ে নদীতে এসে নামে সে। রোদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে যায়। ততক্ষণে হাতে ধরা মাটির হাঁড়ি মাছে প্রায় পরিপূর্ণ। দিনের মাছ জোগাড় হয়ে যায়। সেই কুসুম আজ এখনও কেন আসছে না? চারদিক তো ফর্সা হয়ে গেল! কভুইতলায় বসা মানুষটি অস্থির ভঙ্গিতে বিড়িতে শেষটান দিল, দিয়ে টোকা মেরে নদীর জলে ফেলে দিল। তারপর সড়কের ওপার, বেশ খানিকটা দূরে, গাছপালার আড়ালে ঢাকাপড়া কুসুমদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, আইজ তুমি এত দেরি করতাছ কেন কুসুম? আস, তাড়াতাড়ি আস।
কুসুম, ও কুসুম যাস না?
কুসুম বসে আছে রান্নাচালার সামনে। খানিক আগে বিছানা ছেড়েছে সে, ঘর থেকে বেরিয়ে এখানে এসে বসেছে। বসার ভঙ্গিতে আশ্চর্য এক উদাসীনতা ফুটে আছে মেয়েটির। হাত দুটো কোলের ওপর রেখে বড় ঘরের চালার দিকে তাকিয়ে আছে সে। বড় ঘরটির পেছনে দুটো জাম আর কয়েকটি সুপারি গাছ। একটা বাঁশঝাড় আছে খানিক দূরে। ঝাড় টপকে লম্বা মাথার একটি বাঁশ এসে হেলে পড়েছে জামগাছ দুটোর মাথা বরাবর। এই সব গাছপালায় এখন ভোরবেলার হাওয়া খেলা করছে। শন শন করে মনোমুগ্ধকর একখানা শব্দ হচ্ছে। হাওয়ার শব্দের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়েছে। পাখপাখালির ডাক।
