ঝুমঝুমি ফেরে না। অপেক্ষায় থেকে থেকে সাধুর বুকের ভেতরটা কেবলই কাঁপে। বটতলায় দাঁড়িয়ে সাধু তারপর চেঁচিয়ে ডাকে, ওলো ঝুমঝুমি গেলি কই?
বিরান হাটখোলায় সাধুর ডাক ভেসে যায়। কেউ সাড়া দেয় না।
সাধু আবার ডাকে। আবার। তারপর পুরোনো হাটখোলাটা ঘুরে সাধু যায় খেয়াঘাটের দিকে। খেয়া পার হয়ে মনের দুঃখে ঝুমঝুমি ওপারের জঙ্গলে যায়। একা বসে থাকে। সাধু জানে। ঝুমঝুমি কি সেই জঙ্গলে গেছে।
খেয়াঘাটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সাধু দেখে, বেদেবেদেনিরা সব নাও ছেড়ে ডাঙায় নেমেছে। জটলা পাকিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছে একজন। কী হয়েছে, সাধু কিছু বুঝতে পারে না। জটলার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কী অইছে গো, চিল্লাও ক্যান?
সাধুকে দেখে, মাথায় বাবরি চুল এক বেদে বলল, আমাদিগের একখানা নাও চুরি হইয়া গ্যাছে। বহরে ছিল এক মানুষ, রুস্তম তার নাম। একখানা পাও খোঁড়া, নাওখানা নিয়ে সে চম্পট দিয়েছে!
শুনে সাধুর বুকের ভেতরটা আবার কাঁপে। কেন যেন মনে হয় ঝুমঝুমিও বুঝি ঐ মানুষের সঙ্গে চম্পট দিয়েছে!
কথাটা ভেবে মুহূর্তে অবশ হয়ে যায় সাধুর শরীর। পা আটকে যায় মাটিতে, নড়াচড়ার শক্তি থাকে না।
বেদে-বেদেনিরা কোলাহল করে যায়। সাধুর কানে কোনও শব্দ ঢোকে না। সব্বোনাশ অইয়া গেছে। ঝুমঝুমি পালাইলে আমার তন্ত্র থাকব না। তুকতাক গেছে। না খাইয়া মরণ।
অবশ শরীরটা নিয়ে সাধু তবুও ঝুমঝুমিকে খোঁজে। খেয়ানৌকার মাঝিকে জিজ্ঞেস করে, আমাগো ঝুমঝুমিরে দেখছ?
মাঝি মাথা নাড়ে।
ওপারে নেমে মুদিমনোহারি দোকানের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে, ঝুমঝুমিরে দেখছনি তোমরা?
লোকেরা মাথা নাড়ে।
সাধু তবুও ঝুমঝুমিকে খোঁজে। ওপারের জঙ্গল তন্ন তন্ন করে খোঁজে। নেই, ঝুমঝুমি কোথাও নেই।
দুপুরবেলা সাধু আবার বেদের বহরটার কাছে ফিরে আসে। বহরটা তখন নির্জন। বেদে বেদেনিরা গেছে গাঁওয়ালে। একটা দুটো পোলাপান বেদে নাও থেকে ঝুপঝাঁপ লাফিয়ে পড়ছে খালের জলে। তাদের চিৎকার হল্লাচিল্লা। সাধুর কানে কিছু ঢোকে না। খালপাড়ার সাদা মাটিতে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদে সাধু। মেয়েমানুষের মতো কাঁদে। ঝুমঝুমি, ওলো ঝুমঝুমি, তুই কই চইলা গেলিরে, আমারে মাইরা থুইয়া গেলিরে।
তারপর দিনে দিনে গেঁজেল সাগরেদরাও সাধুকে ছেড়ে চলে যায়। দশ গেরামের লোক ব্যারামে আজাবে সাধুকে আর ডাকে না। হাটের দোকানিরা, পাইকারি মহাজনরা। সাধুকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে রাখে। চালডালটা দেয় না, আনাজপাতিটা দেয় না। লোকে টের পেয়ে গেছে সাধু সাচ্চা না। সাধুর সব বুজরুকি।
সাধু এখন কী করে!
দিনমান আখড়ায় বসে থাকে। বসে বসে গাঁজা টানে। রাতদুপুরে আখড়া ছেড়ে বেরোয়। কোনও কোনও রাতে চাঁদ থাকে আকাশে। জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যায় চরাচর। সেই জ্যোৎস্না ভেঙে সাধু যায় খালপাড়ে। বেদের বহরটা চলে গেছে। খালপাড়টা এখন শূন্য। নির্জনতায় হাহাকার করে। নিশিরাতে সাধু গিয়ে নির্জন খালপাড়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে। তারপর ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদে, রাতভর কাঁদে। ঝুমঝুমি নেই। সাধুর তন্ত্র। নষ্ট হয়ে গেছে। জগৎসংসারে কেউ জানে না, সাধু কার দুঃখে কাঁদে!
মানুষ কাঁদছে
হাতের তাস ছুঁড়ে ফেলে রহিম বলল, কাইলা, সাফল দে।
কালু সবগুলো তাস একত্র করে ফরফর করে সাফল দিল। হাতে সিগারেট ছিল, কায়দা করে ঠোঁটে গুঁজে দ্রুত নটা করে তাস বেটে দিল।
রহিম তিনটা তিনটা করে তাস তোলে। প্রথম তিনটা তুলে রহিম বেশ খুশি। চার পাঁচ ছয়, রান। পরের তিনটা তুলে দেখে দুটো গোলাম। সবশেষের তিনটা তোলার সময় রহিম মনে মনে একটু আল্লাহ খোদার নাম নেয়। এই দান না পেলে পকেট একদম ফাঁকা হয়ে যাবে। সকালবেলা নাস্তা খাওয়া হবে না, খেলাও হবে না। আর যদি আল্লাহ আল্লাহ করে পেয়ে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। চার হাত খেলছে। কিট্টি। একটাকা বোর্ড। একবার পেলেই তো তিন টাকা। তিন চারটা দান পেলে দিনের খরচা ওঠে যাবে। তার ওপর আজ আবার মঙ্গলবার। নটা দশটার দিকে গোডাউন খুলবে। কন্ট্রাকটররা ট্রাক নিয়ে, ঠেলাগাড়ি নিয়ে আসবে সিমেন্ট নিতে। বখশিশ তো পাঁচ টাকা-পাওয়া যাবেই। আর যদি আশরাফ মিয়ারে একটা পাট্টি ধরাইয়া দেওন যায়।
এসব ভাবতে ভাবতে শেষ তিনটা তাস খোলে রহিম। না কিছু হয়নি। নটা তাস একত্র করে তবুও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সাজানোর চেষ্টা করে রহিম। ওই। চার পাঁচ ছয় রান। তারপর গোলামের জোড়া। শেষবার, কিচ্ছু না। বিবি টপ।
তবুও খেলাটা চালিয়ে যায় রহিম।
প্রথমে তাস ফেলে নোয়ব। তিনের ট্রায়ো। দেখেই হয়ে যায় রহিমের। নিজের তাসগুলো সব ফেলে দেয়। বোর্ডে চারটে একটাকার নোট। একপলক টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে খালপাড় থেকে উড়ে আসে রহিম। নোয়ব, কালু আর লাটমিয়া খেলবে। সারাদিন। কারবারই এটা। এলাকার পুলিশের সঙ্গে লাইন করা আছে। ধরবে না। এসব। ভাবতে ভাবতে স্টেক দেয়া ইটের ফাঁকফোকর দিয়ে বটতলায় আসে রহিম।
বটতলায় একটা চায়ের দোকান। সামনে দুখান বেঞ্চ পাতা, ভেতরে চেয়ার টেবিল। লোকজন বাইরে বসে চা খায়, ভেতরে বসে খায়। বেশির ভাগই লেবার, রিকশাঅলা। কিছু আছে ট্রাক ড্রাইভার। কখনও দুচারজন কন্ট্রাকটরও বসে। চা খায়, সিগারেট খায়, তারপর চলে যায়।
