বিদ্যুদবেগে মাথা সরিয়ে আত্মরক্ষা করে ভীম তাঁর গদা চালালেন দুর্যোধনের দিকে এবং আশ্চর্য দক্ষতার সঙ্গে নিজের গদা দিয়ে সেই গদাকে প্রতিহত করে দুর্যোধন করলেন প্রতি-আক্রমণ!
ঠক, ঠক, ঠকাস, ঠাই প্রভৃতি ভীষণ শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল যাত্রার আসর। এতক্ষণ বাদে দর্শকরাও আত্মস্থ হয়ে তাঁদের নিজস্ব ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, অর্থাৎ ঘন ঘন হাততালি ও প্রশংসাসূচক ধ্বনিতে দুই যোদ্ধাকেই উৎসাহ দিতে শুরু করেছেন। আসরের অন্যান্য অভিনেতারা। কিন্তু ভীম ও দুর্যোধনের দ্বন্দ্বযুদ্ধে বিশেষ উৎসাহিত হতে পারেননি, বরং তারা লড়াই থামাতে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু দুই মহাবীরের ঘূর্ণিত গদার ঘন ঘন আস্ফালন তুচ্ছ করে কেউ এগিয়ে যেতে সাহস পাচ্ছিলেন না। হঠাৎ একজন (খুব সম্ভব শ্রীকৃষ্ণ, ঠিক মনে নেই) এগিয়ে এসে দুর্যোধনকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলেন এবং তৎক্ষণাৎ কুরুরাজের গদাঘাতে ঠিকরে ধরাশয্যা অবলম্বন করলেন।
নারায়ণের সাক্ষাৎ অবতার শ্রীকৃষ্ণকে ধরাশায়ী করে দুর্যোধন উৎসাহিত হয়ে উঠলেন, পরক্ষণেই তার হাতের গদা প্রচণ্ড বেগে এসে পড়ল ভীমসেনের দক্ষিণ ঊরুদেশের উপর বাপরে, বলে ভীম বসে পড়লেন দুই হাতে উরু চেপে ধরে!
ঘন ঘন হাততালিতে যাত্রার আসর সরগরম! যদিও মূল মহাভারতে কোথাও দুর্যোধনের গদাঘাতে শ্রীকৃষ্ণের পতন বা ভীমসেনের ঊরুভঙ্গ প্রভৃতি বিপর্যয়ের কথা লেখা নেই, কিন্তু সমবেত দর্শকমণ্ডলী মহাভারতের এই নতুন পালা উপভোগ করছিল অতিশয় উৎসাহের সঙ্গে। দুর্যোধন তখনও আস্ফালন করছিলেন, হতভাগা, পাজি, ইস্টুপিড! তোকে এক-শোবার সাবধান করে দিয়েছি, তবু কথা শুনলি না? এখন বোঝ ঠেলা–কেমন লাগে?
হঠাৎ কুরুপক্ষের এক যোদ্ধা বিশ্বাসঘাতকতা করল। বিকর্ণের ভূমিকায় যে লোকটি অভিনয় করছিল সে হঠাৎ দুর্যোধনের কোমর জড়িয়ে ধরল এবং সচকিত দুর্যোধন নিজেকে মুক্ত করে নেওয়ার আগেই নিতান্ত কাপুরুষের মতো পাণ্ডবপক্ষের চার মহাবীর অর্থাৎ যুধিষ্ঠির, অর্জুন, নকুল ও সহদেব দুর্যোধনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে কাবু করে গদাটি তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিল! ভীমসেন অবশ্য এই অসম যুদ্ধে যোগদান করেননি; তার কারণ অবশ্য নীতিবোধ নয়, তিনি তখনও ঊরু চেপে ধরে কাতরোক্তি করছিলেন, উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তার ছিল না!
সহোদর ভ্রাতার বিশ্বাসঘাতকতা এবং বিপক্ষের যোদ্ধাদের কাপুরুষের মতো হীন ব্যবহারে ক্ষুণ্ণ হয়ে দুর্যোধন যেসব বাক্যবাণ প্রয়োগ করতে শুরু করলেন সেগুলো কুরু অথবা পাণ্ডবপক্ষের কোনো মানুষের পক্ষেই আদৌ সম্মানজনক নয়! দর্শকরা কিন্তু ততক্ষণে দুর্যোধনের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে গেছে, ঘন ঘন হাততালি দিয়ে তারা কুরুরাজের প্রতি তাদের সহানুভূতি ও আনুগত্য প্রকাশ করছে বারংবার!
এইবার আসরে প্রবেশ করলেন যাত্রাদলের অধিকারী, দুর্যোধনের মুখের ওপর তর্জনী আস্ফালন করে তিনি বললেন, ওরে রাসকেল! তুই কোন আক্কেলে ভীমকে গদার বাড়ি মারলি? গদাযুদ্ধ তো এখন হওয়ার কথা নয়, গদাযুদ্ধ হবে শেষ দৃশ্যে–সব ভুলে গেলি? তা ছাড়া দুর্যোধনের গদাঘাতে ভীমের ঊরুভঙ্গ কে কবে শুনেছে রে ছুঁচো?
দুর্যোধন বললেন, ও আমার পা মাড়িয়ে দিল কেন? আমি বার বার সাবধান করে দিয়েছিলাম, বলেছিলাম আমার পায়ে কড়া আছে; কড়াতে যেন না লাগে। হতভাগা ভোদা বক্তিমে করতে করতে আমার পায়ের কড়ার উপরই পা চাপিয়ে দিল!
অধিকারী বললেন, তাই বলে তুই মারবি? মহাভারতের কোন অধ্যায়ে দুর্যোধনের পায়ে কড়ার কথা আছে শুনি? তুই পায়ের কড়া গজাতে দিলি কেন? কড়া কেটে ফেললি না কেন? উল্লুক! বোম্বেটে! শয়তান!
বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে অধিকারী দুর্যোধনের গণ্ডদেশে করলেন প্রচণ্ড চপেটাঘাত!
দুর্যোধন তখন চার পাণ্ডবের বাহুপাশে বন্দি, তবু নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন এবং তার যে গদাটি বিশ্বাসঘাতক বিকর্ণ সম্প্রতি হস্তগত করেছিল সেই গদাটির দিকে ঘন ঘন দৃষ্টিপাত করতে লাগলেন সতৃষ্ণ নয়নে!
দর্শকরা তখন প্রবল উৎসাহে দুর্যোধনকে সমর্থন জানাচ্ছে। একটি অল্পবয়সি ছেলে তারস্বরে ঘোষণা করল যে, একটিবার গদা হাতে পেলে মহাবীর দুর্যোধন যে কুরুপাণ্ডবের সম্মিলিত বাহিনীকে বিধ্বস্ত করে দেবেন এ-বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
কিন্তু অধিকারী ও অভিনেতারা সপ্তরথীবেষ্টিত দুর্যোধনের লড়াই দেখতে রাজি ছিলেন না, দর্শকদের একান্ত অনুরোধ সত্ত্বেও কুরুরাজকে তাঁর গদা ফেরত দেওয়া হল না, যাত্রাও গেল ভেঙে।
পূর্বোক্ত ঘটনার বৎসর কেটে গেছে। আমি তখন কলকাতার এক চিত্র-পরিবেশক অর্থাৎ ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটার অফিসে কাজ করি। অফিসের মালিক একদিন জানালেন যে উক্ত অফিসে তিনি একটি লোককে নিয়োগ করতে চান। লোকটি তার পরিচিত এক ভদ্রলোকের সুপারিশ নিয়ে এসেছিল, তাই ইচ্ছে না-থাকলেও লোকটিকে চাকরি দিতেই হবে। তবে কাজের অনুপযুক্ত বলে প্রমাণিত হলে কয়েক মাস পরে তাকে ছাঁটাই করে দেওয়া যেতে পারে। ওই লোকটিকে আমার সঙ্গেই দেখা করার নির্দেশ দিয়েছেন মালিক, আমি যেন তাকে কাজ বুঝিয়ে দিই।
যথা আজ্ঞা। মালিক যেদিন আমাকে সব কথা জানালেন তার পরের দিনই লোকটির আসার কথা। আমার অফিসে দশটার মধ্যে হাজিরা না-দিলেও চলে, অতএব নির্দিষ্ট দিনে বেরিয়ে পড়লাম বারোটার পর।
