কিন্তু না, ঘরের মধ্যে লণ্ঠনের আলোকশিখা নিভে যাওয়ার আগেই আকাশ ও পৃথিবীর অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে উঠল চিরন্তন সেই রক্তিম আলোর ধারা…
জয়! দিনমণির জয়! এল নতুন প্রভাত!
দূর বনপথ থেকে ভেসে এল অনেকগুলি মানুষের কণ্ঠস্বর।
পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলুম, সিংহ সচমকে ফিরে দাঁড়াল এবং নিঃশব্দে আত্মগোপন করল জঙ্গলের মধ্যে।
একটু পরেই আমার লোকজন যখন ঘরের ভিতর এল, তখন আমি কঁপছি। ঘর্মাক্ত সারা দেহ। দারুণ আতঙ্কে ও উদবেগ অবসাদে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, তাদের কোনো কথাই বলতে পারলুম না। পরে সব শুনে তারা বলল সাহেব, এযাত্রা বড়ো বাঁচা বেঁচে গেছ! আর থেকো না এখানে। ওকে মারবারও চেষ্টা কোরো না। তাহলে নিজের জীবনই বিপন্ন হবে।
দিনের বেলা একটু ঘুমিয়ে নেবার চেষ্টা করলুম, কিন্তু অসম্ভব! ওই ঘরের ভিতর ঘুমানো অসম্ভব। চোখ বুজলেই মনে হচ্ছিল, এই বুঝি হিংস্র ভয়াল শ্বাপদ এখনই হানা দেবে শরীরী দুঃস্বপ্নের মতো। ভালোভাবেই জানতুম, দিনের বেলা ভয় পাওয়ার কোনোই কারণ নেই। কিন্তু মন মানতে চায় না। তুমি হয়তো বলবে, এখানকার বাসিন্দাদের কুসংস্কার আমাকেও আচ্ছন্ন করেছে। হতে পারে। সে ভয়ংকর রাতের অভিজ্ঞতা তোমার হয়নি, তাই বলতে পার ও-কথা।
যাই হোক, প্রকাশ্য দিবালোকেও যেখানে আমি আতঙ্কে ঘুমাতে পারিনি, সেখানে রাত কাটানো কি সম্ভব? অতএব তোমাকে ওই চিঠি লিখে রেখে এখানে পালিয়ে এসেছি.. তুমি আমার এখন সিংহ-শিকারে আগ্রহ প্রকাশ করলে আমি ভীষণ অসন্তুষ্ট হব…
মনে রেখ বন্ধু–আমরা খনিজ দ্রব্যের বিশেষজ্ঞ, শিকারি নই বুঝেছ?
হ্যাঁ, মলিনাক্সের কথা বুঝেছিলেন হাম্বার। জাঙ্গা ছেড়ে সেইদিনই অন্যত্র যাত্রা করেছিলেন দুই বন্ধু।
[ভাদ্র, ১৩৭৭]
দুর্যোধনের গদা
কমলের পরিচয় পেয়েছিলাম অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে। পরিচয়টা অবশ্য একতরফা; যে-রাতে আমি তার প্রতিভার পরিচয় পেয়েছিলাম, সেই রাতে আমি ছিলাম তার সম্পূর্ণ অপরিচিত, এমনকী সে আমায় তখন দেখতেও পায়নি।
ব্যাপারটা খুলেই বলছি।
যে-সময়ের কথা বলছি, তখন কলকাতার বিভিন্ন স্থানে দোল-দুর্গোৎসব প্রভৃতি উপলক্ষে প্রায়ই যাত্রাগানের আসর বসত এবং কোথাও যাত্রার আসর বসার খবর পেলেই আমি যথাস্থানে হাজির হতাম প্রবল উৎসাহের সঙ্গে। এইরকম এক যাত্রার আসরেই কমলের দেখা পেয়েছিলাম।
প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বৎসর আগেকার ঘটনা। দক্ষিণ কলকাতার এক যাত্রার আসরে গিয়ে দেখি প্রচুর দর্শকের সমাগমে আসর বেশ জমজমাট। আমার একটু দেরি হয়েছিল, গিয়ে দেখি যাত্রা শুরু হয়েছে। বহুদিন আগেকার কথা, পালার নামটা ঠিক মনে নেই, তবে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ বা দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ ধরনের কোনো ব্যাপার হবে।
আগেই বলেছি আমার যথাস্থানে পৌঁছাতে একটু দেরি হয়েছিল, গিয়ে দেখি যাত্রা শুরু হয়ে গেছে–কুরুরাজ দুর্যোধন গদা হাতে এক ভয়ংকর জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিচ্ছেন। আশেপাশে তার। স্বপক্ষের এবং বিপক্ষের রথী-মহারথীরা সকলেই উপস্থিত, আচম্বিতে রঙ্গমঞ্চ কম্পিত করে গদাহস্তে ভীমের প্রবেশ!
উক্ত গদার আকৃতি ভীমসেনের চাইতেও বেশি দ্রষ্টব্য ছিল, তাই লক্ষ্যবস্তুর চাইতেও উপলক্ষ্য, লোকের বিশেষ করে ছেলে-ছোকরাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
ভীমসেন আসরে প্রবেশ করেই সগর্জনে এক বক্তৃতা দিলেন। দুর্যোধনের চাইতে তার বক্তৃতা আরও জোরালো হয়েছিল। ভাষাটা ভালো মনে নেই, তবে গম্ভীর গর্জিত কণ্ঠের পামর, নরাধম প্রভৃতি চোখা চোখা বিশেষণগুলি কিছু কিছু মনে পড়ছে–
তারপরই এক অভাবিত ঘটনা!
ভীমসেন গদা আস্ফালন করে এদিক-ওদিক পদচালনা করছেন, সঙ্গেসঙ্গে যাত্রার আসর কাঁপয়ে উচ্চারিত হচ্ছে ভীমকণ্ঠের বাণী।
অকস্মাৎ এক দারুণ চিৎকারে ভীমসেনকে এবং সমগ্র আসরকে চমকে দিয়ে দুর্যোধন এক প্রচণ্ড লাফ মারলেন। মানুষ যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে এত উঁচু লাফ মারতে পারে তা জানতাম না! তবে যে সে মানুষ তো নয়, স্বয়ং দুর্যোধন দ্বাপর যুগে মহাভারতের মহাকায় মানুষদের চমকে দিয়েছিলেন, তারই এক প্রতিনিধি কলিযুগের কলিকাতায় মানবদেহের কয়েকটি তুচ্ছ নমুনাকে চমকে দেবেন তাতে আর আশ্চর্য হওয়ার কী আছে?
কিন্তু লম্ফ প্রদান করে ভূতলে অবতীর্ণ হয়ে তিনি যা করলেন তাতে স্বয়ং দুর্যোধনও বোধ হয় কিঞ্চিৎ ভড়কে যেতেন। মহাভারতের দুর্যোধন অস্ত্রচালনা ও বাগযুদ্ধে বিশেষ পটু ছিলেন বটে, কিন্তু নৃত্যকলায় তার পারদর্শিতার কথা বেদব্যাস কোথাও উল্লেখ করেননি কিন্তু যাত্রার দুর্যোধন আচম্বিতে এক পা শূন্যে তুলে এমন এক অদ্ভুত নৃত্য শুরু করে দিলেন যে, পেশাদার নর্তকীও সেই দৃশ্য দেখলে কুরুরাজের ভারসাম্য রক্ষার প্রশংসা না-করে থাকতে পারত না।
এই অভূতপূর্ব এবং অভাবনীয় দৃশ্যে আমরা সকলেই ভড়কে গিয়েছিলাম, এমনকী স্বয়ং ভীমসেনও হয়ে পড়েছিলেন স্তম্ভিত!
হঠাৎ নাচ থামিয়ে দুর্যোধন ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে ভীমের দিকে কটাক্ষ করলেন, ইস্টুপিড! পাষণ্ড! বর্বর! নরাধম! তোকে যা বারণ করেছিলাম তাই করলি? তবে এই দেখ
সঙ্গেসঙ্গে দুর্যোধনের হাতের গদা ছুটে এল ভীমের মস্তক লক্ষ করে!
এমন অতর্কিতে আক্রান্ত হলে অনেক বীরপুরুষই ধরাশায়ী হত, কিন্তু দুর্যোধনের প্রতিপক্ষও নিতান্ত সাধারণ মানুষ নন–স্বয়ং ভীমসেন।
