আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন ব্রিটিশ-অধিকৃত কলকাতা শহরে এত লোক সমাগম হয়নি। দুপুর বেলা ট্রামে-বাসে বিশেষ ভিড় হত না, তাই যাত্রীদের আকর্ষণ করার জন্য ট্রাম কোম্পানি মিড ডে ফেয়ার নামক অল্প মূল্যে টিকিট দেবার একটি রীতি প্রচলিত করেছিল। দুপুর বারোটা থেকে চারটে পর্যন্ত ট্রামের প্রথম শ্রেণিতে ছ-পয়সার বদলে তিন পয়সা এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে চার পয়সার বদলে দু-পয়সার টিকিট কিনে যাত্রীরা ভ্রমণের অধিকার অর্জন করতে পারত।
আগেই বলেছি আমার অফিসে হাজিরা দেওয়ার সময় সম্বন্ধে বিশেষ কড়াকড়ি ছিল না, খুব কাজ না-পড়লে অধিকাংশ সময়েই অফিস যাওয়ার সময়ে আমরা মিড ডে ফেয়ার নামক প্রচলিত রীতির সুযোগ গ্রহণ করতাম।
নির্দিষ্ট দিনে বারোটার ট্রামে উঠে আমি একটি তিন পয়সার টিকিট কিনে ফেললাম। যাত্রীর সংখ্যা ছিল খুবই কম, কাজেই কনডাক্টর যখন একটি যাত্রীর সামনে গিয়ে বার বার টিকিট চাইতে লাগল তখন নিতান্ত স্বাভাবিকভাবেই আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল তার দিকে।
যাত্রীটি কিন্তু কনডাক্টরের কথায় প্রথমে কর্ণপাত করলেন না। একটি খবরের কাগজ খুলে ধরে এমনভাবে তিনি মগ্ন হয়ে গেছেন যে মনে হয় কাগজের ছাপার অক্ষরের বাইরে কোনো কিছুই তিনি দেখতে বা শুনতে চান না।
খবরের কাগজের প্রতি যাত্রীটির গভীর অনুরাগ ট্রাম-কনডাক্টরের মনে বিরক্তিকর সঞ্চার করল–
ও মশাই, টিকিট নিয়ে তারপর কাগজ পড়ুন।
ভদ্রলোক খবরের কাগজ থেকে চোখ না-তুলেই বললেন, টিকিট হয়ে গেছে।
কনডাক্টর বলল, কোথায়? দেখি?
ভদ্রলোক এইবার কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে নিজের পায়ের দিকে ইঙ্গিত করলেন, ওই যে!
সবিস্ময়ে দেখলাম ভদ্রলোকের চটিপরা পায়ের দুই আঙুলের ফাঁকে ধরা রয়েছে একটি ট্রামের টিকিট!
কনডাক্টর ক্রুদ্ধ কণ্ঠে জানাল, টিকিটটা হাতে নিয়ে দেখাতে হবে।
ভদ্রলোক শান্তভাবে জানালেন, ট্রাম কোম্পানির আইন অনুসারে টিকিট কিনতে এবং কনডাক্টর দেখতে চাইলে সেই টিকিট তাকে দেখাতে তিনি বাধ্য; কিন্তু উক্ত টিকিট হাতে করে দেখাতে হবে কি পায়ে করে দেখাতে হবে সে-বিষয়ে ট্রাম কোম্পানির কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ নেই!
কিছুক্ষণ তর্কবিতর্কের পর কনডাক্টর ভদ্রলোকের সামনে থেকে সরে গেল। ভদ্রলোকও সেই টিকিটটা পায়ের আঙুলে ধরে রেখেই আবার খবরের কাগজে মনোনিবেশ করলেন।
অফিসে যাওয়ার পথে একটা দোকানে আমার একটু কাজ ছিল। ওই দোকানে নেমে কাজটা সেরে নিলাম, তারপর অফিসে ঢুকলাম। বেশি দেরি হয়নি, দোকানের থেকে আমার অফিস মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। অফিসে গিয়ে নিজের আসন গ্রহণ করতেই বেয়ারা এসে জানাল এক ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে চান, তিনি নাকি মিনিট পাঁচেক ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। কার্ডের উপর লেখা নামটা পড়লাম কমল বিশ্বাস। মালিক যে লোকটিকে সাময়িকভাবে নিয়োগ করার কথা বলেছিলেন তার নামও কমল বিশ্বাস–অতএব বেয়ারাকে ডেকে ভদ্রলোককে নিয়ে আসতে বললাম।
যে-মানুষটি আমার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন তাঁকে দেখে চমকে উঠলাম! আরে! এই ভদ্রলোকই তো ট্রামের ভিতর একটু আগে এক অভিনব দৃশ্যের অবতারণা করেছিলেন! একটু তাকিয়ে থাকতেই ভদ্রলোককে বেশ পরিচিত মনে হল, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলাম না তাকে কোথায় দেখেছি।
ভদ্রলোক কাচুমাচু মুখ করে বললেন, আমার নাম স্যার কমল বিশ্বাস। আমাকে বাবু বলেছিলেন যে–
বাধা দিয়ে বললাম, ঠিক আছে। আমার নাম মহীতোষ রায়। আমাকে স্যার বলার দরকার নেই। মালিক আপনার কথা বলে গেছেন, আসুন আপনাকে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছি।
ভদ্রলোককে তার টেবিলে বসিয়ে আমি হঠাৎ বলে ফেললাম, আচ্ছা কমলবাবু, আপনি পা দিয়ে টিকিট দেখাচ্ছিলেন কেন? হাতে করে দেখালেই পারতেন। কনডাক্টরও মানুষ, তাকে ওভাবে অপমান করা আপনার উচিত হয়নি।
কমলবাবু চমকে উঠলেন, ও! আপনি ওই ট্রামেই ছিলেন!
একটু থেমে মুখ নীচু করে তিনি বললেন, বিশ্বাস করুন, অপমান করার ইচ্ছে আমার ছিল না। হাতে নিয়ে টিকিট দেখাতে গেলেই তিন পয়সা গচ্চা দিতে হত, তাই
তার মানে?
আজ্ঞে গড়িয়াহাটা থেকে উঠেছিলাম। হঠাৎ এক বন্ধুর পাল্লায় পড়ে রাসবিহারীর মোড়ে নামতে হল। সেই ট্রামের টিকিটটা সঙ্গে ছিল। অন্য একটা ট্রামে উঠে ওই টিকিটটা পায়ের আঙুলের ফাঁকে চেপে ধরে কাগজ পড়তে শুরু করলাম। জানতাম, কনডাক্টর পায়ে হাত দিয়ে টিকিট দেখবে না, তাই
অবাক হয়ে গেলাম! লোকটা তো দারুণ ধূর্ত! আর ঠিক সেই মুহূর্তে বিদ্যুৎচমকের মতো আর একটি দৃশ্য ভেসে উঠল আমার মানসপটে এতক্ষণে মনে পড়েছে ভদ্রলোককে কোথায় দেখেছি!
হেসে বললাম, চাকরি করতে এলেন কেন? যাত্রাদলে অভিনয় করতে ভালো লাগল না?
কমলবাবু সবিস্ময়ে বললেন, আপনি আমার অভিনয় দেখেছেন বুঝি?
মাথা নেড়ে জানালাম, হ্যাঁ।
তারপর সেই ভীম ও দুর্যোধনের দ্বৈরথঘটিত যাত্রাগানের উল্লেখ করতেও ভুললাম না। হেঁ, হেঁ, হেঁ, কমলবাবু লজ্জিত হলেন, পায়ে একটা কড়া ছিল স্যার। ওটাতে লাগলেই আমার মাথা খারাপ হয়ে যেত। ভোদা–মানে, যে ভীম সেজেছিল–তাকে বার বার সাবধান করে দিয়েছিলাম, তবু হতভাগা ওই কড়ার ওপর এমনভাবে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিল যে রাগে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম…
