উলটো দিকের ফাঁকটার কাছাকাছি এসেই তারা থমকে দাঁড়াল। জানোয়ারের সহজাত সংস্কারের বশেই তারা বুঝেছিল, আলোকিত ঘরের বাইরে অন্ধকারের মধ্যে বিপদের সম্ভাবনা আছে।
কুকুর দুটো ভালোই করেছিল।
মুহূর্ত পরেই বিশ্রাম-আগারের বাইরে ধাবমান পদধ্বনি জানিয়ে দিল যে, পশুরাজ উলটো দিকের ফঁক লক্ষ করে ঘুরে আসছে।
আমি এবার শটগান হাতে নিলুম। এ ধরনের বন্দুক সিংহ-শিকারের উপযুক্ত নয় সন্দেহ নেই, কিন্তু রাইফেল না-থাকায় বাধ্য হয়ে শটগানটাকেই বাগিয়ে ধরলুম। মনে করলুম, সিংহ যদি ঘরের ভিতর ঢোকে, তবে এই শটগান দিয়েই তাকে গুলি করব। মারা না-পড়লেও গুলিতে সে আহত হবে নিশ্চয়ই, তারপর যা থাকে বরাতে।
মোট কথা, বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করতে আমি রাজি নই…
মুখের সামনে খাদ্য আছে, কিন্তু ধরার উপায় নেই! ভিতরে ঢুকতেও বোধ হয় ভরসা হচ্ছে না, কারণ ঘরে আলো জ্বলছে। তাই অস্থির হয়ে উঠল পশুরাজ।
বুঝতে পারছি, তার প্রথম লক্ষ্য চতুষ্পদ সারমেয় দুটি। তার পরে বোধ হয় দ্বিপদ জীব। হিসাবে আমার পালা।
অবশেষে কুকুর দুটোকে ধরার জন্য পশুরাজ এক চমৎকার ফন্দি আঁটল। সে একদিকের পর্দা-ঝোলানো ফাঁকের পিছনে এসে গর্জন করেই তাড়াতাড়ি উলটো দিকের ফাঁকটার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার আশা, কুকুর দুটো যদি ভয় পেয়ে উলটো দিকের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়, তাহলেই সে তাদের ধরে ফেলতে পারবে।
কুকুর দুটো কিন্তু গর্জন শুনলেই ভয় পেয়ে যেদিক থেকে আওয়াজ আসছে, তার বিপরীত দিকের ফঁকটা লক্ষ করে ছুটে যাচ্ছে বটে, কিন্তু পর্দার বাইরে একবারও পদার্পণ করছে না।
একটু পরেই লক্ষ করলুম, দারুণ আতঙ্কে তারা ক্রমেই দিশাহারা হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণের মদ্যেই তাদের বুদ্ধিভ্রংশ ঘটবে এবং তখনই কুটিরের বাইরে ছুটে পালাতে গিয়ে পড়বে সিংহের কবলে।
নাঃ! আমার পোষা জন্তু দুটোকে এভাবে মরতে দিতে পারি না।
কুকুর দুটোকে টেনে এনে আমি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেললুম। তারপর হাতের বন্দুক বাগিয়ে ধরে ফাঁক দুটোকে লক্ষ করতে লাগলুম নিবিষ্ট চিত্তে…
রাতের আকাশে অন্ধকার মেঘের আবরণ সরিয়ে উঁকি দিল রুপোলি চাঁদ। জ্যোৎস্নার আলোতে বাঁশের তৈরি পর্দার বুনোনির ফাঁক দিয়ে সিংহের অস্পষ্ট মূর্তি আমার দৃষ্টিগোচর হল–প্রকাণ্ড জানোয়ার!
–একবার মনে হল দিই গুলি চালিয়ে, পরক্ষণে ফিরে এল শুভবুদ্ধি। জন্তুটা এখন প্রায় পনেরো গজ দূরে আছে, এখান থেকে শটগানের গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করা যাবে না। কিন্তু আহত হলে সিংহ নিশ্চয়ই খেপে গিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে আক্রমণ করবে।
তখন অবস্থাটা কী দাঁড়াবে?
নাঃ, গুলি ছোঁড়া হবে আত্মহত্যারই নামান্তর। নিজেকে আমি সংবরণ করলুম…
গভীর অন্ধকার রাত্রি। ঘরের বাইরে অপেক্ষা করছে সিংহ। মাঝে মাঝে গম্ভীর গর্জনে বিরক্তি প্রকাশ করছে। আর একটা ঠুনকো বন্দুক হাতে ঘরের ভিতর আমি বসে আছি মৃত্যুর মুখোমুখি।
রাত্রি গড়িয়ে চলে…
হঠাৎ লক্ষ করলুম, একটা লণ্ঠন ধূম উদগিরণ করছে! আলোটাও যেন কম!
তিন-তিনটে লণ্ঠনের আলোর জন্যই সিংহভিতরে আসতে সাহস পাচ্ছেনা। কিন্তু আলোর তেজ কমে গেলে আর তাকে ঠেকানো যাবেনা। জীবন্ত কুকুর-মাংসই তাকে আকৃষ্ট করেছে সন্দেহ নেই, কিন্তু ঘরের ভিতর সে একবার প্রবেশ করলে আমারও রেহাই পাবার কোনো কারণ নেই।
এইসব কথা ভাবছি, হঠাৎ খেয়াল হল, পশুরাজের বজ্রকণ্ঠ নীরব হয়ে পড়েছে। কী ব্যাপার? ও কি চলে গেছে?…
আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আমাকে সাবধান করে দিল–না, যায়নি, কাছেই আছে মূর্তিমান মৃত্যু!
আছে–আছে–আছে…
একটা অস্পষ্ট শব্দ কানে এল। বুঝলুম, সশব্দে ঘ্রাণ গ্রহণ করছে পশুরাজ। সচমকে দেখলুম, যেদিক থেকে শব্দ ভেসে এল, সেদিকের বাঁশের পর্দাটা যেন হাওয়ার ধাক্কায় একটু দুলছে।
পরক্ষণেই বংশ-নির্মিত যবনিকার তলদেশ দিয়ে আলোকিত কুটিরের ভিতর প্রবেশ করল ভয়ংকর ভয়ংকর মস্ত বড়ো এক থাবা!
থাবা আরও একটু এগিয়ে এল, কোষমুক্ত কিরীচের মতো মাংসল খাপ খুলে থাবার ভিতর থেকে আত্মপ্রকাশ করল বাঁকা বাঁকা ধারালো নখের সারি!
ফাঁকের পাশে দেয়ালের গায়ে সনখর থাবাটা ঘুরে ঘুরে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে!
আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা লণ্ঠন তার কর্তব্য করতে রাজি হল না। দপ করে নিভে গেল আলোটা। শটগানের ট্রিগারে সরে এল আমার আঙুল। ইচ্ছে হল, গুলি চালিয়ে ওই থাবাটাকে উড়িয়ে দিই। অনেক কষ্টে আত্মসংবরণ করলুম।
কুকুর দুটো তখন ছটফট করছে আর চেঁচাচ্ছে পাগলের মতো এই বুঝি গলার বকলস ছিঁড়ে তারা বেরিয়ে যায়!
একটু পরে আবার নিভে গেল আর একটা লণ্ঠন। আবার ঘর্মাক্ত দেহ থেকে জলের স্রোত বইছে।
রাত্রির প্রহর কাটে…
থাবাটা এক সময় সরে গেল ঘরের ভিতর থেকে অন্ধকারের গর্ভে। সিংহের তীব্র হুংকার-ধ্বনি আর শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ অবরুদ্ধ কণ্ঠের চাপা গর্জনে প্রকাশ পেল ক্ষুধার্ত শ্বাপদের ক্ষোভ এবং নৈরাশ্য!
কিন্তু কেন? অবাক হয়ে মনে মনে কারণ খুঁজবার চেষ্টা করছি, হঠাৎ পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে নজর পড়ল। আর সঙ্গেসঙ্গে আমার বুকে সাহস ফিরে এল, আতঙ্কের পরিবর্তে অনুভব করলুম বাঁচার নতুন ইঙ্গিত–এযাত্রা বেঁচে গেলুম বোধ হয়… একটা মাত্র লণ্ঠন তখন আলো দিচ্ছে। কিন্তু তার অবস্থাও শোচনীয় যেকোনো মুহূর্তে কম্পিত আলোকশিখাঁটি অন্ধকারের গ্রাসে লুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
