নদীর ধারে লম্বা লম্বা ঘাস ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছেন মলিনাক্স, হঠাৎ বিপরীত দিকে নদীর পাড়ের ওপর একটি সচল বস্তু তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
সিংহ!
হ্যাঁ, সিংহই বটে!
প্রায় চল্লিশ ফিট দূরে গুঁড়ি মেরে বসে আছে একটা মস্ত সিংহ! তার জ্বলন্ত চক্ষুর হিংস্র দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে মলিনাক্সের দিকে এবং সুদীর্ঘ লাঙ্গুলটি পাক খেয়ে দুলে দুলে উঠছে দারুণ আক্রোশে।
পরক্ষণে সিংহের রক্তিম মুখগহ্বরের ভিতর থেকে আত্মপ্রকাশ করল তীক্ষ্ণ দন্তের সারি! মলিনাক্সের সর্বাঙ্গে ঘামে নেয়ে উঠল।
তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটু নড়লেই সিংহ আক্রমণ করতে পারে। তার বন্দুকটাও হাতে নেই, অনেক পিছনে একটা চাকর সেটা বহন করে আনছে এবং কুকুর দুটিও রয়েছে প্রায় এক-শো গজ দূরে।
এই জীবন-মরণ সংকটে মলিনাক্স কী করবেন, স্থির করতে পারছেন না, এমন সময় আশ্চর্য ব্যাপার! সিংহটা হঠাৎ এক লাফ মেরে নদীর নিকটস্থ ঘন ঘাসঝোপের জঙ্গলের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল। অত্যন্ত অবাক হলেন মলিনাক্স।
আমি ভাবতেই পারিনি যে, ওখানে একটা সিংহ থাকতে পারে আর সে এমনিভাবে পালিয়ে যাবে, বন্ধুকে উদ্দেশ করে বললেন মলিনাক্স, জন্তুটার গায়ের রং নদীর তীরের বালির সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে, আমি সিংহের অস্তিত্ব বুঝতেই পারিনি। শুধু লেজটা নড়ছিল বলেই তার দিকে আমার দৃষ্টি পড়েছিল। জন্তুটার কেশর নেই। প্রথমে ভেবেছিলুম ওটা সিংহী। কিন্তু ভালোভাবে নজর করে দেখলুম, নাঃ, সিংহই বটে! সঙ্গেসঙ্গে মনে পড়ল, নাইজিরিয়ার এসব অঞ্চলে সিংহদের মাথায় কেশর থাকে না।
ঘটনাটা বিবৃত করে মলিনাক্স শেষে বললেন, বুঝলে বন্ধু, একটু চেষ্টা করলে সিংহটাকে বোধ হয় আমরা মারতে পারি। কি বল?
আফ্রিকার জঙ্গলে ইতিমধ্যে তাদের গুলি খেয়ে ইহলীলা সংবরণ করেছে কয়েকটা লেপার্ড, জলহস্তী, কুমির ও অ্যান্টিলোপ। তবে বনের রাজা সিংহের উপর গুলি চালানোর সুযোগ তাদের একবারও হয়নি।
পেশাদার শিকারি না হলেও শিকারের শখ দুজনেরই আছে। তাই বন্ধুর প্রস্তাবে সঙ্গেসঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন হাম্বার। কয়েকদিন পর পর রাত্রিবেলা গ্রামের নিকটবর্তী অরণ্যে একটা ছাগল বেঁধে গাছের উপর রাইফেল হাতে সিংহের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন হাম্বার ও মলিনাক্স। কিন্তু রাত্রি জাগরণই সার হল–পশুরাজ ছাগ-মাংসের লোভে শিকারির ফাঁদে পা দিল না। এমনকী ধারেকাছেও এল বলে মনে হয় না।
এ ব্যাপারে স্থানীয় বাসিন্দারা কিন্তু মোটেই অবাক হল না। তাদের বদ্ধমূল বিশ্বাস, মায়াবী সিংহ আগে থেকেই সব জানতে পারে। দুই বন্ধু কিন্তু খুবই হতাশ হলেন। হাম্বার চলে গেলেন জারিয়ায় তার কার্যস্থলে। আর মলিনাক্স বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন পূর্বোক্ত। বিশ্রাম-আগারে। কথা রইল, কাজ শেষ হলে হাম্বার ওইখানে এসে। বন্ধুর সঙ্গে মিলিত হবেন।
কিন্তু দিন কয়েক পরে যথাস্থানে। এসে মলিনাক্সের চিঠি দেখে হাম্বার : তো হতভম্ব! কী ব্যাপার?
এইবার শুরু হল মলিনাক্সের বিবরণ।
সেদিনকার দুঃস্বপ্নে ভরা রাত্রির সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ঘটনা তিনি বন্ধুকে বলতে শুরু করলেন :
বৃহস্পতিবার রাত্রি। চাকররা আলোর ব্যবস্থা করে জাঙ্গা গ্রামে ফিরে গেছে। আমি রাতের আহার সারলুম বিশ্রাম-আগারের বাইরে, কারণ ঘরের মধ্যে গরমে অস্বস্তি বোধ করছিলুম। বিশ্রাম-আগারের কাছেই যেখানে রান্না হয়, সেই কুঁড়েঘরটা তুমি দেখেছ। আমার কুকুর দুটো সেই রান্নাঘরের ভিতর তাদের বরাদ্দ খাদ্যে ক্ষুধা নিবৃত্তি করছে। আমি বিশ্রাম-আগারের ভিতর একটা বই নিয়ে বসলুম। অবশ্য বইয়ে মনোনিবেশ করার আগে বাঁশের তৈরি পর্দা ফেলে ফাঁক দুটি ঢেকে দিতে ভুলিনি…
হঠাৎ ঘরের বাইরে মাটির ওপর শুষ্ক ঝরা পাতার বুকে জাগল মর্মরধ্বনি। পরক্ষণেই পর্দার তলা দিয়ে তিরবেগে ঘরে ঢুকল আমার দুটি কুকুর!
দারুণ আতঙ্কে জন্তু দুটোর উদ্ধত লাঙ্গুল আশ্রয় নিয়েছে পিছনের দুই পায়ের ফাঁকের মধ্যে। আর কণ্ঠ ভেদ করে বেরিয়ে আসছে অবরুদ্ধ আর্তনাদ!
কুকুর দুটো ঘরের ভিতর প্রবেশ করার সঙ্গেসঙ্গেই শুনতে পেলুম একটা গুরুভার জীবের ধাবমান পায়ের আঘাতে মাটির উপর থেকে সশব্দে উড়ে যাচ্ছে ঝরা পাতার রাশি।
অদৃশ্য আগন্তুক সশব্দে পর্দা-ঝোলানো ফাঁকটার পিছনে এসে থেমে গেল। পরক্ষণেই বজ্রপাতের মতো গম্ভীর গর্জনে কেঁপে উঠল ঘরটা!
কণ্ঠস্বরেই অন্ধকারে অদৃশ্য জীবটির পরিচয় পেলুম–সিংহ!
দারুণ আতঙ্কে কুকুর দুটো ছুটে এসে ঘরের মাঝখানের খুঁটির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। রাইফেলের সন্ধান করতে গিয়েই চমকে উঠলুম। মনে পড়ল, অস্ত্রটাকে খুলে তেল দিয়ে বাক্সবন্দি করা হয়েছে এবং তৈলসিক্ত অবস্থায় আমার রাইফেল বন্ধুটি এখন চামড়ার বাক্সে বিশ্রাম করছে বিশ্রাম-আগারের বাইরে!
সর্বনাশ! এখন উপায়?
আবার, আবার জাগল সেই হিংস্র শ্বাপদকণ্ঠের ভয়াবহ গর্জনধ্বনি! বদ্ধ কুটিরের ভিতর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে সেই প্রচণ্ড শব্দতরঙ্গ নিশ্চিত মৃত্যুর কণ্ঠস্বরের মতোই আমার কানে এসে বাজল। পর্দা-ঝোলানো ফাঁকটার যেদিক থেকে গর্জনটা ভেসে এল, তার বিপরীত দিকের পর্দা লক্ষ করে ছুটল কুকুর দুটো। তবে সৌভাগ্যের বিষয়, আতঙ্কে অস্থির হলেও কুকুর দুটোর বুদ্ধি-ভ্রংশ ঘটেনি।
