চিঠিতে এই মত পরিবর্তনের কার্যকারণ কিছুই উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করেননি মলিনাক্স। হাম্বারের মস্তিষ্ক তাই উত্তপ্ত হয়ে উঠল।
তবে যতই রাগ হোক, বন্ধুর সঙ্গে দেখা তো করতেই হবে। বিশ্রামাগারে একটুও বিশ্রাম না-করে হাম্বার সাহেব সেই জাঙ্গা নিগ্রো-পল্লির দিকে সবেগে পদচালনা করলেন।
সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বেরই নয়, দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যের প্রশ্নও জড়িত ছিল। হাম্বার এবং মলিনাক্স নাইজিরিয়ার এই অঞ্চলে এসেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানের বেতনভোগী কর্মচারী হয়ে, অতএব রাগ হলেও দেখা না-করে উপায় ছিল না।
জাঙ্গা গ্রামে গিয়ে বন্ধুর দেখা পেলেন হাম্বার। একটা কুঁড়েঘরের ভিতর বসে মলিনাক্স বিশ্রাম করছেন। হাম্বার দেখলেন বন্ধুর চোখে-মুখে স্পষ্ট অবসাদের চিহ্ন। চিঠিতে স্থানত্যাগের কার্যকারণ না-লিখে হঠাৎ চলে আসার জন্য হাম্বার একটু বিরক্তি প্রকাশ করতেই মলিনাক্স বাধা দিয়ে বললেন, আমি অত্যন্ত দুঃখিত। কিন্তু বিশ্বাস করো, ওখানে আর একটি রাতও কাটানো সম্ভব ছিল না। সারারাত ধরে সেদিন যে কী ভীষণ উদবেগ আর দুশ্চিন্তায়
অসহিষ্ণু কণ্ঠে হাম্বার বললেন, তোমার মানসিক অবস্থার বিশ্লেষণ শুনতে চাই না। আসল কথাটা বলো। কী হয়েছিল?
-বলছি।
.
মলিনাক্সের সে-কাহিনি শোনার আগে পূর্ববর্তী ঘটনা একটু জানা দরকার। হাম্বার ও মলিনাক্স নামক এই দুজন শ্বেতাঙ্গ একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাইনিং ডিপার্টমেন্ট বা খনিজ বিভাগে কাজ করেন। খনিজ বিভাগের দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত কর্মচারীরা কাজ করেন জোড়ায় জোড়ায় হাম্বার আর মলিনাক্স ছিলেন ওইরকম এক মানিকজোড়। আফ্রিকার অন্তর্গত নাইজিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে দুই বন্ধু নানারকম খনিজ দ্রব্যের অনুসন্ধান করেন। কখনো সাফল্যের আনন্দ, কখনো-বা ব্যর্থতার আক্ষেপ নিয়ে সুখে-দুঃখে তাদের দিনগুলো ভালোই কাটছিল।
নাইজিরিয়ার জারিয়া প্রদেশ পরিদর্শন করে হাম্বারের ধারণা হল, এখানে বোধ হয় অভ্রের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। সুতরাং তার আরও কয়েক দিন সেখানে থাকা দরকার। মলিনাক্স রওনা হলেন জাঙ্গা নামক হওসা জাতীয় নিগ্রো-পল্লির দিকে। জাঙ্গার নিগ্রো-পল্লির বাইরে একটা সুন্দর রেস্টহাউস বা বিশ্রাম-আগার আছে। দুই বন্ধুর মধ্যে ব্যবস্থা হল যে, ওখানেই আশ্রয় গ্রহণ করবেন মলিনাক্স এবং জারিয়া থেকে হাম্বারের প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত ওইখানেই অপেক্ষা করবেন।
হাম্বারের অনুমান নির্ভুল, অভ্রের সন্ধান পাওয়া গেল জারিয়াতে। তবে জমির অবস্থা দেখে তিনি বুঝলেন, ডিনামাইট, ড্রিল প্রভৃতি সাজসরঞ্জাম না হলে কাজ করা সম্ভব হবে না। প্রতিষ্ঠানের প্রধান দপ্তর তখন জাঙ্গাতে। অতএব প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি সংগ্রহের জন্য হাম্বার জাঙ্গাতে ফিরে এলেন।
নির্দিষ্ট স্থানে বন্ধুর দেখা পেলেন তিনি। বিশ্রাম-আগারটিও দেখলেন। তাঁর বেশ ভালাই লাগল। মাটির তৈরি বৃত্তাকার ঘরটি বিশ ফিট জায়গা জুড়ে অবস্থান করছে। জানালা-দরজা নেই, দরজার পরিবর্তে মাটির দেয়ালে দুটো মস্ত ফাঁক হাঁ করে আছে এবং ফাঁক দুটো কাটা হয়েছে। পরস্পরের বিপরীত দিকে। বাঁশের তৈরি একজোড়া মাদুর ঝুলিয়ে ফাঁক দুটিকে ঢেকে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। রৌদ্রদগ্ধ নাইজিরিয়ার তপ্ত বায়ু বিশ্রাম-আবাসের মধ্যস্থলকে উত্তপ্ত করতে পারে । ঘাসপাতা আর বাঁশের আচ্ছাদনের নীচে মাটির ঘরের শীতল অভ্যর্থনা সত্যি লোভনীয়।
সব দেখেশুনে হাম্বারের ধারণা হল, মলিনাক্স সহজে এখান থেকে নড়বেন না। মলিনাক্সও জানিয়ে দিলেন, বন্ধুর অনুমান সত্য।
খুব কাছাকাছি কয়েকটা শুষ্ক নদীর বুকে কিছু মূল্যবান খনিজ দ্রব্যের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে মলিনাক্স আশা করছেন এবং ওই জায়গাগুলির উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখতে হলে এই রেস্ট-হাউসের মতো আরামদায়ক আস্তানা আর কোথায় পাওয়া যাবে?
তা ছাড়া আর একটা কারণও আছে, মলিনাক্স বললেন, কাছেই একটা সিংহ আছে। আমি দেখেছি। ওটাকে মারব।
সিংহ?হাম্বার হেসে উঠলেন, এ-অঞ্চলে সিংহ নেই। যে-জন্তুটাকে তুমি সিংহ মনে করছ, আসলে সেটা হয়তো লেপার্ড ছাড়া আর কিছুই নয়।
আরে, না, না, মলিনাক্স জোর দিয়ে বললেন, আমি সিংহই দেখেছি। স্থানীয় বাসিন্দারা সবাই ওটার কথা জানে। জন্তুটা বড়োই উপদ্রব চালাচ্ছে–গাঁয়ের ভিতর থেকে কুকুর আর ছাগল নিয়ে যাচ্ছে, একটি লোককে সেদিন এমনভাবে জখম করেছে যে, সে বেচারা বাঁচে কি না সন্দেহ। জানোয়ারটাকে কোনোভাবেই মারা যাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, ওটা কোনো জাদুর আওতায় আছে। জন্তুটাকে যদি পারি তো আমিই মারব। যেদিন ওটাকে দেখেছিলুম, সেদিন আমার কাছে বন্দুক ছিল না।
হাম্বারের আগ্রহ দেখে সেদিনের ওই সিংহ-দর্শনের ঘটনাটি খুলে বললেন মলিনাক্স।
জাঙ্গার নিগ্রো-পল্লির কাছে দুই মাইলের মধ্যে একটা নদী আছে। নদী এখন প্রায় শুকনো, সামান্য জলের ধারা দেখা যায়। একদিন সকালে নদীতীরের বালুকাময় ভূমি পর্যবেক্ষণ করে মলিনাক্সের সন্দেহ হল, বালির মধ্যে হয়তো সোনার সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। বালি পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত সরঞ্জাম অর্থাৎ গোল্ডপ্যান নিয়ে তিনি বিকেল বেলার দিকে যথাস্থানে উপস্থিত হলেন। মলিনাক্সের সঙ্গী হল দুটি চাকর এবং তাঁরই পোষা কুকুর দুটো। কুকুর হিসাবে তারা কিন্তু মোটেই ফেলনা নয়। একটি হচ্ছে ভয়ংকর বুলমাস্টিফ, অপরটি বর্ণসংকর হলেও তার রক্তে ছিল বিলাতি কুকুরের আভিজাত্য।
