আবার গর্জে উঠল জর্জের রাইফেল, একটা দাঁত গুলির আঘাতে ভেঙ্গে গেল সশব্দে।
জলহস্তী আবার ডুব দিল।
হঠাৎ জর্জের হৃৎপিণ্ডটা দারুণ আতঙ্কে বুকের মধ্যে লাফিয়ে উঠল–নিগ্রো শিকারি আর সর্দার ক্যানোটাকে মুহূর্তের মধ্যে টেনে আনল সেইখানে, ঠিক যেখানে ডুব দিয়েছে জলহস্তী।
কিন্তু তারা ভুল করেনি, শিকারের অভিজ্ঞতা জর্জের চাইতে তাদের বেশি ক্যানোটা যেখান থেকে সরে এসেছিল, ঠিক সেই জায়গায় রক্তাক্ত দেহ নিয়ে ভেসে উঠল জলহস্তী।
এক মুহূর্ত দেরি হলে দানবটার করাল মুখগহ্বরের মধ্যে ধরা পড়ত নৌকা; তারপর কী ঘটত কল্পনা করতেই জর্জের বুক কেঁপে উঠল।
জর্জ আবার গুলি চালাল। মনে হল লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে। চটপট দাঁড় চালিয়ে ক্ষিপ্ত জলহস্তীর নাগালের বাইরে ক্যানোটাকে নিয়ে গেল সর্দার এবং নিগ্রো শিকারি কোনোমতে নিশানা স্থির করে আর একবার রাইফেলের ঘোড়া টিপল জর্জ।
গুলি লেগেছে কি না বোঝা গেল না, জন্তুটা আত্মগোপন করল জলের তলায়। জর্জ দেখল তার রাইফেলে অবশিষ্ট আছে আর একটিমাত্র টোটা। সে চিৎকার করে সঙ্গীদের সাবধান করে দিল।
কিন্তু নিগ্রোদের আদিম রক্তে তখন জেগে উঠেছে হত্যার নেশা–তারা সজোরে দাঁড় চালিয়ে নৌকা ছুটিয়ে দিল এবং মুহূর্ত পরেই নৌকাটা তীরের কাছে মাটিতে আটকে গেল।
ঠিক সেই সময়ে যদি জলহস্তী আবার আক্রমণ করত, তবে ক্যানোর আরোহীদের আর পলায়ন করার পথ ছিল না, দীর্ঘ দন্তের হিংস্র নিষ্পেষণে শিকারিদের দেহ হয়ে যেত ছিন্নভিন্ন।
একটু পরেই কর্দমাক্ত জলে রক্তর আলপনা ছড়িয়ে ভেসে উঠল জলহস্তী। মাঝ নদীতে ছিল জন্তুটা, আর নৌকাসুদ্ধ আরোহীরা তখন আটকে গেছে তীরবর্তী কর্দমাক্ত ভূমিতে–ভয়াবহ অবস্থা।
রাইফেলে একটিমাত্র গুলি ভরা থাকলেও জর্জের বুক-পকেটে কয়েকটা টোটা তখনও অবশিষ্ট ছিল। পকেট হাতড়ে টোটা খোঁজার সময় কিংবা ধৈর্য ছিল না–একটানে পকেট ছিঁড়ে জর্জ তিনটি টোটা হাতে নিল, তারপর রাইফেলে গুলি ভরে ফেলল কম্পিত হস্তে।
কিন্তু ততক্ষণে হিপো আবার অদৃশ্য হয়েছে জলের তলায়, কাজেই জর্জ গুলি চালাতে পারল না।
নৌকাটা তখন টলমল করে দুলছে।
অনেকটা জল ঢুকেছে ভিতরে, ক্যানোর তলদেশ অর্ধাংশ পরিপূর্ণ হয়ে গেছে নদীর জলে। মধ্যাহ্নের নির্জন নদীবক্ষ এখন আর নিস্তব্ধ নয়, রাইফেলের শব্দে আকৃষ্ট হয়ে অনেকগুলো ক্যানো নৌকা ছুটে এসেছে ঘটনাস্থলে ক্যানোর আরোহী স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাস, সাদা মানুষের জাদুবিদ্যা নিশ্চয় নদীর দানবকে কাবু করে ফেলেছে।
হঠাৎ চিৎকার করে উঠল নিগ্রো শিকারি, জলহস্তী জল থেকে উঠেছে। একটু দূরে জলাভূমির তীরে যে মরা কুমিরটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বাঁধা আছে, জন্তুটা সেইদিকেই এগিয়ে চলেছে।
খুব সাবধানে লক্ষ্য স্থির করে গুলি ছুড়ল জর্জ।
জলহস্তীর মাথার ওপর ফুটে উঠল রক্তধারার চিহ্ন, কিন্তু সে গুলির আঘাত গ্রাহ্য করল না। মাথায় একটা ঝকানি দিয়ে সে ধেয়ে গেল কুমিরের মৃতদেহটার দিকে তপ্ত বুলেটের দংশন তার কাছে মশক দংশনের চাইতে গুরুতর নয়!
জন্তুটার কর্ণ ও গণ্ডদেশের মাঝখানে নিশানা করে জর্জ রাইফেলের ঘোড়া টিপল।
এইবার বোধ হয় দানবের মর্মস্থানে রাইফেলের গুলি কামড় বসাল–পিছন ফিরে সশব্দে সে নেমে পড়ল নদীর জলে, পরক্ষণেই কর্দমাক্ত জলধারার মধ্যে লাল রক্তের ফোয়ারা ছড়িয়ে সে জলের তলায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
সারারাত ধরে অনেকগুলো ক্যানো ভাসিয়ে নদীর জলে পাহারা দিল নিগ্রোরা। পরের দিন সকাল জলহস্তীর মৃতদেহ ভেসে উঠল নদীর জলে। জন্তুটাকে নৌকার সঙ্গে বেঁধে বুলারা দাঁড় চালাতে শুরু করল, কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেকগুলো বলিষ্ঠ বাহুর আকর্ষণে মৃত দানবের দেহটা এসে পড়ল বুলাদের গ্রামের কাছে।
জর্জ দেখল, মৃত জলহস্তীর দেহে রয়েছে সাত-সাতটা বুলেটের ক্ষতচিহ্ন, তার মধ্যে তিনটি বুলেট জন্তুটার মস্তিষ্ক ভেদ করে ভিতরে ঢুকে গেছে।
এই মারাত্মক আঘাতগুলো অগ্রাহ্য করে জন্তুটা নদীর জলে আত্মগোপন করেছিল এবং তার মৃত্যু হয়েছে অনেক দেরিতে কী কঠিন জীবনীশক্তি!
জলহস্তীর পেট চিরে দেখা গেল তার মধ্যে রয়েছে চার-চারটি পিতলের ব্রেসলেট জাতীয় অলংকার ও একটি গ্রীবাবন্ধনী।
ওইসব অলংকার ব্যবহার করে বুলাদের মেয়েরা অর্থাৎ একাধিক হতভাগিনীর দেহ উদরস্থ করেছে জলবাসী দানব।
[কার্তিক ১৩৭৬]
দুঃস্বপ্নের রাত
আমি চললুম। জাঙ্গাতে থাকব এবং তোমার জন্য ওইখানেই অপেক্ষা করব। কোনো কারণেই এখানে অপেক্ষা করবে না–সোজা চলে এসো জাঙ্গাতে। সব লেখা চলে না। দেখা হলে সব কিছু খুলে বলব।
প্রায় দিন দুই আগেকার তারিখ-বসানো চিঠির উপরে বা নীচে কোনো সম্বোধন বা স্বাক্ষর নেই, মাটির দেয়ালের গায়ে পিন দিয়ে আটকানো অবস্থায় ঝুলছে!
স্বাক্ষর বা সম্বোধন না-থাকলেও হাম্বার সাহেব বুঝলেন, চিঠিটা লিখেছেন তার বন্ধু মলিনাক্স। পূর্বব্যবস্থা অনুযায়ী মাটির তৈরি এই রেস্ট হাউস বা বিশ্রাম-আগারটিতেই মলিনাক্স বাস করছিলেন এবং এখানেই তাঁর থাকার কথা।
হঠাৎ তিনি মত পরিবর্তন করলেন কেন? গ্রামের ভিতর শ্বেতাঙ্গদের উপযোগী কোনো বাসস্থান যখন নেই, তখন এমন চমৎকার বিশ্রামাগারের আরাম ছেড়ে মলিনাক্স হঠাৎ কেন জাঙ্গা গ্রামে চলে গেলেন?
