হিপো চিবিয়ে খাচ্ছে কুমিরের শরীরটাকে!
অতি সাবধানে নিঃশব্দে পিছিয়ে এল জর্জ। ওই ঝোপের মধ্যে পদার্পণ করার সাহস তার হল না–উদ্ভিদভোজী জলহস্তী যখন মাংসলোলুপ হয়ে ওঠে, তখন তার আহারে বাধা না-দিয়ে সরে পড়াই ভালো।
গ্রামবাসীরা নিগ্রো শিকারির মুখে সব ঘটনা শুনল, তারা কোনো মতামত প্রকাশ করল না। কিন্তু নিজের ভীরুতার জন্য নিজেকেই ধিক্কার দিল। সে বুঝেছিল, জন্তুটাকে মারতে না-পারলে গাঁয়ের মানুষ তার ওপর আর শ্রদ্ধা রাখবে না। স্থানীয় অধিবাসীদের শ্রদ্ধা হারিয়ে বুলাদের গ্রামে বসে ব্যাবসা চালানো অসম্ভব।
ব্যাবসার কথা ছেড়ে দিলেও জর্জের আত্মসম্মানে ভীষণ আঘাত লেগেছিল। নিজের ভীরুতাকে সে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছিল না।
জর্জের কাছে যে রাইফেলটা ছিল, সেটা বিশেষ শক্তিশালী নয়। ও-রকম হালকা রাইফেল নিয়ে মাংসলোলুপ দানবটার সম্মুখীন হওয়া দস্তুরমতো বিপজ্জনক। তবু জর্জ স্থির করল, ওই অস্ত্র নিয়েই সে জলহস্তীর মুখোমুখি দাঁড়াবে–হয় সে জন্তুটাকে মারবে, আর না হয়তো নিজেই মরবে, জীবন বিপন্ন হলেও আর পালিয়ে আসবে না। হয় মারো, নয় মরো, এই হল তার সংকল্প।
কুমির এবং জলহস্তীর লড়াইয়ের পর পর দু-দিন কেটে গেছে। জর্জ বুঝল, এতক্ষণে জলহস্তীটা নিশ্চয় ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছে। অতএব এখন সে আবার শিকারের সন্ধান করবে।
জর্জ চিন্তা করতে লাগল কেমন করে জন্তুটাকে মারা যায়। জর্জের রাইফেল খুব শক্তিশালী নয়। তাই জন্তুটাকে মারতে হলে তার দেহের সবচেয়ে দুর্বল স্থানে আঘাত হানতে হবে।
জলহস্তীর কর্ণমূলে অব্যর্থ সন্ধানে গুলি বসাতে পারলে তার মৃত্যু নিশ্চিত, শরীরের অন্যান্য স্থানে হালকা রাইফেলের গুলি চালিয়ে তাকে কাবু করা সম্ভব নয়।
ঝোপজঙ্গলের মধ্যে জন্তুটাকে গুলি করলে ফলাফল হবে অনিশ্চিত। কানের গোড়ায় গুলি করতে হলে জলহস্তীকে নদী কিংবা জলাভূমির বুকে ফাঁকা জায়গায় পাওয়া দরকার।
বুলাদের সর্দার এবং স্থানীয় শিকারি (যে লোকটি পূর্ববর্তী অভিযানে জর্জের সঙ্গী ছিল) এবারের অভিযানে জর্জের সঙ্গী হতে রাজি হল।
একটা হালকা ক্যানো নৌকা ভাসিয়ে তারা বেরিয়ে পড়ল শিকার অভিযানে। এই ধরনের নৌকাগুলিকে ইচ্ছা করলে খুব দ্রুত চালানো যায়।
জোয়ারের বিপরীত মুখে অনেকক্ষণ নৌকা চালিয়ে নদীর ধারে কাদার মধ্যে তারা একটা কুমির দেখতে পেল।
জর্জ কুমিরটাকে গুলি করে মারল, তারপর মৃত সরীসৃপের দেহটাকে সবাই মিলে পূর্ববর্তী জলাভূমির তীরে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে ফেলল।
টোপ প্রস্তুত। এবার শুধু অপেক্ষা করার পালা।
নদীর স্রোত যেদিকে যাচ্ছে, সেদিকে গিয়ে নদীর মাঝখানে খুঁটি বসিয়ে নৌকার নোঙর করা হল। তারপর শিকারিরা অপেক্ষা করতে লাগল।
সর্দারের মাথা ঝুঁকে পড়ল নিদ্রার আবেশে, কিন্তু নিগ্রো শিকারির দুই চোখের তীব্র দৃষ্টিতে তন্দ্রার আভাস ছিল না কিছুমাত্র কাঠের মূর্তির মতো স্থির হয়ে সে বসে রইল নৌকার পশ্চাদ্ভাগে।
জর্জ তার সঙ্গে কথা কইল না। রাইফেল বাগিয়ে ধরে সে অপেক্ষা করতে লাগল নীরবে।
আফ্রিকার প্রখর সূর্য জ্বলতে লাগল মধ্যাহ্নের আকাশে, সঙ্গেসঙ্গে শুরু হল মশার উপদ্রব। কুমিরের মৃতদেহটা ফুলে উঠল, বাতাসে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল বিশ্রী দুর্গন্ধ। কয়েকটা মাংসলোলুপ টিক পাখি উড়ে বসল মরা কুমিরের উপরে–এমন চমৎকার গন্ধের কারণ অনুসন্ধান করতে বাতাসে ডানা মেলে উড়ে এল একটা মস্ত বড়ো মাছ শিকারি চিল।
শব্দহীন মৃত্যুপুরীর মতো নিস্তব্ধ নদীবক্ষে অগ্নিবৃষ্টি করতে লাগল আফ্রিকার মধ্যাহ্ন সূর্য, তরল পিতলের গলিত স্রোতের মতো জ্বলে জ্বলে উঠল রৌদ্রস্নাত জলধারা আর অসহ্য তৃষ্ণায় শুষ্ক হয়ে গেল জর্জের কণ্ঠ, পিপাসায় তার প্রাণ করতে লাগল ছটফট ছটফট…
অপরাহ্ন। দূর গ্রাম থেকে ভেসে এল মানুষের কণ্ঠস্বর। জলাভূমির বুকে উঠল আলোড়নের শব্দ, সঙ্গেসঙ্গে জাগল এক গর্জনধ্বনি। আবার সব শান্ত, নীরব।
আচম্বিতে জর্জের দেহে জেগে উঠল এক অস্বস্তিকর অনুভূতি।
ঘুমন্ত সর্দার হঠাৎ সোজা হয়ে উঠে বসল, তার চোখে নেই তার আবেশ।
নৌকায় উপবিষ্ট নিগ্রো শিকারির দীর্ঘ দেহ টান হয়ে গেল ধনুকের ছিলার মতো।
তারা কেউ কথা কইল না, তীব্র অনুভূতি তাদের হঠাৎ জানিয়ে দিয়েছে কিছু একটা ঘটছে।
শিকারির দুই চক্ষুর স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ হল নদীর তীরে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করল জর্জের চক্ষু, সঙ্গেসঙ্গে তার সর্বাঙ্গ দিয়ে ছুটে গেল বিদ্যুত্তরঙ্গ!
নদীর ধারে তাদের নৌকা থেকে প্রায় দশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই ভয়াবহ মাংসভুক জলহস্তী!
জর্জ রাইফেল তুলল।
জলহস্তী বিকট হাঁ করে গর্জে উঠল, বজ্রপাতের মতো সেই গভীর গর্জনধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে।
পরক্ষণেই অগ্নি-উদগার করল রাইফেল।
নদীর ঢালু পাড় বেয়ে ধেয়ে এল জলহস্তী। তার প্রকাণ্ড দেহ সশব্দে এসে পড়ল নদীর জলে।
আবার গুলি ছুড়ল জর্জ।
এক ঝটকায় নৌকার নোঙর খুলে ফেলল নিগ্রো শিকারি, আর তৎক্ষণাৎ সজোরে দাঁড় চালিয়ে দিল বুলাদের সর্দার। বন্ধনহীন নৌকা স্যাৎ করে পাক খেয়ে ঘুরে গেল স্রোতের মুখে।
নদীর জলে ডুব দিয়ে ভেসে উঠল হিপো, মস্ত বড়ো হাঁ করে তেড়ে এল নৌকার দিকে–হিংস্র আক্রোশে উন্মুক্ত মুখের গহ্বর থেকে উঁকি দিল বাঁকা তলোয়ারের মতো দুই দীর্ঘ স্বদন্ত।
