কিন্তু বঁড়শির টোপ বঁড়শিতেই রয়ে গেল, মাংসলোলুপ কোনো দানব সেই ফাঁদে ধরা দিতে এল না।
এইবার জর্জ অন্য উপায় অবলম্বন করল।
বাগানের শেষ সীমানায় নদীর কাছে গাছের সঙ্গে একটা ছাগল বেঁধে রাইফেল হাতে জর্জ সারারাত জেগে পাহারা দিল। অন্ধকার রাত্রি রাইফেলের নলের সঙ্গে বাঁধা ছিল বিশেষ। ধরনের বিজলি বাতি বা ফ্ল্যাশ লাইট।
কিন্তু জর্জের রাত্রি জাগরণই সার, কোনো জানোয়ারই ছাগমাংসের লোভে অকুস্থলে পদার্পণ করল না। পরের দিন জায়গাটা ভালো করে দেখা হল–নাঃ, আশেপাশে কোথাও নেই কোনো ভয়ংকরের পদচিহ্ন।
তখন নদীর জলে ভাসল ক্যানো (এক ধরনের নৌকা) এবং সেই ভাসমান নৌকার ওপর বসে রাইফেল হাতে সমস্ত নদীটাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল জর্জ।
ওই সময়ে চারটি কুমির তার গুলিতে মারা পড়ল।
অনুসন্ধানপর্ব চলল পর পর দু-দিন। তৃতীয় দিবসে আবার বুলাদের গ্রামের কাছে দেখা দিল সেই বিরাট পদচিহ্নগুলি!
একজন স্থানীয় শিকারিকে নিয়ে জর্জ পায়ের ছাপগুলিকে অনুসরণ করল।
অসংখ্য লায়ানা লতার বেড়াজালের নীচে হামাগুড়ি দিতে দিতে পায়ের ছাপ লক্ষ করে এগিয়ে চলল জর্জ এবং নিগ্রো শিকারি।
অবশেষে স্যাঁৎসেঁতে ঝোপজঙ্গল ভেদ করে তারা এসে যেখানে থামল, সেখানে একটা মস্ত জলাভূমির উপর মাথা তুলেছে অনেকগুলো ম্যানগ্রোভ গাছ।
সেই গাছের সারির শেষ সীমানায় এসে দাঁড়ায় দুই শিকারি। জলাশয়ের তীরে এক জায়গায় অল্প জল জমেছিল নিগ্রো শিকারি হঠাৎ সেইদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করল।
জর্জ সচমকে লক্ষ করল, সেখানে অগভীর জলের ভিতর শুয়ে আছে প্রকাণ্ড কুমির! এত বড়ো কুমির কখনো তার চোখে পড়েনি! হলুদ, কালো আর গাঢ় সবুজ রঙের বিচিত্র সমাবেশ ছড়িয়ে আছে জলবাসী সরীসৃপটার সর্বদেহে, বিকট হাঁ-করা মুখটা ভেসে আছে জলের উপর, দুই চক্ষু অর্ধনিমীলিত, কিন্তু ক্রুর দৃষ্টিতে ভয়ংকর।
এটা নিশ্চয় নরখাদক–জর্জ রাইফেল তুলে নিশানা স্থির করল। সেই মুহূর্তে নিগ্রো শিকারি অস্ফুট স্বরে কিছু বলে উঠল, আর চমকে রাইফেল নামিয়ে নিল জর্জ।
জলার বুকে তখন এক ভয়াবহ নাটকের সূচনা দেখা দিয়েছে!
জলার উপর দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে একটা জলহস্তী কুমিরের দিকে। অগভীর জলাশয়ের তলদেশে মাটির উপর পা ফেলে এত ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে সেই বিশালকায় পশু যে, জলের উপর সামান্য দুই-একটা ঢেউ ছাড়া অন্য কোনো আলোড়নের চিহ্ন বা শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।
তার মস্ত বড়ড়া শরীর জলের তলায় অদৃশ্য, জলার বুকে ভেসে উঠেছে শুধু নাসিকার অগ্রভাগ, দুই কর্ণ এবং একজোড়া শূকর-চক্ষু।
ধীরে, অতি ধীরে উঠে দাঁড়াল জলহস্তী জলাশয়ের তীরে–তার বেগুনি রঙের চামড়া থেকে ঝরে পড়ছে জলের ধারা।
অতি সাবধানে, মন্থর গতিতে এগিয়ে গেল জলহস্তী কুমিরটার দিকে।
সে যখন কুমিরের থেকে প্রায় পাঁচ গজ দূরে এসে পড়েছে, তখন সরীসৃপের উন্মুক্ত মুখগহ্বর বন্ধ হয়ে গেল সশব্দে।
কুমির এবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
বিকট হাঁ করে তেড়ে এল জলহস্তী, দীর্ঘ একটি স্ব-দন্তের আঘাতে সে কুমিরকে চিত করে ফেলে দিল। কুমির সামলে ওঠার আগেই আবার সগর্জনে তেড়ে এল জলহস্তী, বর্শাফলকের মতো সুদীর্ঘ দন্ত দিয়ে খোঁচা মারতে লাগল কুমিরের দেহে এবং সামনের দুই পায়ের সাহায্যে প্রতিদ্বন্দ্বীকে চেপে ধরার চেষ্টা করতে লাগল বার বার।
হঠাৎ ভয়ংকর দুই চোয়ালের ফাঁকে ধরা পড়ল জলহস্তীর সামনের একটি পা।
পরক্ষণেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল জলহস্তী, কুমিরের পেটের ওপর সামনের আর একটি পা চাপিয়ে সে এমন চাপ দিল যে সরীসৃপের শক্ত চোয়ালের বজ্ৰদংশন হয়ে গেল শিথিল।
শত্রুর উন্মুক্ত মুখত্বরের ভিতর থেকে ঝটকা মেরে নিজের পা ছাড়িয়ে নিল জলহস্তী, তারপর এক কামড়ে ছিঁড়ে ফেলল কুমিরের পিছনের একটি ঠ্যাং!
কুমিরের প্রকাণ্ড শরীর পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরতে লাগল, কাটা বসানো লোহার চাবুকের লাঙ্গুল বারংবার আছড়ে পড়ল শত্রুর উদ্দেশে। .
কিন্তু জলহস্তী কাবু হল না।
বিদ্যুদবেগে কুমিরের চারপাশে একবার ঘুরে সে আক্রমণ করল। মুহূর্তের মধ্যে কুমিরের দেহটাকে কামড়ে ধরে সে শূন্যে তুলে ফেলল।
দুই দ্বিপদ দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিল সেই ভয়ানক দ্বৈরথ যুদ্ধ।
একটা মস্ত বড়ো কুকুরের মুখে ইঁদুর যেমনভাবে ঝুলতে থাকে, ঠিক তেমনিভাবেই কুমিরটা ঝুলছিল জলহস্তীর মুখ থেকে।
জলহস্তীর দুই চোয়াল নির্মম দংশনে চেপে বসল শত্রুর দেহে। ছটফট করে উঠল কুমির। তার সমস্ত শরীর একবার ধনুকের মতো বেঁকে সিধে হয়ে গেল, ভয়ংকর মুখটা ফাঁক হয়ে আত্মপ্রকাশ করল বীভৎস দন্তের সারি।
জর্জ আর স্থানীয় শিকারি শুনতে পেল, কুমিরের গলা থেকে বেরিয়ে আসছে হিস হিস শব্দ!
কুমিরটাকে মুখে নিয়ে জলহস্তী জলার মধ্যে নেমে গেল।
দারুণ আতঙ্কে জর্জের শরীর হয়ে পড়েছিল অবশ, তার ঘামে ভেজা আঙুলগুলো শক্ত মুঠিতে আঁকড়ে ধরেছিল রাইফেল কিন্তু ট্রিগার টিপে গুলি চালানোর ক্ষমতা তার ছিল না।
খাচ্ছে! ও খাচ্ছে! ফিসফিস করে বলল নিগ্রো শিকারি।
একটু দূরেই একটা ঘন ঘাসঝোপের ভিতর থেকে ভেসে এল কড়মড় কড়মড় শব্দ যেন একটা প্রকাণ্ড জাঁতাকলের মধ্যে ভেঙে যাচ্ছে এক অতিকায় দানবের অস্থিপঞ্জর!
