অতিশয় গুরু দেহ নিয়েও জলহস্তী অবিশ্বাস্য দ্রুতবেগে ছুটতে পারে। তার বিকট মুখগহ্বরের মধ্যে যে দাঁতগুলো উদ্ভিদ জাতীয় বস্তু চর্বণ করতে অভ্যস্ত, যুদ্ধের সময় সেই দীর্ঘ দস্তগুলি মৃত্যুর করাল ফাঁদের মতো চেপে ধরে শত্রুর দেহ কয়েকটি মুহূর্তের মধ্যে হতভাগ্য শত্রুর শরীর রক্তাক্ত মাংসপিণ্ডে পরিণত হয় একজোড়া দন্তভয়াল চোয়ালের প্রচণ্ড পেষণে!
জলহস্তীর স্বভাব-চরিত্র জানত জর্জ নুজেন্ট, তাই গ্রামের সীমানার বাইরে অপেক্ষারত জন্তুটির পদচিহ্ন দেখে সে আশ্চর্য হয়েছিল–জলহস্তী মানুষের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলে, সে তো নিরামিষভোজী, অতএব পশুমাংস বা নরমাংসের লোভে গ্রামের ভিতর হানা দেওয়া তার পক্ষে স্বাভাবিক নয়।
কিন্তু গ্রামের বাসিন্দা বুলা জাতীয় নিগ্রোরা ভীত হয়ে পড়ল। সারারাত তারা আগুন জ্বালাতে লাগল এবং বদ্ধদ্বার কুটিরের মধ্যে প্রেতাত্মার রোষদৃষ্টি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নানারকম ক্রিয়াকলাপ করল।
এত কাণ্ড করা সত্ত্বেও পরের দিন সকালে গ্রামের কাছে আবার সেই পায়ের ছাপ দেখা গেল! অর্থাৎ পদচিহ্নের মালিক জ্বলন্ত আগুন বা মন্ত্রতন্ত্রের পরোয়া করে না কিছুমাত্র!
ভীষণ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল বুলাদের গ্রামে। তাদের ধারণা হল, এটা কোনো পশুর পায়ের ছাপ নয়–পশুর দেহ ধারণ করে তাদের গ্রামে হানা দিতে চায় এক দুষ্ট প্রেতাত্মা!
বুলারা ঢাকের শরণাপন্ন হল, আফ্রিকার আদিম অধিবাসীরা ঢাকের সাহায্যে দূরদূরান্তরে খবর পাঠিয়ে দেয়। ঢাকের আওয়াজ শুনেই তারা বুঝতে পারে বাদক কী বলতে চায়।
বুলারা ঢাক বাজাতে শুরু করল।
ঢাকের আওয়াজ যেসব গ্রামে পৌঁছে গেল, সেইসব গ্রামের অধিবাসীরা বুঝল, বুলাদের গ্রামে এক প্রেতাত্মার আবির্ভাব হয়েছে। তারা আবার ঢাক বাজিয়ে দূরের গ্রামবাসীদের পাঠিয়ে দিল ওই দুঃসংবাদ বাতাসে ভর করে গ্রাম হতে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ল ঢাকের টেলিগ্রাফ
সাবধান! সাবধান! বুলাদের গ্রামে হানা দিয়েছে এক প্রেতাত্মা!
জর্জ ভীত হয়ে পড়ল। সে অবশ্য বুলাদের মতো প্রেতাত্মার ভয়ে কাতর হয়নি, তার ভয়ের কারণ অন্য।
একিন নামক গ্রামে বাস করত জর্জ নুজেন্ট। সে ব্যবসায়ী, ওই অঞ্চলের গ্রামবাসীদের সঙ্গে তার ব্যাবসাবাণিজ্য চলত। ফল থেকে তৈরি নানা ধরনের খাদ্য, গজদন্ত ও উদ্ভিদজাত দ্রব্য নিয়ে আসত বিভিন্ন গ্রামের মানুষ একিন গ্রামের শ্বেতাঙ্গ অধিবাসী জর্জের কাছে এবং ওইসব জিনিসের ব্যাবসা করে জর্জের লাভের অঙ্ক কেঁপে উঠছিল ভালেভাবেই।
কিন্তু ঢাকের আওয়াজ যখন জানিয়ে দিল একিন গ্রামে প্রেতাত্মার আবির্ভাব ঘটেছে, তখন ভিন গাঁয়ের মানুষ আর জিনিসপত্র নিয়ে ওই গ্রামে আসতে রাজি হল না। অতএব আমদানির অভাবে জর্জের ব্যাবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
একদিন সকাল বেলা গ্রামের মধ্যে ভীষণ গোলমাল শুরু হল–আর্তনাদ, চিৎকার এবং ঢাকের ঘনঘন কর্কশ শব্দে চমকে উঠল জর্জ নুজেন্ট। কুঁড়েঘরের আস্তানা ছেড়ে বাইরে ছুটে এসে জর্জ দেখল, নদীতীরে অবস্থিত বাগানগুলি থেকে আর্তকণ্ঠে চিৎকার করতে করতে ছুটে আসছে অনেকগুলি বুলা জাতীয় স্ত্রীলোক তাদের মধ্যে একজন নাকি দানবের কবলে পড়েছে!
রাইফেলটা টেনে নিয়ে জর্জ চলল বাগানের দিকে! তার সঙ্গী হল কয়েকজন বর্শাধারী যোদ্ধা।
নদীর তীরবর্তী গাছগুলির নীচে একটা সচল পদার্থ সকলের চোখে পড়ল। জর্জ গুলি চালাল। তৎক্ষণাৎ সেই সজীব বস্তুটি পলায়ন করল দ্রুতবেগে।
আর একটু এগিয়ে যেতেই জর্জ এবং যোদ্ধাদের দৃষ্টিপথে ধরা দিল এক ভয়াবহ দৃশ্য–রক্তধারার মধ্যে নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে একটি তরুণীর মৃতদেহ।
দেখলেই বোঝা যায়, কর্দমাক্ত মাটিতে চেপে ধরে মেয়েটির শরীর ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। টুকরো টুকরো করে।
পৈশাচিক কাণ্ড!
জর্জের সঙ্গে ছিল বুড়ো হাফোর্ড, সে দেখিয়ে দিল মেয়েটির একটা হাত নেই, হত্যাকারী হাতটাকে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। মৃতদেহের চারপাশে কাদামাখা মাটির ওপর খালি জল আর জল–সেই ঘোলাটে জলের মধ্যে হত্যাকারীর পায়ের ছাপ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
জর্জ ভেবেছিল, হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী একটি কুমির। কিন্তু মেয়েরা আর্তকণ্ঠে জানিয়ে দিল, : কুমির নয়, স্বয়ং শয়তান ওই মেয়েটিকে হত্যা করেছে।
মেয়েদের ঘোষণা শুনে সমবেত জনতা জর্জের দিকে দৃষ্টিপাত করল।
জর্জ অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। শ্বেতাঙ্গদের প্রতি বুলাদের অসীম শ্রদ্ধা। তারা আশা করছে। জর্জের রাইফেল এবার শয়তানকে শাস্তি দেবে। জনতা কথা কইছে না বটে কিন্তু তাদের চোখগুলো যেন নীরব ভাষায় বলছে, তুমি থাকতে শয়তান আমাদের গাঁয়ে হানা দেবে? নারীহত্যা করবে? বাঁচাও, আমাদের বাঁচাও।
জর্জ স্থির করল, যেমন করেই হোক এই খুনে জন্তুটাকে মরতে হবে। মানুষ হিসাবে এটা তার কর্তব্যও বটে, তা ছাড়া এখানে লাভ-লোকসানের প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। জন্তুটাকে মারতে পারলে ভিন গাঁয়ের লোক জিনিসপত্র নিয়ে একিন গ্রামে আবার যাতায়াত শুরু করবে। আবার জমে উঠবে জর্জের ব্যাবসা।
তবে, ব্যাপারটা সহজ নয় খুব।
জর্জ বুঝেছিল, শয়তানকে শিকার করতে গিয়ে সে নিজেও হঠাৎ শয়তানের শিকারে পরিণত হতে পারে।
বড়ো বড়ো বঁড়শিতে পচা মাংসের টোপ গেঁথে নদীতে ফেলে দেওয়া হল। সেগুলো সাধারণ বঁড়শি নয়, এই বঁড়শি গলায় আটকালে বড়ো বড়ো কুমির পর্যন্ত ঘায়েল হয়ে যায়।
