আগেই বলেছি, ক্যামেরার view-finder টা খারাপ ছিল। ক্যামেরার যান্ত্রিক চক্ষুর ভেতর দিয়ে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে তার ধারণা হল জন্তুটা এখনও অনেক দূরেই আছে–আসলে গণ্ডার তখন খুব কাছে এসে পড়েছে।
কটার যখন বিপদ বুঝে ক্যামেরা রেখে রাইফেল তুলে নিলে তখন আর সময় নেই।
গণ্ডারের খঙ্গ প্রায় কটারের দেহস্পর্শ করেছে।
সশব্দে অগ্নি-উদগার করলে কটারের রাইফেল।
সঙ্গেসঙ্গে গণ্ডারের সুদীর্ঘ খঙ্গ সেই অতিকায় নরদানবের দেহটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলে।
কটারের মুখ থেকে একটা আর্তনাদও শোনা গেল না। সে তৎক্ষণাৎ মারা গেল।
চার্লস কটার জীবনে কখনো পরাজয় স্বীকার করেনি, মৃত্যুকালেও জয়লক্ষ্মী তার কণ্ঠে পরিয়ে দিলেন জয়মাল্য।
মরবার আগে সে একবারই গুলি চালাবার সুযোগ পেয়েছিল আর সেই একটামাত্র গুলির আঘাতেই তার আততায়ী মৃত্যুবরণ করল।
চার্লস কটারের মৃতদেহের পাশেই লুটিয়ে পড়ল গণ্ডারের প্রাণহীন দেহ।
[১৩৭৩]
দানবের ক্ষুধা
রামায়ণে বর্ণিত কুম্ভকর্ণ ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৬৪ দিনই ঘুমিয়ে থাকত, আর একদিন জেগে উঠে ক্ষুধা নিবৃত্তি করে আবার আশ্রয় গ্রহণ করত নিদ্রাদেবীর ক্রোড়ে।
হ্যাঁ, সারাবছরে মাত্র একদিনই সে আহার গ্রহণ করত বটে, কিন্তু তার সেই একদিনের আহার্য সংগ্রহ করতে স্বয়ং রাবণ রাজা পর্যন্ত হিমশিম খেয়ে যেতেন–বাঘ, ভালুক, হাতি, গণ্ডার, মানুষ, বানর প্রভৃতি বিভিন্ন চতুষ্পদ ও.দ্বিপদ জীবের রক্তমাংসে ক্ষুধা তৃপ্ত করে কুম্ভকর্ণ আবার ঘুমিয়ে পড়ত এবং সারাবছর ধরে একটি লম্বা ঘুম দিয়ে পরবর্তী বছরের শেষ দিনে আবার জেগে উঠত শূন্য উদরে সর্বগ্রাসী ক্ষুধা নিয়ে।
এই মূর্তিমান বিভীষিকার জন্ম রাক্ষস-বংশে হয়নি, কুম্ভকর্ণ ছিল ব্রাহ্মণ-সন্তান।
কিন্তু ব্রাহ্মণ-সন্তান হলেও ব্রাহ্মণের সংস্কার ছিল না কুম্ভকর্ণের রক্তে, বিপ্রসুলভ সাত্ত্বিক আহারে সে তুষ্ট থাকতে পারেনি, বিভিন্ন প্রাণীর রক্তমাংসে তৃপ্ত হত তার ভয়াবহ ক্ষুধা।
পশুজগতে সন্ধান করলে এমন অনেক পশুর সন্ধান পাওয়া যায়, যারা কুম্ভকর্ণের মতো নিদ্রাবিলাসী না হলেও আহারে-বিহারে তার মতোই পূর্বপুরুষের প্রচলিত সংস্কার মেনে চলতে রাজি হয়নি।
এইসব চতুষ্পদ কুম্ভকর্ণ শাকসবজি, ঘাসপাতা প্রভৃতি নির্জীব খাদ্যের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে হঠাৎ একদিন আহার্যতালিকা পরিবর্তন করার প্রয়োজন বোধ করেছে এবং তাদের ক্ষুধিত দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে রক্তমাংসের দেহধারী সজীব খাদ্যের প্রতি।
কেন এমন হয় বলা মুশকিল। পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষ যখন এইসব অর্থহীন ঘটনাগুলো ঘটতে দেখে, যুক্তি আর বুদ্ধি নিয়ে ওই ঘটনাগুলির কার্যকারণ সে যখন বুঝতে পারে না, তখন সে হয়ে পড়ে হতভম্ব।
হ্যাঁ, হতভম্ব হয়ে পড়েছিল জর্জ নুজেন্ট।
দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যামেরুন প্রদেশের এক অখ্যাত গ্রামের খুব কাছেই কয়েকটা পায়ের ছাপ তার চোখে পড়েছে, কিন্তু চার আঙুলবিশিষ্ট ওই গভীর পদচিহ্নগুলির কার্যকারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সে হয়ে পড়েছে হতভম্ব।
পায়ের ছাপ চিনতে অবশ্য জর্জের অসুবিধা হয়নি।
চারটি অঙ্গুলিবিশিষ্ট ওই গভীর পদচিহ্নগুলির মালিক যে একটি জলহস্তী, সে-কথা দাগগুলো দেখেই সে বুঝতে পেরেছিল এবং পায়ের দাগগুলি ভালোভাবে পরীক্ষা করে সে জানতে পারল যে, জন্তুটা গ্রামের বাইরে ওই জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল অনেকক্ষণ।
কিন্তু কেন? জন্তুটা কি গ্রামবাসীদের লক্ষ করছিল?
ছাগল, গোরু, ভেড়া প্রভৃতি গৃহপালিত পশুর মাংসের লোভে গাঁয়ের আশেপাশে ঝোপঝাড়ের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে থাকে সিংহ, লেপার্ড অথবা হায়না গ্রামবাসীদের অলক্ষ্যে তারা গ্রামের মানুষ এবং পশুগুলির ওপর নজর রাখে–রাতের অন্ধকারে সুযোগ পেলেই গৃহপালিত পশুর ঘাড় ভেঙে শিকার মুখে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় অরণ্যের অন্তঃপুরে।
শুধু গৃহপালিত পশু নয়, অনেক সময় নরমাংসের লোভেও গ্রামের কাছে লুকিয়ে থাকে নরখাদক শ্বাপদ। কিন্তু জলহস্তী নিরামিষভোজী পশু, সে গ্রামের কাছে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল কেন?
জর্জ নুজেন্ট এই জন্তুটার অদ্ভুত আচরণের কোনো কারণ বুঝতে পারল না।
সত্যি, ক্যামেরুন অঞ্চলের এই জলহস্তীর আচরণ অত্যন্ত অদ্ভুত। হিপো বা জলহস্তী কখনো কখনো হিংস্র স্বভাবের পরিচয় দেয় বটে, কিন্তু সাধারণত তারা মানুষকে এড়িয়ে চলে। নির্জন নদী এবং জলাভূমি তাদের প্রিয় বাসস্থান। গভীর রাতে জলের আশ্রয় ত্যাগ করে তারা ডাঙায় উঠে আসে এবং জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে ঘাস, পাতা, গাছের মূল প্রভৃতি উদ্ভিদজাত পদার্থ উদরস্থ করে ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য। জলা কিংবা নদী থেকে অনবরত বনের মধ্যে যাতায়াত করার ফলে এই গুরুভার জন্তুগুলির পায়ের চাপে চাপে বনজঙ্গল ভেঙে যায়, বিপুল বপু দানবদের পদচিহ্ন বুকে নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে নূতন অরণ্যপথ।
বনের মধ্যে যখন তারা আহারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়, তখন কোনো কারণে ভয় পেলে তারা ওই পায়ে চলা পথ ধরে ছুটে যায় জলের মধ্যে আত্মগোপনের জন্য সেই সময় কোনো মানুষ অথবা জানোয়ার যদি তাদের বাধা দেয়, তাহলে তার যে দুর্দশা হয় তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
