সঙ্গী তখন কটারের কবলে ছটফট করছে আর লাথি ছুড়ছে। সেই সনখ থাবার একটা লাথি এসে লাগল দুনম্বর লেপার্ডের পেটে–সঙ্গেসঙ্গে ধারালো নখের আঁচড়ে বিদীর্ণ হয়ে গেল উদরের মাংসপেশি।
কটার সেই মুহূর্তের সুযোগ নিতে ছাড়ল না।
টপ করে হাত বাড়িয়ে সে দ্বিতীয় লেপার্ডটার কণ্ঠনালী চেপে ধরলে। এইবার সমস্ত শরীরের শক্তি দিয়ে সে জন্তু দুটোকে মাটিতে চেপে ধরে গলা টিপে মারবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু লেপার্ডের মংসপেশিগুলো স্প্রিং-এর মতো। চার্লস কটারের মতো মানুষের পক্ষেও তাদের মাটিতে চেপে রাখা অসম্ভব।
জন্তু দুটো জোর করে ঠেলে উঠল। কাজেই কটারও সোজা হয়ে দাঁড়াতে বাধ্য হল, কিন্তু প্রতিপক্ষের কণ্ঠনালীর ওপরে তার আঙুলের চাপ একটুও শিথিল হল না।
নখের আঘাতে কটারের কাঁধ আর হাতে তখন ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। এত রক্তপাতেও সে কাবু হল না বরং রক্ত দেখে তার মাথায় খুন চেপে গেল। ক্রুদ্ধ কটার এবার যা করলে তা প্রায় অবিশ্বাস্য একটা জন্তুর মাথার সঙ্গে সে আর একটা জন্তুর মাথা ঠুকতে লাগল সজোরে!
লেপার্ড দুটো কিন্তু এমন দারুণ মার খেয়েও অবসন্ন হল না!
তারা ক্রমাগত ছটফট করে কটারের বজ্রমুষ্টি থেকে নিজেদের মুক্ত করার চেষ্টা করছে আর তাদের থাবার ধারালো নখগুলো সমানে শত্রুর দেহে আঁচড় কেটে যাচ্ছে।
রক্তে লাল হয়ে উঠল কটারের সমস্ত শরীর। লেপার্ড দুটোর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এল লৌহ-কঠিন অঙ্গুলির নিষ্ঠুর পেষণে।
তবু কোনো পক্ষই পরাজয় স্বীকার করলে না!
কটারের সঙ্গে যে নিগ্রো সঙ্গীরা ছিল তারা প্রথমে পালিয়ে গিয়েছিল কিন্তু পরে আবার ফিরে এসেছে।
বিস্ফারিত দুই চক্ষুর ভীতিবিস্মিত দৃষ্টি মেলে তারা তাকিয়ে আছে এই আশ্চর্য দৃশ্যের দিকে–কিন্তু এখন আর কটারকে সাহায্য করার উপায় নেই, মানুষ ও পশু এমনভাবে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে মারামারি করছে যে গুলি চালালে কটারও আহত হতে পারে।
এখন আর কটারকে সাহায্য করার কোনো উপায় নেই।
যে-পক্ষের সহ্যশক্তি বেশি সেইপক্ষই জয়লাভ করবে।
রক্তস্নাত চার্লস কটারের বিশাল দেহ অফুরন্ত শক্তির আধার–সে হঠাৎ বুঝতে পারলে তার দুই শত্রুর দেহ অবশ হয়ে আসছে, তাদের থাবার আঁচড়ে, শরীরের আস্ফালনে আর আগের মতো জোর নেই।
মহা-উল্লাসে কটার চিৎকার করে উঠল।
যে-লেপার্ডটার উদর সঙ্গীর নখের আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে গিয়েছিল তার ক্ষতস্থান থেকে তখন অবিরল ধারায় রক্ত ঝরে পড়ছে।
কটারের অবস্থা তো আগেই বলেছি।
মানুষ ও পশুর রক্তে পিছল হয়ে উঠল রণভূমির ঘাসজমি।
কটার যখন বুঝল তার শত্রুরা দুর্বল হয়ে পড়ছে তখন সে লড়াইয়ের কায়দা বদলে ফেললে। হাত দুটোকে সোজা করে এমনভাবে সে জন্তু দুটোকে তুলে ধরলে যে তাদের থাবাগুলো আর কটারের দেহস্পর্শ করতে পারল না।
এইবার সে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে জন্তু দুটোর মাথা ঠুকতে লাগল।
মাথার ওপর পড়ছে প্রচণ্ড আঘাত, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে লৌহকঠিন অঙ্গুলির নিষ্ঠুর পেষণে।
ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এল দুই শ্বাপদের দেহ…
মুমূর্ষু জন্তু দুটোকে মাটির ওপর আছড়ে ফেলে কটার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
সে এক আশ্চর্য দৃশ্য ধরাশয্যায় শুয়ে মৃত্যু-যাতনায় ছটফট করছে দু-দুটো লেপার্ড আর তাদের পাশেই ক্ষতবিক্ষত রক্তস্নাত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে এক মহাকায় মানুষ।
গল্পের টারজান কি কটারের চেয়েও শক্তিশালী?
কটার এবার কী করবে?
বাড়ি ফিরে যাবে?
ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে শয্যাগ্রহণ করবে?
মোটেই নয়। চার্লস কটার হচ্ছে চার্লস কটার।
নিগ্রোদের সাহায্যে ক্ষতস্থানগুলোতে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে সে আবার পথ চলতে শুরু করল।
কথায় আছে ডানপিটের মরণ গাছের আগায়।
চার্লস কটার অবশ্য গাছের আগায় মরেনি, তবে তার মৃত্যু হয়েছিল অত্যন্ত ভয়ানকভাবে। জন্মগ্রহণ করেছিল সে সুসভ্য আমেরিকার ওকলাহামা প্রদেশে আর তার মৃত্যু হল ঘন-বন-আবৃত আফ্রিকার অন্তঃপুরে।
একেই বলে নিয়তি!
হ্যাঁ, নিয়তি ছাড়া আর কী বলব!
চার্লস কটারের মৃত্যুকে একটা অদ্ভুত দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না আর এই দুর্ঘটনার কারণ হল একটা যন্ত্রের যান্ত্রিক ত্রুটি!
না, না, রাইফেল নয়, পিস্তল নয়।
একটা ক্যামেরার দোষেই হল সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
অর্থাৎ কটারের মৃত্যুর জন্য দায়ী একটা ক্যামেরা!
মনে হচ্ছে অবিশ্বাস্য–তাই না?
কিন্তু বাস্তব সত্য অনেক সময়ে কল্পনাকে অতিক্রম করে যায়।
আচ্ছা, ঘটনাটা খুলেই বলছি।
কটার একদিন রাইফেলের সঙ্গে ক্যামেরা ঝুলিয়ে জঙ্গলের পথে যাত্রা করলে।
ক্যামেরার view-finder টা খারাপ ছিল। (ক্যামেরার মধ্যে বসানো স্বচ্ছ কাঁচের মতো যে জিনিসটার ভেতর দিয়ে ক্যামেরাধারী বিষয়বস্তুকে লক্ষ করে সেই অংশটিকে বলে view finder)।
ক্যামেরার সামান্য ত্রুটি নিয়ে কটার বোধ হয় মাথা ঘামায়নি আর এইটুকু অন্যমনস্কতার জন্যই তাকে প্রাণ হারাতে হল।
কটার হেঁটে চলেছে জঙ্গলের পথে হঠাৎ তার চোখের সামনে আত্মপ্রকাশ করলে একটা মস্ত গণ্ডার।
রাইফেল রেখে সে ক্যামেরা বাগিয়ে ধরলে আর নিবিষ্টচিত্তে গণ্ডারের ফটো তুলতে লাগল।
হতভাগা গণ্ডার!
ফটো তুলে দেওয়ার জন্য সে একটুও কৃতজ্ঞতা বোধ করল না, একটুও খুশি হল না।
সোজা তেড়ে এল কটারের দিকে খড়্গ উঁচিয়ে!
