একটু পরেই ঘটনাস্থলে একটা লেপার্ড আত্মপ্রকাশ করলে।
জন্তুটার দিকে তাকিয়ে কটার হতাশ হল–লেপার্ডটা আকারে বিশেষ বড়ো নয়, তার গায়ের চামড়াটাও কটারের কাছে লোভনীয় মনে হল না।
গ্রামের আশেপাশে যেসব লেপার্ড ঘোরাঘুরি করে তাদের দেহের আকার খুব বড়ো হয় না, গায়ের চামড়া হয় অনুজ্জ্বল, ফ্যাকাশে। কিন্তু ঘন জঙ্গলের মধ্যে যে লেপার্ডগুলো বাস করে সেগুলো সত্যিই বৃহৎ বপুর অধিকারী, তাদের চামড়া অতি উজ্জ্বল ও সুন্দর।
কটার আশা করেছিল একটি বেশ বড়োসড়ো লেপার্ড তার ফাঁদে পা দেবে, কিন্তু এই জন্তুটাকে দেখে তার মেজাজ হয়ে গেল খাপ্পা।
লেপার্ড ধূর্ত জানোয়ার–সে তখন কুকুরের মৃতদেহটার কাছে ঘোরাঘুরি করছে, তবে ভোজের জিনিসে মুখ দেয়নি। কিছুক্ষণ পরে তার মনে হল এই ভোজটা সম্ভবত নিরাপদ, এখানে কামড় বসালে বোধ হয় বিপদের আশঙ্কা নেই–সে নীচু হয়ে বসে পড়ল, এইবার একলাফে গাছে উঠে মরা কুকুরটাকে নামিয়ে আনবে।
চার্লসের মেজাজ আগেই খারাপ হয়েছিল, তার লেপার্ডকে ইতস্তত করতে দেখে সে আশা করলে জন্তুটা হয়তো চলে যেতে পারে। কিন্তু লেপার্ড যখন লাফ দিতে উদ্যত হল তখন তার আর ধৈর্য বজায় রইল না। ইচ্ছে করলে কটার অনায়াসেই গুলি করে লেপার্ডকে হত্য করতে পারত কিন্তু সে তা করলে না–হাতের রাইফেল ফেলে দিয়ে হঠাৎ কটার ছুটে এসে জন্তুটার পেছনের ঠ্যাং দুটো ধরে ফেললে!
পরক্ষণেই দুই সবল বাহুর আকর্ষণে লেপার্ডের শরীরটা শূন্যে নিক্ষিপ্ত হয়ে সশব্দে ধরাশয্যায় আছড়ে পড়ল!
লেপার্ডের ঊর্ধ্বতন চোদ্দো পুরুষ কেউ কখনো এমন ব্যবহার সহ্য করেনি। আকারে ছোটো হলেও লেপার্ড হচ্ছে লেপার্ড; তুচ্ছ মানুষের হাতে আছাড় খেয়ে মুখের গ্রাস ফেলে পালিয়ে যেতে সে রাজি হল না।
ভীষণ আক্রোশে গর্জন করে সে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু কটারের অস্বাভাবিক লম্বা হাতগুলো এড়িয়ে জন্তুটা শত্রুর দেহে দাঁত বসাতে পারলে না। লোহার মতো শক্ত দু-খানা হাত লেপার্ডের গলা টিপে ধরল।
সামনের থাবার ধারালো নখগুলি কটারের হাত দু-খানা রক্তাক্ত করে দিলে, তবুও কটার জন্তুটা গলা ছাড়ল না।
ঝটাপটি করতে করতে মানুষ ও পশু মাটির ওপর গড়িয়ে পড়ল। লেপার্ডের পেছনের থাবা দুটিও নিশ্চেষ্ট রইল না, তীক্ষ্ণ নখের আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল কটারের সর্ব-অঙ্গ কিন্তু লৌহকঠিন অঙ্গুলির নিষ্ঠুর বন্ধন একটুও শিথিল হল না…
অবশেষে কঠিন নিষ্পেষণে রুদ্ধ হয়ে এল জন্তুটার কণ্ঠনালী, উন্মুক্ত মুখগহ্বরের ভেতর থেকে উঁকি দিলে দীর্ঘ দাঁতের সারি আর সেই অবস্থায় নিশ্বাস নেবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে লেপার্ড প্রাণত্যাগ করল।
চার্লস কটারের সর্বাঙ্গ থেকে তখন ঝরছে গরম রক্তের স্রোত, টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে সেই উষ্ণ তরল ধারা মৃত লেপার্ডের দেহের ওপর।
সে এবার কী করবে?
ক্ষতগুলিতে ওষুধ দেবার জন্য কি এখন ফিরে যাবে বাড়িতে? পাগল! কটার সে জাতের মানুষই নয়!
রক্তাক্ত ক্ষতগুলিতে মোটামুটি খানিকটা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে সে পরবর্তী শিকারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
একটু পরেই সেখানে এসে উপস্থিত হল আরেকটি লেপার্ড। এবারের লেপার্ডটা আকারে খুব বড়ো, তার গায়ের চামড়াটিও খুব সুন্দর। কটার বুঝল এই জানোয়ারটা গভীর অরণ্যের বাসিন্দা।
নিশানা স্থির করে সে রাইফেলের ঘোড়া টিপল।
অব্যর্থ সন্ধান! একটিমাত্র গুলিতেই লেপার্ডের প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
এই ঘটনার পরে কয়েকটা দিন কেটে গেছে।
জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে চলেছে চার্লস কটার।
আচম্বিতে গাছের ওপর ঘন লতাপাতার আড়াল থেকে তার ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ল দু-দুটো ছোটো জাতের লেপার্ড!
যে-জানোয়ারটা কটারের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে নিহত হয়েছিল এই লেপার্ড দুটো তারই পরিবারভুক্ত কি না জানি না, কিন্তু সমস্ত ঘটনাটা শুনলে এটাকে প্রতিশোধের ব্যাপার বলেই মনে হয়।
এমন অভাবিত ও অতর্কিত আক্রমণের জন্য কটার প্রস্তুত ছিল না। সমস্ত ব্যাপারটা সে যখন বুঝল তখন লেপার্ডের দাঁত ও নখের আঘাতে তার দেহ রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে।
কিন্তু চার্লস কটার হচ্ছে চার্লস কটার।
মুহূর্তের মধ্যে সে কর্তব্য স্থির করে ফেললে!
হাতের রাইফেল আর কাজে লাগবে না বুঝতে পেরে সে অস্ত্রটাকে মাটিতে ফেলে আক্রমণের মোকাবেলা করার জন্যে রুখে দাঁড়াল।
কটারের দ্রুত প্রতি-আক্রমণের জন্য লেপার্ড দুটো প্রস্তুত ছিল না, তারা ছিটকে শত্রুর পায়ের কাছে গড়াগড়ি খেতে লাগল। সেই সুযোগে কটার চট করে একটা জানোয়ারের গলা চেপে ধরলে। এত জোরে সে লেপার্ডের গলা টিপে ধরেছিল যে জন্তুটার চোখে রক্ত জমে গেল!
কটারের শরীরও অক্ষত ছিল না!
ধারালো নখের আঘাতে বিদীর্ণ ক্ষতমুখ থেকে ছুটছে রক্তের ফোয়ারা, সুদীর্ঘ শ্বাপদ-দন্তের হিংস্র শুভ্রতাকে লাল করে দিয়ে সেই তপ্ত রক্তধারা গড়িয়ে পড়ল আক্রান্ত জন্তুটার হাঁ-করা মুখের মধ্যে!
অন্য লেপার্ডটা কটারের খপ্পরে ধরা পড়েনি।
সে এবার পিছন থেকে শত্রুর পৃষ্ঠদেশ লক্ষ করে লাফ দিলে।
কটার তখন প্রথম জানোয়ারটার সঙ্গে মারামারি করতে করতে হঠাৎ সামনে ঝুঁকে পড়েছে।
দু-নম্বর লেপার্ডের লাফটা ফসকে গেল।
লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার জন্য কটারের পিঠের ওপর না-পড়ে সে এসে পড়ল সঙ্গীর পেছনের দুটো পায়ের ওপর।
