চার্লস কটারের জীবনদর্শনে একটুও জটিলতা ছিল না। কটারের অস্বাভাবিক দীর্ঘ হাত দু-খানায় ছিল অমানুষিক শক্তি। তার ওপর সর্বদাই তার ডান হাতে থাকত একটা বেঁটে মোটা বাঁশের লাঠি আর কোমরে ঝুলত গুলিভরা রিভলভার।
ওকলাহামার দুর্দান্ত গুন্ডারাও বুঝল চার্লস কটার যতদিন শেরিফ আছে অন্তত সেই কটা দিন তাদের আইন মেনে চলতে হবে।
এই ভয়ানক মানুষটি যখন স্বদেশের মায়া কাটিয়ে পূর্ব-আফ্রিকার কেনিয়া অঞ্চলে পাড়ি জমাল তখন নিশ্চয়ই ওকলাহামার গুন্ডারা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। অবশ্য এটা আমার অনুমান-কটারের জীবন-ইতিহাসের কোনো পাতায় ওকলাহামার অধিবাসীদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়নি।
আফ্রিকাতে এসে চার্লস কটার শিকারির পেশা অবলম্বন করল। একাজে অর্থ উপার্জনের যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও কাজটা অতিশয় বিপজ্জনক। তবে চার্লস কটারের মতো মানুষের পক্ষে এই ধরনের পেশা পছন্দ হওয়াই স্বাভাবিক।
কটার ছিল বিবাহিত পুরুষ। তার পরিবারটির নেহাত ছোটো ছিল না। ছ-টি কন্যা এবং দুটি পুত্রসন্তান নিয়ে কটার প্রবল পরাক্রমে শিকারির ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছিল।
এইসব ব্যাবসা-সংক্রান্ত কথাবার্তা চলত টেলিগ্রাফের সাহায্যে। অফিসের কেরানিদের মধ্যে একধরনের লোক দেখা যায় যারা আইনের প্যাঁচ কষে সাধারণ মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে।
এই ধরনের কোনো কেরানি যখন চিঠি লিখে চার্লস কটারকে আইন এবং শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে উপদেশ দিতে চেষ্টা করত তখনই তার মেজাজ যেত বিগড়ে বন্দুকের বদলে কলম হাতে নিয়ে সে করত যুদ্ধ ঘোষণা।
আগেই বলেছি চার্লসের জীবনদর্শন ছিল খুব সহজ ও স্পষ্ট।
গভর্নমেন্টের বেতনভোগী কর্মচারীর সঙ্গে মারামারি করা যায় না তাই মূল্যবান উপদেশপূর্ণ চিঠিকে বাজে কাগজের ঝুড়িতে নিক্ষেপ করে সে কাগজ কলম নিয়ে চিঠি লিখতে বসত।
চিঠির ভাষা ছিল খুব সহজ—
মহাশয়,
আপনার চিঠিটা এইমাত্র আমার সামনে ছিল। এখন সেটা আমার পেছনে কাগজের ঝুড়ির মধ্যে আছে।
চার্লস-কটার
এমন সুন্দর চিঠি পেলে কোনো মানুষই খুশি হতে পারে না। ডাকবিভাগের কেরানিরা ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কটারের ওপর খঙ্গহস্ত ছিলেন। বেয়াড়া চিঠিপত্র লেখার জন্য প্রায়ই তার ওপর আদালতের সমন জারি হত। আদালতে দাঁড়াতে হলেই তার মেজাজ হয়ে উঠত খাপ্পা তখনকার মতো বিচারকের নির্দেশ পালন করে সে ঘরে ফিরে আসত বটে কিন্তু মহামান্য আদালত তার চরিত্র একটুও সংশোধিত করতে পারেননি। বেয়াড়া চিঠিপত্র লেখার জন্য বহুবার চার্লস কটারকে আদালতে দাঁড়াতে হয়েছে…
এই উদ্ধত মানুষটি তার জীবনে দু-দুবার লেপার্ডের সঙ্গে হাতাহাতি লড়াইতে নেমেছিল। হিংস্র শ্বাপদের শানিত নখর তার দেহের বিভিন্ন স্থানে সুগভীর ক্ষতচিহ্ন এঁকে দিয়েছিল বটে, কিন্তু সেই জীবন-মরণ যুদ্ধে প্রত্যেকবারই বিজয়লক্ষ্মীর বরমাল্য দুলেছে চার্লসের কণ্ঠে!
এই প্রসঙ্গে লেপার্ডের একটু পরিচয় দেওয়া দরকার। ভারতবর্ষেও লেপার্ড আছে, বাংলায় তাকে চিতাবাঘ বলে ডাকা হয়। আফ্রিকার জঙ্গলে চিতা নামে বিড়াল জাতীয় যে জানোয়ার বাস করে তার দেহচর্মের সঙ্গে লেপার্ডের কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও দেহের গঠন ও স্বভাব-চরিত্রে চিতার সঙ্গে লেপার্ডের কোনো মিল নেই–চিতা এবং লেপার্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন জানোয়ার।
চিতা লাজুক ও ভীরু প্রকৃতির জন্তু।
লেপার্ড হিংস্র, দুর্দান্ত!
জে হান্টার, জন মাইকেল প্রভৃতি শিকারিরা লেপার্ডকে আফ্রিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক জানোয়ার বলে ঘোষণা করেছেন।
সিংহের মতো বিপুল দেহ অথবা প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী না হলেও ধূর্ত লেপার্ডের বিদ্যুৎচকিত আক্রমণকে অধিকাংশ শিকারি সমীহ করে চলে।
লেপার্ডের আক্রমণের কায়দা বড়ো বিশ্রী।
লতাপাতা ও ঘাস ঝোপের ভেতর থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে যে যখন বিদ্যুদবেগে শিকারির ওপর লাফিয়ে পড়ে তখন অধিকাংশ সময়েই আক্রান্ত ব্যক্তি হাতের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পায় না। প্রথম আক্রমণেই লেপার্ড, তার সামনের দুই খাবার তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে শিকারির চোখ দুটোকে অন্ধ করে ফেলার চেষ্টা করে, সঙ্গেসঙ্গে একজোড়া দাঁতালো চোয়ালের মারাত্মক দংশন চেপে বসে শিকারির কাঁধে আর পেছনের দুই থাবার ধারালো নখগুলির ক্ষিপ্র সঞ্চালনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় হতভাগ্যের উদরদেশ!
এই হিংস্র অথচ সুন্দর জানোয়ারটাকে কটার ভীষণ ঘৃণা করত। সে প্রায়ই বলত, আঃ! বেটাদের নখে কী দারুণ ধার! আঁচড় দিলে মনে হয় যেন ক্ষুর চালাচ্ছে! শয়তানের বাচ্চা
হ্যাঁ, এ-কথা অবশ্য সে বলতে পারে।
তার হাতপায়ের যেসব অংশ পরিচ্ছদের বাইরে দৃষ্টিগোচর হয় সেদিকে একবার তাকালেই চোখে পড়ে অজস্র ক্ষতচিহ্ন–অভিজ্ঞ মানুষ সহজেই বুঝতে পারে যে ক্রুদ্ধ লেপার্ডের নখের আঘাতেই ওই গভীর ক্ষতচিহ্নগুলোর সৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু লেপার্ডের নখ কটারের শরীরে দাগ কাটলেও মনের মধ্যে একটুও দাগ বসাতে পারেনি। ওকলাহামা শহরে যে মানুষ গুন্ডার রিভলভারকে পরোয়া করেনি, আফ্রিকার লেপার্ডের দাঁত আর নখকেও সে সমীহ করতে শিখল না।
একদিনের ঘটনা বলছি…
বনের মধ্যে একটা গাছের ডালে ঝুলছে মরা কুকুরের টোপ আর খুব কাছেই ঝোপের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করছে রাইফেলধারী কটার। কুকুরের মাংস লেপার্ডের প্রিয় খাদ্য। কটার জানত মরা কুকুরের গন্ধে গন্ধে লেপার্ড আসবেই আসবে…
