ইতিমধ্যে নৌকা থেকে নেমে এসেছে অ্যাপারিসিও। একজন বৃদ্ধ সাশার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, সিনর! লোকটা কি তোমার শত্রু? ওঃ কী ভীষণ যন্ত্রণা পেয়ে মারা গেল বেচারা!
রক্তাক্ত ও ছিন্নভিন্ন ফাভেলকে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সাশা। অ্যাপারিসিও তাকে জড়িয়ে ধরে বজরার মধ্যে ঢুকে গেল। সাশা আর ফাভেলের মৃতদেহ দেখতে কুটিরের ভিতর প্রবেশ করেনি। যারা ভিতরে ঢুকেছিল, তারা পরে সাশাকে জানিয়েছিল যে, ফাভেলের পেটের প্রায় অর্ধেক অংশ মাছের দল খেয়ে ফেলেছিল–ফাভেল যদি তার পিস্তল থেকে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা না-করত, তাহলেও সে কয়েক মিনিটের বেশি বাঁচত না। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে। জানা গিয়েছিল ওই গ্রামে বেশ কয়েকমাস ধরে বাস করছিল ফাভেল। সে যে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যই সাশার সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে ওই অঞ্চলে এসে পড়েছিল, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
অ্যাপারিসিও সাশাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, সিনর আলেকজান্দ্রা! এই ঘটনার জন্য তুমি নিজেকে দায়ী মনে করে কষ্ট পেয়ো না। লোকটার অন্তরের ঘৃণাই তার মৃত্যু ডেকে এনেছে তুমি তার মৃত্যুর জন্য দায়ী নও।
সাশা জানত ফাভেলের মৃত্যুর জন্য সে দায়ী নয়। কিন্তু সে যদি নিজের হাতে ফাভেলকে হত্যা করত, সেটা অনেক ভালো ছিল–এমন বীভৎসভাবে অসহ্য যন্ত্রণাভোগ করে তাকে মরতে হত না। জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থাতেই ফাভেলের কোনো মূল্য ছিল না সাশার কাছে কিন্তু নরখাদক মাছের ভক্ষ্য হয়ে যেভাবে সে মৃত্যুবরণ করল, সেই ভয়াবহ মৃত্যুর দৃশ্য সাশাকে অত্যন্ত বিচলিত করে তুলল। অ্যাপারিসিওকে নিয়ে সে আবার বজরা ভাসাল বন্য পৃথিবীর বুকে হারিয়ে যাওয়ার জন্য…
.
পরিশিষ্ট
সাশা সিমেলের ঘটনাবহুল জীবনের কাহিনি সবিস্তারে বলতে গেলে ছোটোখাটো একটি মহাভারত সৃষ্টি হবে। তাই সংক্ষেপে শোনাচ্ছি ১৯৪২ সালের তাইগরেরোর ভূমিকা থেকে অবসর গ্রহণ করেছিল সাশা। জোকুইম গুয়াতো নামে যে রেড ইন্ডিয়ান শিকারিতাকে বর্শা হাতে লড়াই করতে শিখিয়েছিল, তার সঙ্গে জীবিত অবস্থায় আর সাশার দেখা করার সুযোগ হয়নি। একটা দুর্দান্ত জাগুয়ারের পিছনে তাড়া করার সময় নদীর ধারে নিহত জোকুইমের কঙ্কাল আর ভাঙা বর্শাটা আবিষ্কার করেছিল সাশা। তাইগরের কবলেই প্রাণ হারিয়েছিল তাইগরেরো জোকুইম গুয়াতো।
অনেকগুলো তাইগরের ভবলীলা সাঙ্গ করার পর ১৯৪০ সালে এডিথ নামে একটি শ্বেতাঙ্গ রমণীকে বিবাহ করে সাশা সংসারী হয়েছিল। মাত্তো গ্রসোর জঙ্গলে শিকার করতে এসেছিল ওই মেয়েটি। এডিথকে শিকারে সাহায্য করার জন্যই সাশা তার সঙ্গী হয়েছিল। আক্রমণোদ্যত ক্ষিপ্ত জাগুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভুল নিশানায় তাকে গুলি চালাতে দেখেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সাশা–পরে শিকারসঙ্গিনী হয়েছিল তার জীবনসঙ্গিনী।
বড়ো ভাই আর্নস্টের সঙ্গেও আর দেখা হয়নি সাশার। আর্নস্টকে আড়াল থেকে গুলি চালিয়ে খুন করেছিল গুপ্তঘাতক। সাশার কথা শুনে সতর্ক হলে হয়তো অমন শোচনীয়ভাবে মৃত্যু ঘটত না আর্নস্টের।
দানবের অপমৃত্যু
শক্তি ও সাহসের জন্য কয়েকটি শক্তিমান মানুষ জগৎজোড়া নাম কিনেছেন। এইসব বিশ্ববন্দিত শক্তিসাধকদের নিয়ে আমি আজ প্রবন্ধ লিখতে বসিনি; আমার কাহিনির নায়ক একজন অখ্যাত মানুষ–নাম তার চার্লস কটার।
এই অখ্যাত লোকটি কোনোদিনই খ্যাতিমান হওয়ার চেষ্টা করেনি, তবে তার অমানুষিক শক্তি। ও দুর্জয় সাহস ভুবনবিখ্যাত ব্যায়ামবীরদের চাইতে কোনো অংশেই কম নয়।
এমনকী প্রসিদ্ধ টারজানের বীরত্বের কাহিনিও কটারের চমকপ্রদ কীর্তিকলাপের কাছে ম্লান হয়ে যায়।
কাল্পনিক টারজানের লীলাক্ষেত্র ছিল আফ্রিকার বনভূমি। আমাদের কাহিনির নায়ক আফ্রিকার বাসিন্দা বটে কিন্তু আফ্রিকা তার স্বদেশ নয়–এদিক থেকে টারজানের সঙ্গে তার কিছুটা মিল আছে।
চার্লস কটারের জন্মভূমি ছিল ওকালাহামা প্রদেশে। আফ্রিকায় আসার আগে সে ছিল ওখানকার শেরিফ।
ওকলাহামা জায়গাটা বড়ো বেয়াড়া।
কোনো ভদ্রলোকই ওকলাহামাকে পছন্দ করবে না।
সেখানকার পথেঘাটে ও দোকানে বাজারে যে মানুষগুলি ভিড় জমায় তারা খুব নিরীহ স্বভাবের নয়।
কথায় কথায় সেখানে ঝগড়া বাধে।
ঝগড়া বাধলে মীমাংসার প্রয়োজন।
ওকলাহামার মানুষ বেশি কথাবার্তা পছন্দ করে না, চটপট ঘুসি চালিয়ে তারা ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করে দেয়।
অনেকে আবার মুষ্টিবদ্ধ হস্তের পক্ষপাতী নয়।
রিভলভারের ঘন ঘন অগ্নিবৃষ্টির মুখেই তারা বিবাদের নিষ্পত্তি করতে চায়।
এমন চমৎকার জায়গায় শেরিফ হয়ে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে যেমন মানুষের দরকার ঠিক তেমন মানুষ ছিল চার্লস কটার।
যেসব মানুষ বৃহৎ দেহের অধিকারী হয় সাধারণত তাদের চালচলন হয় শ্লথ এবং মন্থর, কিন্তু ছ-ফুট চার ইঞ্চি লম্বা এই নরদৈত্য ছিল নিয়মের ব্যতিক্রম।
প্রয়োজন হলে মুহূর্তের মধ্যে কোমর থেকে রিভলভার টেনে নিয়ে সে অব্যর্থ সন্ধানে লক্ষ্যভেদ করত।
ওকলাহামার মতো জায়গায় শেরিফের কাজ করে কটারের মনের গতি হয়েছিল খুবই স্পষ্ট আর সহজ।
একটা মানুষকে হয় সে পছন্দ করবে আর নয়তো পছন্দ করবে না। এই পছন্দ-অপছন্দর। মাঝামাঝি কিছু নেই।
কাউকে অপছন্দ হলেই সে তার ওপরে প্রয়োগ করত মুষ্টিবদ্ধ হস্তের মুষ্টিযোগ।
