আমার সন্দেহ হচ্ছে পেদ্রো ভাকা নামে লোকটা আমাকে অনুসরণ করছে, আর্নস্ট বলল, ওই লোকটাই আমাকে পিছন থেকে গুলি করেছিল। অবশ্য পেদ্রো ছাড়া আমার আরও কয়েকজন শত্রু আছে। আমার পাঁজরে ছুরি ঢোকাতে পারলে তাদের সকলেই খুশি হবে।
শোনো আর্নস্ট সাশা বলল, আমি তোমার আগেই কুয়াবা শহরে চলে যাব, আর ওই পেদ্রো ভাকা নামে লোকটাকে খুঁজে বার করে ব্যাপারটার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করব। তারপর পাকড়াও করব ফাভেলকে, তার সঙ্গে আমার যে বোঝাঁপড়া বাকি আছে, সেটাও চুকিয়ে ফেলব। আমরা যেন পলাতক আসামি, আমাদের পিছনে সবাই তাড়া করে ফিরছে–এই ব্যাপারটা আর চলতে দেব না আমি। শিকারি-যাতে শিকারে পরিণত হয়, তাই করব।
আর্নস্ট মাথা নেড়ে বলল, আলেক্স, আমি কুয়াবাতে চলে যাব বলে ঠিক করেছি, কোনো কারণেই তার নড়চড় হবে না। অ্যাবোব্রাল শহরের চাইতে কুয়াবা অনেক ভালো শহর, ওখানে আমাদের উপার্জনও হবে অনেক বেশি।
সাশা বুঝল আর্নস্ট তার সিদ্ধান্তে অনড়। অতএব ঘোড়ায় চড়ে সে ফিরে গেল র্যাঞ্চ ট্রায়াম্ফ নামক স্থানে প্রিয়সঙ্গী অ্যাপারিসিওর কাছে।
ঘোড়া খচ্চর প্রভৃতি বিক্রয় করে তারা বজরা ভাসাল নদীর বুকে। ওই বৃহৎ নৌকা বা বজরার নাম তারা রেখেছিল অ্যাডভেঞ্চারিরা–পোর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ অ্যাডভেঞ্চারারবা ভ্যাগ্যান্বেষী!
.
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
হাতে টাকাপয়সা কম ছিল বলে কোরাম্বা শহরে কিছুদিন থেকে যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ নিল সাশা আর অ্যাপারিসিও। ওই জায়গাটাতে ভালো কাজ-জানা মিস্ত্রির খুবই অভাব ছিল, তাই কাজ পেতে তাদের অসুবিধা হল না। বেশ ভালো উপার্জন হল তাদের।
১৯২৫ সালে বজরা চালিয়ে তারা একটা ছোটো গ্রামে এসে পৌঁছোল। পাথরের তৈরি একটা জেটি ডাঙা থেকে প্রায় পঞ্চাশ ফুট এগিয়ে এসে নদীর বুকে শেষ হয়েছে। জেটির গায়ে নদীর প্রবল জলস্রোত ক্রমাগত ধাক্কা মারার ফলে গভীর নালার সৃষ্টি হয়েছিল। ওই নালার ভিতর নোঙর-করা কয়েকটা নৌকা জলের উপর দুলছিল।
বড়ো নৌকা বা ডাকবিভাগের লঞ্চ নোঙর করার জন্য জেটির গায়ে কয়েকটা বড়ো বড়ো খুঁটি পোঁতা ছিল, তারই মধ্যে দুটি খুঁটির সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চারিরা নামে বজরাটিকে বাঁধা হল–তারপর প্রয়োজনীয় কয়েকটা জিনিস ক্রয় করার জন্য নদীতীরে অবস্থিত কুঁড়েঘরগুলোর দিকে অগ্রসর হল সাশা। সে আশা করেছিল ওই কুটিরগুলোর মধ্যে কোনো বলিচো (দোকান) পাওয়া যাবে, যেখান থেকে দরকারি জিনিসগুলো সে অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করতে পারবে। সাশার নিত্যসঙ্গী অ্যাপারিসিও রয়ে গেল বজরার মধ্যে জিনিসপত্র পাহারা দিতে।
কুটিরগুলোর কাছাকাছি এসে একটি ছোটোখাটো মানুষকে দেখতে পেল সাশা। লোকটির পরনে ছিল সাদ কোট আর গাঢ় রং-এর একটি প্যান্ট। নিকটবর্তী একটি কুটির থেকে বেরিয়ে লোকটি উঁচু জমির উপর দিয়ে হেঁটে জেটির ধারে এসে দাঁড়াল। প্রথমে লোকটির দিকে সাশা ভালোভাবে নজর দেয়নি, কিন্তু বারো ফুট দূরত্বের মধ্যে এসে লোকটি যখন থমকে দাঁড়াল এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সাশার দিকে চেয়ে রইল, তখনই তার দিকে আকৃষ্ট হল সাশা।
সিমেল!
লোকটার মুখে নিজের নাম শুনে চমকে উঠল। ভালো করে তার দিকে তাকাতেই সাশার সর্বাঙ্গ দিয়ে ছুটে গেল উত্তেজনার তীব্র শিহরন–ফাভেল!
প্রথম বিস্ময়ের চমক কেটে যেতেই এক প্রচণ্ড ক্রোধ সাশার চৈতন্যকে আচ্ছন্ন করে দিল। দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সে অগ্রসর হল ফাভেলের দিকে।
ফাভেল পিছিয়ে যেতে লাগল, সঙ্গেসঙ্গে চিৎকার, সিমেল! তুমি জাহান্নমে যাও। যদি সঠিকভাবে লড়াই করতে চাও, তাহলে চলে এসো!
সাশা দৃঢ়পদে এগিয়ে চলল ফাভেলের দিকে–এসপার কি ওসপার, আজকেই হয়ে যাবে চরম বোঝাঁপড়া!
পিছিয়ে এসে জেটির শেষপ্রান্তে দাঁড়াল ফাভেল, তারপর নালার মধ্যে নোঙর করা একটা নৌকায় লাফিয়ে পড়ে সে হাঁক দিল, চলে এসো সিমেল, চলে এসো। এখানেই আমি লড়ব তোমার সঙ্গে।
দোদুল্যমান নৌকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে লড়াই করতে গেলে সাশা তার দৈহিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারবে না ভালোভাবে সেইজন্যই ওইখানে দাঁড়িয়ে তাকে চ্যালেঞ্জ জানাল ফাভেল।
কিন্তু লড়াইটা কেমন জমত, আর ফলাফল কী হত, সেটা অজানাই রয়ে গেল–কারণ, ভারসাম্য সামলাতে না পেরে নৌকা থেকে নদীর জলে পড়ে গেল ফাভেল। সে তাড়াতাড়ি সাঁতার কেটে তীরের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সাশা। আর ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে একটি লোক চেঁচিয়ে উঠল, কী সর্বনাশ ওরা আসছে!
শুধু ওই লোকটি আর সাশা নয়, ছোটোখাটো একটি জনতা তখন সমবেত হয়েছে নদীতীরে। তাদের সকলেরই ভয়ার্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে নদীর দিকে কর্দমাক্ত জলে প্রচণ্ড আলোড়ন তুলে একটা অদৃশ্য ঝড় এগিয়ে আসছে ফাভেলের দিকে!
পিরানহা! রাক্ষুসে মাছ! ব্রেজিলের বিভিন্ন নদীতে বাস করে মাংসলোলুপ হিংস্র পিরানহা মাছ। তাদের কবলে পড়লে কারো রক্ষা নেই। একটা বলিষ্ঠ ষাঁড়কে কয়েক মিনিটের মধ্যে খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারে ওই রাক্ষুসে মাছের ঝক–পড়ে থাকে শুধু তার মাংসহীন কঙ্কাল!
একটা লোক বাঁশ হাতে দৌড়ে এল ফাভেলকে উদ্ধার করতে। সাশার মন থেকে তখন ক্রোধ দুর হয়ে গেছে বিপন্ন ফাভেলকে উদ্ধার করার জন্য সে জেটির উপর এসে বাঁশটা ফাভেলের দিকে বাড়িয়ে ধরল। কিন্তু ফাভেল বাঁশটাকে ধরল না, অথবা বাঁশটাকে সে দেখতে পায়নি এমনও হতে পারে–কারণ, অন্ধের মতন সে তখন সাঁতার কাটছে তীর লক্ষ করে। দেখতে দেখতে আলোড়িত জলরাশির তরঙ্গ ধরে ফেলল ফাভেলকে রক্তে লাল হয়ে উঠল নদীর জল! কোনোরকমে তীরে উঠল ফাভেল, তার সর্বাঙ্গ দিয়ে ঝরছে লাল রক্তের ধারা, তার দেহের বিভিন্ন অংশ কামড়ে ধরে ঝুলছে অনেকগুলো নাছোড়বান্দা পিরানহা মাছ! তার বুক আর পেটের অধিকাংশ স্থানই ছিন্নভিন্ন, কোনোরকমে টলতে টলতে সে এগিয়ে গেল একটা কুঁড়েঘরের দিকে। তাকে সাহায্য করতে ছুটে এল অনেক লোক–কিন্তু তারা তার কাছে পৌঁছানোর আগেই কুটিরের দরজা ঠেলে ঢুকে গেল ফাভেল, পরক্ষণেই কুটিরের ভিতর থেকে ভেসে এল পিস্তলের আওয়াজ!
