হঠাৎ জোকুইমের সঙ্গে তাইগরের বিগত দ্বন্দ্বযুদ্ধের দৃশ্যটা সাশার মনে পড়ল। পা দিয়ে লাথি মেরে একটা শুকনো ঢেলাকে সে ছুঁড়ে দিল তাইগরের দিকে। ফল হল তৎক্ষণাৎ ভীষণ গর্জন করে সাশাকে লক্ষ করে ঝাঁপ দিল তাইগর। সঙ্গেসঙ্গে ক্ষিপ্রহস্তে আঘাত হানল সাশা আহত শাপদের রক্তাক্ত বুকে আরও গভীর ছিদ্র সৃষ্টি করে ঢুকে গেল বর্শার ফলা।
তাইগরের জীবনীশক্তি ফুরিয়ে এসেছিল। ধীরে ধীরে স্থিরী হয়ে এল তার অন্তিম আস্ফালন। সাশা এইবার বর্শাদণ্ডকে ঠেলে তাইগরকে চিত করে শুইয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ নিহত পশুর বক্ষে বিদ্ধ বর্শার ডান্ডায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সাশা। তার দেহে তখন অপরিসীম ক্লান্তি। সাশা বুঝতে পারল লড়াইটা যদি আর এক মিনিট স্থায়ী হত, তাহলে এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে তার মৃত্যু ছিল অবধারিত। স্নায়ুর উপর উত্তেজনার ওই অস্বাভাবিক তীব্র চাপ বহুক্ষণ ধরে সহ্য করতে পারত জোকুইম–কিন্তু তার চাইতে কম বয়স এবং অধিকতর দৈহিক শক্তি থাকলেও জোকুইমের মতো লৌহকঠিন স্নায়ুর অধিকারী হতে পারেনি সাশা।
…তাইগরের চামড়া খুলে নিল সাশা, তারপর সারমেয়-বাহিনী নিয়ে অশ্বতর-পৃষ্ঠে আরোহণ করে ফিরে গেল নিজস্ব আস্তানায়। সিনর শিকো তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, চামড়া দেখেই বুঝতে পারছি জন্তুটা ছিল প্রকাণ্ড। দু-দুটো গভীর আঘাতচিহ্ন বুঝিয়ে দিচ্ছে তুমি বর্শা চালিয়েছিলে দু-বার। সিনর, তুমি এখন একজন তাইগরেরো!
.
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
সিনর শিকোর যেসব বিগড়ে-যাওয়া যন্ত্র মেরামত করার ভার নিয়েছিল সাশা, সেই কাজগুলো শেষ হতেই সে ফিরে গেল অ্যাপারিসিওর কাছে পূর্বনির্দিষ্ট ঠিকানায়। দেখা হওয়ামাত্র অ্যাপারিসিও জানাল তার জন্য দুটি খবর অপেক্ষা করছে একটি সুসংবাদ, আর একটি দুঃসংবাদ। সাশা বলল, সে আগে দুঃসংবাদটি শুনতে চায়।
অ্যাপারিসিও জানাল কয়েকদিন আগে মাত্তো গ্রসের একটি অধিবাসীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। কথাবার্তার ফাঁকে হঠাৎ অ্যাপারিসিও বলে ফেলেছিল সাশা সিমেল ও তার বড়ো ভাই আর্নস্ট সিমেল তার পরিচিত। শোনামাত্র লোকটি রাগে আগুন হয়ে ওঠে। অ্যাপারিসিও প্রথমে ভেবেছিল মাত্তো গ্রসের লোকটি বুঝি সাশাকেই গালিগালাজ করছে, সে লোকটার গলা টিপে ধরার উপক্রম করেছিল কিন্তু একটু পরে সে যখন বুঝতে পারল সাশা নয়, লোকটির আক্রোশের উৎস হচ্ছে আর্নস্ট–তখন সে আর লোকটিকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি। তবে তার মনে হয় আর্নস্টকে ওই লোকটির কথা বলে সতর্ক করে দেওয়া উচিত, না হলে সে বিপদে পড়তে পারে।
সাশার মনে পড়ল পাসো ফানডো শহরে প্রথম যখন তার সঙ্গে আর্নস্টের দেখা হয়, সেইসময় আর্নস্টের কাঁধের উপর একটা ক্ষতচিহ্ন তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এবং সেটার উৎপত্তির কারণ জিজ্ঞাসা করলে অত্যন্ত হিংস্রভাবে আর্নস্ট জানিয়েছিল ওটা তাকে উপহার দিয়েছে একটা শয়তান!
একটি নয়, আরও একটি দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছিল সাশার জন্য। অ্যাপারিসিও বলল, সিনর, ফাভেল নামে তোমার শত্রুটি আমোলার শহরে এসেছিল। যে-লোকটির কাছে ফাভেল তোমার খোঁজখবর নিচ্ছিল, সৌভাগ্যক্রমে সে ছিল আমার বন্ধু। আমার বন্ধুই আমাকে ফাভেলের কথা বলে দেয়, অবশ্য তোমার সম্পর্কে একবারও মুখ খোলেনি।
সাশা ক্রুদ্ধস্বরে বলল, তোমার বন্ধুর সঙ্গে অবার যদি ফাভেলের দেখা হয়, তাহলে সে যেন ফাভেলকে আমার ঠিকানা জানিয়ে দেয়। আমি কাউকে ভয় পাই না, কারো কাছ থেকে পালাতেও চাই না। আর্নস্ট এখন অ্যালবোব্রাল শহরে আছে। আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। সেখান থেকে ফিরে এসেই আমি ঘোড়ার পিঠে যাত্রা করব আমোলার দিকে। আশা করি ফাভেলকে সেখানে পাওয়া যাবে।
মুচকি হেসে অ্যাপারিসিও জানাল ঘোড়া বা খচ্চরের পিঠে এখন আমোলার দিকে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ বন্যার জলে সমস্ত পথঘাট ভেসে গেছে। তবে যাতায়াত করার জন্য সে একটা নতুন উপায় মাথা খাঁটিয়ে বার করেছে। এই নতুন উপায় হচ্ছে পূর্বে উল্লিখিত সুসংবাদ! স্থানীয় এক ভূস্বামীর একটি বজরা অনেকদিন হল অকেজো হয়ে পড়ে আছে। লোকটির এখন খুব টাকার দরকার। অ্যাপারিসও উক্ত ভূস্বামীর সঙ্গে দরদাম করে অত্যন্ত কম দামে নৌকাটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। লোকটি তো বিক্রি করতে পারলে বাঁচে, এখন সাশার সম্মতির জন্যই অপেক্ষা করছে অ্যাপারিসিও। সাশা মত দিলে খুব সুন্দরভাবে নিজের হাতে নৌকাটাকে সে সারিয়ে ফেলতে পারে। নৌকায় চড়ে সহজেই তারা বিভিন্ন গ্রাম ও র্যঞ্চে যাতায়াত করতে পারবে এবং অকেজো বন্দুক-পিস্তল মেরামত করে অর্থোপার্জনও হবে যথেষ্ট।
পরিকল্পনাটা খুবই পছন্দ হল সাশার। নৌকাটি কিনে নিয়ে খুব অল্পসময়ের মধ্যেই সেটাকে চমৎকার করে সারিয়ে নিল অ্যাপারিসিও। সাশা ওইখানেই অ্যাপারিসিওকে অপেক্ষা করতে বলে ঘোড়ার পিঠে রওনা হল অ্যাবোব্রাল শহরের দিকে, যেখানে অবস্থান করছিল বড়ো ভাই আর্নস্ট।
আর্নস্টের সঙ্গে দেখা হল যখন, সেইসময় তার সঙ্গে অনেক লোকজন ছিল। রাত্রে নিরিবিলিতে সাশা জানাল মাত্তো গ্রসোর এক অধিবাসী আর্নস্টকে অনুসরণ করছে, তার উদ্দেশ্য ভালো নয়–এইভাবে লেগে থাকলে একসময় লোকটা আর্নস্টকে বাগে পেয়ে যাবে। বিশেষত কুয়াবা শহরটা আর্নস্টের পক্ষে মোটেই নিরাপদ নয়।
