চিনির কলে যে-কাজে হাত লাগিয়েছিল সাশা, সেই কাজটা তখনও শেষ হয়নি। তাই দূরবর্তী স্থানে শিকার-অভিযানে জোকুইমের সঙ্গী হতে পারল না সে। কিন্তু কয়েকদিন পরে যখন নিকটস্থ অঞ্চলে একটি তাইগরের উপস্থিতির সংবাদ এল এবং জানা গেল ওই জায়গাতে ঘোড়ার পিঠে পৌঁছানো যায় একদিনের মধ্যেই তখন বেদুইনো নামক অশ্বতরটির পৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে তিনটি শিকারি কুকুরের সঙ্গে পূর্বোক্ত স্থানের উদ্দেশে যাত্রা করল সাশা। বলাই বাহুল্য ওই তিনটি কুকুরের মধ্যে ভ্যালেন্টা নামে জোকুইমের জ্যান্ত উপহারটিও ছিল।
.
একাদশ পরিচ্ছেদ
একটি গোশালা থেকে ঘোড়ায় চড়ে সিনর শিকো পিন্টোর অধিকৃত জমিতে ফিরে আসার সময়ে তাইগরটাকে দেখতে পেয়েছিল। জনৈক ভৃত্যশ্রেণির লোক। দূর থেকে জন্তুটাকে কিছুক্ষণ অনুসরণ করার পর লোকটি দেখল ঘন ঘাসঝোপের ভিতর জন্তুটা অদৃশ্য হয়ে গেল। তখন ফিরে এসে সিনর শিকোকে তাইগরের উপস্থিতির খবরটা জানিয়ে দিল লোকটি।
যেখানে তাইগরকে দেখা গিয়েছিল, বর্ণনা অনুসারে সেই জায়গাটার উদ্দেশেই কুকুর নিয়ে খচ্চরের পিঠে যাত্রা করেছিল সাশা। কিন্তু তুমুল বৃষ্টিপাতের ফলে বনপথ এমন দুর্গম হয়ে পড়েছিল যে, সময়মতো সেখানে সে পৌঁছাতে পারেনি একটা রাত তাকে বনের মধ্যে কাটাতে হয়েছিল।
পরের দিন সকাল হতেই কুকুরগুলোকে নিয়ে রওনা হল সাশা। বেদুইনো নামে খচ্চরটাকে প্রথমে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে কুকুরগুলোকে নিয়ে সাশা পায়ে হেঁটেই চলেছিল তাইগরের খোঁজে কিন্তু পরে সে ভেবে দেখল ওইভাবে বেদুইনোকে বেঁধে রাখলে বেচারা বেঘোরে মারা পড়তে পারে। তাইগর যখন বুঝতে পারে শত্রু তার পিছু নিয়েছে, তখন অনেক সময় চক্রাকারে ঘুরে এসে পিছন থেকে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘাসঝোপের ভিতর কুকুর বা মানুষ চলাচলের সময় শব্দ হয়, কিন্তু তাইগর সেখানে নিঃশব্দে চলাফেরা করতে পারে তাই পিছন থেকে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত শিকারি বিপদ বুঝে সতর্ক হওয়ার সুযোগ পায় না; মুহর্তের মধ্যে শিকারি পরিণত হয় শিকারে। এই তাইগরটাও যদি সে-রকম কিছু করে, তাহলে বেচারা বেদুইনো নিরুপায়ভাবে মৃত্যুবরণ করবে–পলায়ন বা লড়াই করার সুযোগই থাকবে না তার। তাই ঘন ঘাসঝোপের ভিতর খচ্চরের পিঠে চলাচল করতে অসুবিধা হলেও সাশা বেদুইনের বাঁধন খুলে উঠে বসল তার পিঠে এবং বাহনকে চালনা করল ধাবমান কুকুরদের পিছনে।
কুকুরগুলো ছুটতে ছুটতে সাশার দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল। ঘন লতাগুল্ম আর ঝোপঝাড়ের বাধা ভেদ করে কুকুর যেভাবে ছুটতে পারে, সেভাবে ছুটতে পারে না খচ্চর বিশেষত পিঠের উপর আরোহীকে বহন করতে হলে তার গতিবেগ আরও কমে যায়।
কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আবার কুকুরগুলোকে দেখতে পেল সাশা। একটা ঘন ঘাসঝোপের বাইরে দাঁড়িয়ে তারা যেভাবে চিৎকার করছে, তাতে স্পষ্টই বোঝা যায় ওই ঝোপের মধ্যেই রয়েছে তাইগর। ঘন জঙ্গলের মধ্যে তাইগরের মোকাবিলা করা বর্শাধারী শিকারির পক্ষে খুবই কঠিন। সাশার মনে পড়ল জোকুইম লড়াইয়ের জন্য সর্বদাই ফাঁকা জায়গা বেছে নিয়েছে, ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে কখনোই তাইগরকে আক্রমণ করেনি।
এমন সমস্যায় আগে কখনো পড়েনি সাশা। সে যদি এখন পিছিয়ে আসতে চায়, তাহলে পিছন থেকে আক্রান্ত হতে পারে–সে-রকম কিছু ঘটলে সে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হবে না এবং তার কুকুরগুলোর জীবনও হবে বিপন্ন। আবার এগিয়ে গিয়ে ঝোপের মধ্যে আন্দাজে বর্শা দিয়ে খোঁচাখুঁচি করাও নিরাপদ নয়–হঠাৎ যদি তাইগর ঝাঁপ দেয়, তাহলে বর্শা তুলে বাধা দেওয়ার সময় পাওয়া যাবে না, নখদন্তের শানিত আলিঙ্গনে মুহূর্তের মধ্যে দেহ হবে ছিন্নভিন্ন।
কিন্তু সাশাকে বেশিক্ষণ মাথা ঘামাতে হল না। ঝোপের ভিতর থেকে কালো-হলুদ রং-এর একটা শরীরী বিদ্যুৎ সগর্জনে ছিটকে এল ফাঁকা মাঠের উপর এবং তিরবেগে ছুটে এল সাশার দিকে। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বর্শাটা তলা থেকে উপরে তুলে আক্রমণ প্রতিরোধ করল সাশা, শানিত বর্শাফলক ঢুকে গেল তাইগরের বুকে। এ-রকম ক্ষেত্রে শিকারি প্রাণপণ শক্তিতে বর্শাটা ঠেলে ধরে আর আহত তাইগর চেষ্টা করে বর্শার বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে এসে শিকারিকে নখদন্তের মৃত্যু-আলিঙ্গনে বন্দি করতে দুই পক্ষের ঠেলাঠেলির ফলে বর্শাফলক ক্রমশ গভীর থেকে আরও গম্ভীর হয়ে ঢুকে গিয়ে তাইগরকে মৃত্যুশয্যায় শুইয়ে দেয়।
কিন্তু বুনো জানোয়ার কখন কী করবে তা কেউ বলতে পারে না। এই তাইগরটাও যা করল, তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না সাশা। চটপট পিছিয়ে এসে নিজের শরীরটাকে বর্শাফলকের দংশন থেকে মুক্ত করে নিল তাইগর, তারপর নতুন উদ্যমে আক্রমণের সুযোগ খুঁজতে লাগল। তার বুকের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে বটে, কিন্তু সেই রক্তপাত তুচ্ছ করেও জন্তুটা কতক্ষণ জীবিত থেকে লড়তে পারবে, সেটা বুঝতে পারল না সাশা। লড়াই যদি দীর্ঘসময় ধরে চলে, তবে তীব্র উত্তেজনা স্নায়ুর উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে সাশাকে দুর্বল করে ফেলবে এবং মানুষের শক্তি নিয়ে শ্বাপদের প্রবল জীবনীশক্তির সঙ্গে বেশিক্ষণ পাল্লা দেওয়া সম্ভব হবে না–লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হলে সাশার পরাজয় ও মৃত্যু অবধারিত। এখন তাইগর যদি ধৈর্য হারিয়ে উদ্যত বর্শাফলকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাহলেই মঙ্গল। কিন্তু জন্তুটার চালচলন দেখে তার মতলব কিছুই বুঝতে পারছে না সাশা শ্বাপদ জ্বলন্ত চক্ষে তাকে নিরীক্ষণ করছে, শত্রু মুহূর্তের জন্য অসাবধান হলেই সে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়বে…
